তোমারে ভাবছিলাম বাবুগো মাইয়া বুঝি, কথা কইবার চাইয়া ডরাইছি। তবু মনডা কইল কী, না, বাবুগো ঘরের মাইয়ালোক সাহস পাইব কই যে একা আসব মেলায়? কথা কমু ভাবি, ডরাই। শ্যাষে অখনে কইলাম। ডর নাই, আমারে ডর নাই।
ডরে তো মরি। লোকটার কথা শুনে বিষম খটকা লাগে খাদুর মনে। সেও কি তবে বেমানান সাজ করেছে লোকটার মতো খাপছাড়া আর হাস্যকর, চাষাভুষো ঘরের মেয়ে হয়ে বাবুর ব্লাড়ীর বেশ ধরে? ছোট একটা তাঁবুতে পরীর নাচ আর ম্যাজিক দেখাচ্ছে। নাচের নমুনা ধরা হয়েছে সবার সামনে। রোগা-ক্যাংটা কালো কুৎসিত তিনটি মেয়ে মুখ গলা হাতে পুরু করে রং লেপে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে তাবুর সামনে ছোট বাঁশের মঞ্চে ভঙ্গি করছে নাচের, গলা ছেড়ে পাঁচমেশালি সুরে গান ধরেছে ভাঙা হারমোনিয়ামের সঙ্গে–একজন ওদের মধ্যে হিজড়ে। মাঝে মাঝে তাবুর সামনের পরদা সরিয়ে দেখানো হচ্ছে যে শুধু এরা নয় আরো অঙ্গরা আছেন ভেতরে, দু আনা-চার আনায় ওই পরীদের মজাদার নাচ দেখার সুযোগ ছেড়ো না, তার সঙ্গে ম্যাজিক, ভাড়ামি। চলা আও, চলা আও–দো দো আনা, চার চার আনা।
আমার পয়সা আমি দিমু কইলাম। গায়ে-পড়া ঝগড়ার সুরে খাদু বলে দু আনা পয়সা বাড়িয়ে দিয়ে। নাচ দেখতে ভেতরে যাবার তাদের মধ্যে কথাও হয়নি তখন পর্যন্ত, তার হয়ে লোকটির টিকিটের পয়সা দেবার কথা দূরে থাক।
দিও, তুমিই পয়সা দিও। লোকটি বলে আমোদ পেয়ে, কিন্তু অ্যানে কী দেখবা? খালি ফাঁকিবাজি, ঠকাইয়া পয়সা নেওনের ফিকির। দেখবা যদি, চীনাগো সার্কাস দেখি গা চলো। খাসা দেখায়, পয়সা দিয়া খুশি হইবা।
দেখি না কী আছে।
সব দেখবে খাদু এবার, ভালোমন্দ যা কিছু দেখার আছে; এত মানুষ ঠকছে সাধ করে, সেও নয় ঠকবে, বিশ্বাসী সাথী যখন পেয়েছে একজন। বিশ্বাস রাখবে কি না শেষ পর্যন্ত ভগবান জানে, কী বিপদ আজ তার অদৃষ্টে আছে তাও জানে ওই পোড়ারমুখো ভগবান, তবে মেলায় কোনোরকম নষ্টামি গুণ্ডামি যে করবে না লোকটা এটুকু খাদু জানে। বুঝদার বিশ্বাসী সাথীর মতোই সে সাথে থাকবে, মনখোলা আলাপী কথায় হাসি-তামাশায় খুশি থাকবে দুজনেই, ভালো লাগবে মেলা দেখা। মতলব যা আছে তা মনেই থাকবে ওর চাপা-পড়া।
ঘেন্না জন্মে যায় সস্তা নাচ, বাজে ম্যাজিক, বগলে লাঠি খুঁচিয়ে কাতুকুতু দেওয়ার মতো ভাড়ামি দেখে। তবু শেষ পর্যন্ত থাকে খাদু, উপভোগও করে। এও মেলারই অঙ্গ জেনে শুনে কত বাজে জিনিস কেনে পয়সা দিয়ে, অন্য সময় যেভাবে পয়সা নষ্ট করার কথা ভাবলেও গা জ্বালা করত, নইলে আর মেলার উন্মাদনা কিসের। নিজের ভিতর উথলাচ্ছে আনন্দ আর উত্তেজনা, তাই দিয়ে ফাঁকিকেও সার্থকতা দেওয়া যায়। মেলায় না হলে একটা পয়সা দিয়েও কি কেউ দেখতে চাইত এসব!
বয়সের পাকামি আছে, সে যাবার নয়, তবে ছেলেবয়সের আবেগপুলকের বন্যাও থইথই করছে মনে। ফাঁকি যাচাই করতে করতেও উৎসুক লোভী মন নিয়ে খুশি। হয়েই খাদু দেখে হিমালয় পারের অজগর সাপ, এক ছেলের দুই মাথা, জন্ম থেকে। জোড়া-লাগা দুই মেয়ে।
অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা কয় খাদু, ছেলে কাখে বৌটির সঙ্গে, কুলো আর পাখা হাতে বিধবাটির সঙ্গে একপাল বৌ ছেলে নাতিনাতনি নিয়ে বেসামাল সধবা গিন্নিটির সঙ্গে। দেখা হয় চেনা মানুষের সঙ্গে। সুবলের মা পাড়ার তিন বাড়িতে ঠিকে কাজ করে। চুপি চুপি শুধোয় সুবলের মা, সাথে কে?
দ্যাশের মানুষ, কুটুম। খাদু বলে নির্ভয় নিশ্চিন্তভাবে।
চাঁদ উঠেছে আকাশে, নিচে অসংখ্য আলো জ্বলছে মেলার। একজিবিশনের চোখ ঝলসানো বাড়াবাড়ি আলো নয়, কাছে তেল মোম গ্যাসের শিখা, কোনোটা কাঁচের মধ্যে কোনোটা খোলা, তফাতে জোছনারাতের তারার মতো।
আরো দেখবা?
দেখুম না; চীনা সার্কাস? তুমিই তো কইলা।
চীনা সার্কাসের তাঁবুটা অনেক বড়। চার আনা টিকিটের দাম। লোক টানবার জন্য সামনে খেলার নমুনা দেখানো হচ্ছে এখানেও, ভিন্ন রকম নমুনা। মেয়ে আছে তিনটি, দুজন হলদে রঙের চীনা, একজন কালো রঙের বাঙালি। কালো হলেও ছিরি ছাদ আছে মেয়েটির, রং মেখে ভূতও সাজেনি, সস্তা ঢঙের ভঙ্গিও নেই। চীনা মেয়ে দুটিকে বড়-ছোট বোন মনে হয় খাদুর। পিছু বেঁকে পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে, হাতের ভরে শূন্যে পা তুলে দাঁড়িয়ে, ছোট লোহার চাকার ভেতর দিয়ে কৌশলে গলে গিয়ে ওরা খেলার নমুনা দেখাচ্ছে! আঁটোসাঁটো জোয়ান-বয়সী চীনাটি দুহাতের দুটি ছড়ির ডগায় বসানো প্লেট দুটিকে বন-বন করে ঘোরাচ্ছে। আরেকজন, তাকে ওর ভাই মনে হয় খাদুর, পাঁচ ছটা লোহার শিকের আস্ত চাকা নিয়ে চাকার সঙ্গে চাকা আটকে আবার খুলে ফেলেছে, কী করে কে জানে! ভেতরে গিয়ে খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় খাদু। পাঁচ-ছ বছরের একটা ছেলে, সে দৌড়ে এসে লাফ দিয়ে মাটি না ছুঁয়ে শূন্যে পাক খেয়ে পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াচ্ছে, বড় একজনের মাথায় হাতের ভর দিয়ে শূন্যে পা তুলে দিচ্ছে, এসব দেখে রোমাঞ্চ হয় খাদুর। টেবিলে কাঠের গোলায় বসানো তক্তার দুপাশে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে তক্তা গড়িয়ে গড়িয়ে একটি মেয়ের দোল খাওয়া দেখে সে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে, মেজো চীনা মেয়েটিকে শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে টেবিল ডিঙোতে দেখে, আগুনের চাকার মাঝখান দিয়ে গলে যেতে দেখে সে অভিভূত হয়ে যায়, ভাবে, কত কাল ধরে কী ধৈর্যের সঙ্গে তপস্যা করে না জানি এসব কসরত আর কায়দা ওরা আয়ত্ত করেছে।
