বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা প্রতিদিনই জানতে পারছি কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক, কোনটা মানবিক, কোনটা অমানবিক, কোনটা পরিবেশ সম্মত কিংবা কোনটা স্বাস্থ্যসম্মত। শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মগ্রন্থে লেখা ভুল ভালো বাণী থেকে উঠে আসা মূল্যবোধের চেয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া নৈতিকতাই অধিকতর নির্ভরযোগ্য। পৃথিবীতে যেমন খ্রীষ্টান পদার্থবিদ্যা কিংবা মুসলিম বীজগণিত বলে কিছু নেই ঠিক তেমনি মুসলিম নৈতিকতা কিংবা খ্ৰীষ্টান নৈতিকতা বলাটাও হাস্যকর। আমি দাবি করব, নৈতিকতার গবেষণা বিজ্ঞানেরই অংশ, বিজ্ঞানের এক অবিকশিত শাখা এটি।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে জীববিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক এবং বিবর্তনীয় উৎসের সন্ধান করে বহু বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ এবং গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে[৩০৬]। এমনকি ডারউইন নিজেও সে সময় জেনেটিক্সের কোনো জ্ঞান ছাড়াই কেবল জীবজগৎ পর্যবেক্ষণ করে সহযোগিতা এবং পরার্থতার বিবর্তনীয় উপযোগিতা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং চিন্তাবিদেরা বহুভাবে দেখিয়েছেন যে এই ডারউইনীয় পদ্ধতিতে প্রাকৃতিকভাবেই পরার্থপ্রায়ণতা, সহযোগিতা, নৈতিকতা আর মূল্যবোধের মতো অভিব্যক্তিগুলো জীবজগতে উদ্ভূত হতে পারে, যা বিবর্তনের পথ ধরে মানবসমাজে এসে আরও বিবর্ধিত আর বিকশিত হয়েছে। গবেষক এলিয়ট সোবার তার একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন[৩০৭],
যদি আমরা বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও নৈতিকতার ব্যাপারগুলো চিন্তা করি, তারপরেও এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে বিবর্তন মানুষকে কেবল স্বার্থপর এবং অহঙ্কারী হিসেবে গড়ে তুলবে। বরং উল্টোভাবে এটা বরং খুবই সম্ভব যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন তাদেরকেই বাড়তি উপযোগিতা দিয়েছিল যারা আত্মম্ভরী কিংবা স্বার্থপর না হয়ে গোত্রের মধ্যে সহযোগিতামূলক ব্যবহার প্রদর্শন করেছিল।
আমরা অধ্যায়ের শুরুতে স্যামুয়েল বাওয়েলের বিবর্তন মনোবিজ্ঞান নিয়ে একটি মজার কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ গবেষণার উল্লেখ করেছিলাম। সেখানে আবারো ফিরে যেতে হচ্ছে। বাওয়েলের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছিল যে, মূঢ় সহিংসতা থেকেই সম্ভবত একসময় জন্ম হয়েছে মূঢ় পরার্থিতার। এলিয়ট সোবারের মতো স্যামুয়েল বাওয়েলও মনে করেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যে গোত্রের সদস্যরা অনেক বেশি নিজেদের মধ্যে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, তারাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাঁকুনিতে তারাই টিকতে পেরেছে অন্যদের চেয়ে বেশি। কাজেই পরার্থিতার মতো অভিব্যক্তিগুলো সমাজে এক সময় না একসময় উদ্ভূত না হবার কোনো কারণ নেই। মানবসমাজে এটির উদ্ভবের পরে সেটার বিকাশ এবং বৃদ্ধি তো স্রেফ সময়ের ব্যাপার। সমাজে সুগুণের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা, দুর্বলদের রক্ষার জন্য এক সময় রাষ্ট্রের উদ্ভব, গণতান্ত্রিক আইনের প্রয়োগ, শিক্ষার প্রসার, নারী অধিকার, সাংস্কৃতিক অগ্রসরতা প্রভৃতি মানব নৈতিকতাকে ভিন্ন একটি মাত্রায় নিয়ে গেছে নিঃসন্দেহে। আমাদের আধুনিক মূল্যবোধগুলো যে প্রতিদিনের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া থেকেই উদ্ভূত এবং উৎসারিত, দার্শনিক পল কার্জের ‘নিষিদ্ধ ফল :মানবিকতার মূল্যবোধ গ্রন্থে এই মতের সুস্পষ্ট সমর্থন মেলে[৩০৮]।
প্রখ্যাত মনোবিদ, বিজ্ঞানের দার্শনিক এবং স্কেপটিক ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল শারমার মানবসমাজে মুল্যবোধ এবং নৈতিকতার অভিব্যক্তি নিয়ে আলাদা করে ভেবেছেন এবং এ নিয়ে লিখেছেন। তিনি তার ‘দ্য সায়েন্স অব গুড এন্ড এভিল’ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন সমাজ বিকাশের প্রয়োজনেই মানুষ কিছু নীতিকে থম থেকে ‘গোল্ডেন রুল’ হিসেবে গ্রহণ করেছিল[৩০৯]–
Do unto others, as you would have them do unto you. (অন্যদের প্রতি সেরকম ব্যবহারই করো যা তুমি তাদের থেকে পেতে চাও)
কারণ এই নীতির অনুশীলন ছাড়া কোনো সমাজ ব্যবস্থা টিকে থাকবে না। মাইকেল শারমার তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানব বিবর্তনের ধারাতেই পারস্পরিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আবার নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সহনশীলতা, উদারতা, স্বার্থত্যাগ, সহানুভূতি, সমবেদনা প্রভৃতি গুণাবলির চর্চা হয়েছে। সভ্যতার প্রতিনিয়ত সংঘাত ও সংঘর্ষেই গড়ে উঠেছে মানবীয় প্রোভিশনাল এথিক্স’, যা মানুষকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। আমরা এখনও মানবিকতার কষ্টিপাথরে নিজেদের মূল্যবোধ প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে চলেছি। বিগত কয়েক শতকের সামাজিক বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে আমরা আমাদের মানবিক মূল্যবোধগুলোকে বাড়িয়ে নিতে পেরেছি বহুক্ষেত্রেই। এখন আর কালো মানুষদের দেখলে ‘নিগ্রো শব্দটি উচ্চারণ করি না, বাংলাদেশে ‘উপজাতি’র বদলে লিখি ‘পাহাড়ি জনগোষ্ঠি। আমরা জীর্ণশীর্ণ পুরাতন মূল্যবোধগুলোকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে সেগুলোর সংস্কার করতে পেরেছি। সাড়া বিশ্বজুড়েই নারীবাদী আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে জেন্ডার সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, বুদ্ধি পেয়েছে বৃদ্ধ কিংবা শিশু অধিকারের প্রতি দায়দায়িত্বও। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার-সচেতনতা, সমকামী এবং রূপান্তরকামীদের প্রতি সহমর্মিতাসহ অনেক মূল্যবোধই আজকে খুব ভালোভাবে চোখে পড়ে, যেগুলো কয়েক দশক আগেও ছিল একেবারেই অনুপস্থিত। রিচার্ড ডকিন্স তার ‘গড ডিলুশন’ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে ‘Natural Selection as a consciousness Raiser অংশে মতামত ব্যক্ত করেছেন যে, আসলে ডারউইনীয় সিলেকশনের মতোই এক ধরনের নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের মূল্যবোধগুলোকে ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছি, ঠিক যেভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন নামের ডারউইনীয় সিলেকশন প্রক্রিয়ায় সরল জীব থেকে উদ্ভূত হয়েছে জটিল জীবজগতের[৩১০]। নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের ক্রমিক চর্চার মাধ্যমে জৈববৈজ্ঞানিক পথে আমরা প্রতিদিনই নিজেদের অগ্রসর করছি, জাগিয়ে তুলছি আমাদের সুপ্ত মানবতাবোধকে।
০৮. যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি
আমি এ বইয়ে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান নামের নতুন বিজ্ঞানের শাখাটির সাথে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। কতটুকু সফল হতে পারলাম বলা মুশকিল। বিচারের ব্যাপারটা পাঠকদের কাছেই ছেড়ে দিতে চাই; তবে আমি যা করতে চেয়েছি তা হলো–আলোচনার একটা সূচনা। আর সেই আলোচনার সূত্র ধরেই বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত আধুনিক গবেষণালব্ধ ফলাফলগুলো পাঠকদের সামনে নিয়ে আসার প্রয়াস পেয়েছি যথাসম্ভব নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে। কিছু কিছু ব্যাপার বিতর্কিত মনে হতে পারে, মনে হতে পারে এখনও প্রমাণিত কোনো বিষয় নয়। আমি তারপরও চেষ্টা করেছি বৈজ্ঞানিক সাময়িকী এবং প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীদের (যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ) লেখা থেকে সর্বাধুনিক তথ্যগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঠকদের সামনে হাজির করতে। প্রান্তিক গবেষণালব্ধ জিনিস গ্রন্থাকারে সাধারণ পাঠকদের কথা ভেবে হাজির করলে একটা ভয় সবসময়ই থাকে যে, পরবর্তীতে অনেক কিছুই ভুল হয়ে যেতে পারে। তারপরও এই প্রান্তিক জ্ঞানগুলো আমাদের জন্য জরুরি। অধ্যাপক স্টিভেন পিঙ্কার তার ‘হাউ মাইন্ড ওয়ার্ল’ বইয়ের ভুমিকায় যেমনিভাবে বলেছিলেন–”Every idea in the book may turn out to be wrong, but that would be progress, because our old ideas were too vapid to be wrong!’– আমিও সেকথাই বলার চেষ্টা করব। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞানের নতুন শাখা। নতুন জিনিস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এর কিছু প্রান্তিক অনুমান যদি ভুলও হয়, সেটাই হবে পরবর্তী বিজ্ঞানীদের জন্য প্রগ্রেস’। আর সেই সংঘাত সংঘর্ষ থেকেই ঘটবে হবে নতুন অজানা জ্ঞানের উত্তরণ।
