আমি বরাবরই মনে করেছি যে, জীবজগতের প্রকৃতি বহুলাংশেই পরার্থপরায়ণ, সহযোগিতাপ্রবণ, এমনি অনেক-সময় আবেগপ্রবণও। এগুলো কিন্তু তাদের স্বার্থপর জেনেটিক স্তর থেকেই উদ্ভূত হয়। প্রাণীরা কখনো খুব ভালো (পরার্থ), আবার কখনো খুবই খারাপ (স্বার্থপর)আচরণ করে, আর কখন কোনটা করবে তা নির্ধারিত হয় জেনেটিক স্তরে সর্বোচ্চ হিস্যা আদায়ের নিরিখে। …প্রাণিজগতে পরার্থতা আসলে একটি সুচারু মাধ্যম যার ফলশ্রুতিতে অতলস্পর্শী জিনগুলো নিজ নিজ স্বার্থ সর্বোত্তম উপায়ে চরিতার্থ করতে পারে।
.
যৌনতা, যৌনতার নির্বাচন এবং পরার্থিতা
আমাদের বিবর্তনীয় যাত্রাপথের খুব কাছের আত্মীয় শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলেন গবেষকেরা। তারা দেখলেন শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও সহযোগিতা দৃশ্যমান, কিন্তু সেটার পেছনে কাজ করে এক ধরনের যৌনাভিলাস। শিম্পাঞ্জিরা শিকার করে, কিন্তু অনেক সময়ই সেই শিকার নিজেদের বা গোত্রের পুষ্টির জন্য নয়, বরং নারীদের আকর্ষণ করে যৌনসঙ্গমে প্রবৃত্ত করার জন্য।
ধরা যাক একদল শিম্পাঞ্জি জঙ্গলে ঘুরতে ফিরতে গিয়ে কলোবাস বানরদের একটা দলের দেখা পেলো। অনেক সময় তারা কলোবাসদের আক্রমণ করে, কখনো বা আবার করে না। আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত অনেক সময়ই নির্ভর করে দলে নারী শিম্পাঞ্জিদের উপস্থিতি এবং আধিক্যের উপর। দলে কোনো যৌনান্মুখ শিম্পাঞ্জি (swollen female chimp) থাকলে নির্ঘাত আক্রমণের সূচনা ঘটে। দক্ষ শিকারিরা সফল অভিযানের পর সাথে করে মাংস নিয়ে আসে সেই সব যৌনান্মুখ নারী শিম্পাঞ্জির জন্য। দেখা গেছে নারী শিম্পাঞ্জিরা সেই সব পুরুষদের প্রতিই থাকে উদার যারা মাংসের ব্যাপারে কোনো কৃপণতা করে না।
ব্যাপারটা কি মানবসমাজের জন্যও প্রযোজ্য? বলা মুশকিল। মাংসের জন্য না হলেও অর্থের বিনিময়ে যৌনতা বিক্রির পেশা যে মানবসমাজে আছে, তা সবারই জানা। শিম্পাঞ্জিদের সমাজে যৌনতার বিপননের মাধ্যম মাংস, মানবসমাজে অর্থ কড়ি। এখন, আদিম মানবসমাজে নৈতিকতার উদ্ভবের পেছনে এ ধরনের কোনো ধরনের যৌনাভিলাস কাজ করেছিল কি না সেটা পরীক্ষার জন্য বিজ্ঞানীরা কিছু আদিম ট্রাইবে গবেষণাকাজ চালিয়েছেন। তাঞ্জানিয়ার অদূরে হাডজা (Hadza) নামে একটি ট্রাইবে গবেষণা চালিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই হাডজা মানুষেরা এখনও শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে জীবনযাপন করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন সেখানে যে সব পুরুষেরা শিকারে অধিকতর দক্ষ হয়, তারা আবার একই সাথে বহু নারীর প্রণয় অর্জনে সক্ষম হয়।
মনোবিজ্ঞানী জিওফ্রি মিলার তার ‘সঙ্গমী মন’ বইয়ে[৩০২] এবং একটি গবেষণাপত্রে[৩০৩] সম্প্রতি প্রস্তাব করেছেন যে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের মতো গুণাবলিগুলো আসলে যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমে মানবসমাজে বিকশিত হয়েছিল। ব্যাপারগুলো ঘটা অসম্ভব কিছু নয়। সততা, দয়া, মমতা এবং সহমর্মিতার মতো গুণগুলো জাতি, লিঙ্গ এবং সংস্কৃতি নির্বিশেষে মানুষের কাছে আদৃত। আমরা বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে ডেভিড বাসের বিখ্যাত গবেষণার কথ জেনেছি। সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৩৭ টি দেশের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে ছেলে এবং মেয়েদের পছন্দের উপর জরিপ চালিয়েছিলেন তিনি[৩০৪]। সেই গবেষণায় নারী-পুরুষ দুই লিঙ্গের কাছেই যে বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে তা হলো দয়া। অর্থাৎ, পছন্দের তালিকায় দয়ার স্থান বুদ্ধিমত্তা, সৌন্দর্যসহ অন্যান্য সব কিছুর উপরে। এটা হতেই পারে যে, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যাদের এই দয়া, মমতা, বিশ্বস্ততার মতো গুণগুলো ছিল তারাই খুব বেশি করে বিপরীত লিঙ্গের মনোযোগ এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল, এবং তারাই অধিক হারে এ পৃথিবীতে সন্তানসন্ততি রেখে গেছে। সেজন্যই এখনও যে কোনো সমাজেই দেখা যাবে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি যারা অন্য মানুষের দুঃখ দুর্দশার প্রতি সংবেদনশীল এবং সহানুভূতিশীল; চোরছ্যাচোড়, গুণ্ডা, বদমায়েশ এবং স্বার্থপরদের সংখ্যাই সমাজে তুলনামূলকভাবে কম থাকে, এবং এ ধরনের লোকজনকে সাধারণত কেউই সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করতে চায় না।
.
মরাল ল্যান্ডস্কেপ
একটা সময়ে ধর্মবাদীরা একচেটিয়াভাবে নৈতিকতার উৎসের জন্য ধর্ম এবং ঈশ্বরকে সাক্ষীগোপাল হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তারা বহুঁকাল ধরেই নৈতিকতার পুরো ব্যাপারটাকে ঈশ্বরিক প্রলেপ লাগিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন এবং দাবি করেছেন এবং এখনও অনেকে করেন) যে, জৈববৈজ্ঞানিকভাবে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের উদ্ভবের মতো ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না। এগুলোর কোনো জৈবিক ব্যাখ্যা নেই। এগুলোর ব্যাখ্যা একমাত্র ঈশ্বর। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা বৈজ্ঞানিক মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয়নি মোটেই, বরং জৈবিক উৎস তথা বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে পরার্থিতা কিংবা সহযোগিতার মতো ব্যাপারগুলো প্রাণিজগতে উদ্ভূত হয়েছে এটা যখন থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করেছেন, তখন থেকেই ব্যাপারগুলো বরং অনেক বিজ্ঞানভিত্তিক হয়ে উঠেছে।
শুধু ধার্মিকেরাই নয়, অনেক প্রগতিশীল ব্যক্তিরাও ধার্মিকদের মতো একই ফাঁদে পা দিয়ে বলেন, মানবসমাজের নৈতিকতা ভিন্ন। বিবর্তন দিয়ে এটিকে ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন নেই। এরাও আসলে ধার্মিকদের মতোই অবচেতন মনে ধরে নেন যে, মানুষ আসলে অন্যান্য প্রাণিজগৎ থেকে আলাদা, যেন স্বর্গীয় কোনো সৃষ্টি! কিন্তু এটি তো ঠিক নয়। মানুষ তো শেষ বিচারে এই জীবজগতেরই অংশ। অন্য প্রাণীতে পরার্থিতা আর নৈতিকতা যে জৈবিক নিয়মে উদ্ভূত হয়েছে, মানুষের মধ্যেও সেই একই উৎসই কাজ করছে, তা এখন শুনতে যতই অস্বাভাবিক লাগুক না কেন। তবে এটা অনস্বীকার্য যে, মানবসমাজ অনেক জটিল। কিন্তু সেই জটিলতা ব্যাখ্যার জন্য জীববিজ্ঞানকে বাদ দেয়ার দরকার নেই। পিঁপড়ে, মৌমাছি কিংবা ডলফিনদের সমাজও জটিল। জটিল শিম্পাঞ্জিদের সমাজও। তাদেরও ভিন্ন ভিন্ন। জটিল সোশাল স্ট্রাকচার আছে। সেগুলো বিজ্ঞানীরা জৈববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াতেই বিশ্লেষণ করে চলেছেন। মানবসমাজের বিবিধ জটিলতার উৎসের কারণে নৈতিকতার স্তরে যে পার্থক্যগুলো আছে তা বিভিন্নভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় স্বর্গীয় উৎস সরিয়ে রেখে। সম্প্রতি (২০১০ সালে প্রকাশিত) স্যাম হ্যারিস একটি চমৎকার বই লিখেছেন ‘দ্য মরাল ল্যান্ডস্কেপ’ শিরোনামে[৩০৫]। বইটিতে হ্যারিস দাবি করেছেন যে, নৈতিকতা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আসলে বিজ্ঞানের একটি ‘অবিকশিত শাখা’ (undeveloped branch of science)-এর অংশ। তাই নৈতিকতার ঔচিত্য কিংবা অনুচিত্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এখন বিজ্ঞানের কাঁধেই থাকা উচিত, অশিক্ষিত মোল্লা-পাদ্রী-পুরুতদের কাঁধে নয়। তিনি বলেন,
