এত কথার ক্যাচকেচির আর দরকার নেই, গাণিতিক ভাবেই না হয় ব্যাপারটা দেখি বরং “ভাই আমি আপনে সবাই একদিন মইরা যামু। ধরেন ঈশ্বর থাকা না থাকার সম্ভাবনা ফিফটি ফিফটি …” এই সমস্যার একটা সুন্দর উত্তর অপার্থিব অনেক আগে একটা ফোরামে দিয়েছিলেন ইংরেজিতে। আমি মুক্তমনা ব্লগে বিখ্যাত ‘প্যাস্কেলের ওয়েজার’ নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, সেখানে এর বাংলা করেছিলাম এভাবে[২০৩]–
‘এই মৃত্যুর পর ঈশ্বর থাকা না থাকা–ফিফটি-ফিফটি (এটা স্রেফ সম্ভাবনা, কোন ‘ফ্যাক্ট’ নয়) ব্যাপারটা আসলে কী মিন্ করে? প্রথমতঃ একজন বিশ্বাসীর কাছে এই সম্ভাবনাটাই শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা নিয়ে হাজির হয়। আর একজন অবিশ্বাসীর কাছে তা শতকরা ০ ভাগ। অজ্ঞেয়বাদী কিংবা হাল্কা ধরণের বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা ০ থেকে ১০০এর মধ্যে যে কোন জায়গায় থাকতে পারে। এখন এই শতকরা হিসেব যাই হোক না কেন, এটা নির্দেশ করে একজন বিশ্বাসীর মনোজগতে তার (ঈশ্বরে বিশ্বাসের স্তরকে, কোন ভাবেই মৃত্যুর পর প্রকৃত ঈশ্বর থাকা বা না থাকার কোন সত্যিকার প্রোবাবিলিটি নয়। কারণ, এই সম্ভাবনার হিসেব এসেছে বিশ্বাসীদের মানসপটে থাকা বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যেটা বস্তুনিষ্ঠভাবে গণনা করাই সম্ভব নয়, প্রমাণ তো পরের কথা। কাজেই এই ‘ফিফটি-ফিফটি’ এনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ বড় সড় হেত্বাভাস দোষে দুষ্ট, কারণ, মানসজগতে বিশ্বাসের স্তরের উপর ভিত্তি করে কোন কিছু অস্তিত্ব প্রমাণের যুক্তি নির্মিত হওয়া উচিৎ নয়, সেটা বরং হওয়া উচিৎ বৈজ্ঞানিক কিংবা বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ সাপেক্ষে।
এখানে ধরেই নেয়া হচ্ছে ফিফটি-ফিফটি চান্স-এর যুক্তি (যেটা আসলে কুযুক্তি উপরেই দেখান হয়েছে) উপস্থাপন করলেই বিশ্বাসের উপকারিতা বুঝা যাবে আর অবিশ্বাসের বিপদের আলামত পাওয়া যাবে। সেই কত শতক আগে প্যাস্কেলের এই বাজিকে খণ্ডন করে দেয়া হয়েছে, অথচ সেটা এই শতাব্দীতেও বিশ্বাসীদের হৃদয়ে সেটা দোলা দিয়ে চলেছে অবলীলায়। প্যাস্কেলের বাজির আরেকটা বড় ত্রুটি হল– যদি ধরেও নেয়া হয় মৃত্যুর পরে পরকাল বলে। কিছু একটা আছে, তারপরেও প্রমাণিত হয় না যে একটা নির্দিষ্ট ধর্মই (religion-X) প্রকৃত ধর্ম। যেহেতু ঐ ধর্মের বাইরেও আরো ধর্ম (religion-Y, Z etc..) আছে আর সেগুলো ও তাদের মত করে পরকালকে নির্দেশ করে, কাজেই যে কোন একটা ধর্মকে সত্য মনে করে সার্বজনীন ভীতি তৈরি করা আর এর প্রেক্ষিতে মনের মাধুরী মিশিয়ে যুক্তি সাজানো আসলে প্রতারণার নামান্তর।
কিন্তু মুশকিল হল কোন বিশ্বাসীকেই এই লজিকের দুর্বলতা বোঝানো যাবে না। তারা প্যাস্কেলের মতোই ধরে নেন তাদের ধর্মের ঈশ্বরই প্রকৃত ঈশ্বর; আর বাকি সব ঝুটা হ্যায়। ইংরেজিতে এই ধরনের হেত্বাভাসকে বলে ‘fallacy of false dilemma/false dichotomy/bifurcation। অন্য সব অপশনকে বাতিলের খাতায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরটাকে উপরে তুলে ধরা। বাংলা ব্লগে এই প্রজাতির একটা মজার নাম আছে— ‘আল্লামা তালগাছবাদী’!
এই (চাপা) বাজির ক্রাইটেরিয়াই বা কী? কেউ বাজি ধরতে চান, সে ভালা কথা। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট ‘ক্রাইটেরিয়া ছাড়া বাজি ধরার তো কোন মানে নাই। আস্তিকতা একটা ব্যাপক আর বিস্তৃত বিষয়। একটা হিন্দুকেও আমরা আস্তিক বলি, একটা মুসলিমকেও বলি আস্তিক। এখন হিন্দুর আস্তিকতা আর মুসলমানের আস্তিকতা তো এক না। অথচ প্যাস্কেলের বাজিতে সবাইকেই এক করে দেখানো হয়েছে আর ধরে নেয়া হয়েছে নাস্তিক হলেই যেন পরপারে ‘গরম অগ্নিকুণ্ড। এক আস্তিকের সাথে আরেক আস্তিকের বিশ্বাসের বিরোধগুলো চেপে যাওয়া হয়েছে। এটা কোন বাজির ক্রাইটেরিয়া হল নাকি? আরো গুরুতর সমস্যা হইল, নাস্তিক হলেই সর্বনাশ, এই বিশ্বাসেরই বা হেতু কী? মনে পড়ে, আমি একবার ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, এরকমের–
‘ভেবে দেখলাম, আমাদের মহান ঈশ্বর হচ্ছেন নাস্তিককুলশিরোমনি, মানে সবচেয়ে বড় নাস্তিক (কারণ উনি বিশ্বাস করেন না যে কোন সৃষ্টিকর্তা তাকে বানিয়েছে),আমি নিবিষ্ট মনে তার দেখানো পথই অনুসরণ করছি মাত্র।
সত্যিই তো দুর্মুখেরা বলবেন, যে সৃষ্টিকর্তা নিজেই নাস্তিক, তিনি নাস্তিকদের গরম অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করবেন, আর আস্তিক-মোল্লাদের মাথায় করে রাখবেন, এটা কি এত সহজেই মেনে নেয়া যায়?
আর তাছাড়া যাকে আমরা এত ঘটা করে ঈশ্বর’ উপাধি দিচ্ছি, তার ঘটে তো একটু বুদ্ধিশুদ্ধিও আমরা আশা করি, নাকি! যে মোল্লারা নির্বিবাদে জিহাদ, জাতিভেদ, শরিয়া, ক্রুসেড সব কিছু বিশ্বাস করছে, নারীদের শস্যক্ষেত্র বানিয়ে রেখেছে, নাইন ইলেভেন ঘটিয়েছে, গুজরাতে দাঙ্গা লাগিয়েছে, পয়লা বৈশাখে রমনা বটমূলে গিয়া বোমা মেরেছে, চার্চে বসে শিশুকামিতা করেছে, গাছের মগডালে বসে ননী চুরি আর কৃষ্ণলীলা করেছে, নাবালিকা আর পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করে আদর্শ স্থাপন করেছে, বিধর্মীদের মুরতাদ আখ্যা দিয়েছে, চোখ বন্ধ করে হুমায়ুন আজাদকে কিংবা থাবা বাবাকে কুপিয়েছে, পুরো পৃথিবীটাকে আবর্জনার গোডাউন বানিয়ে রেখেছে— মহান ঈশ্বর পঙ্গপালের মতো তাদেরকে বেহেস্তে পাঠাবে, আর যারা যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করে এই অমানবিকতা আর নাফরমানির বিরোধিতা করল, তাদের স্থান নাকি হবে দোজখে। এতো বড় অন্যায় কি ‘প্রকৃত ঈশ্বর’ করতে পারেন? সহজ বোধশক্তিতেই সেটা অসম্ভব বলে মনে হয়। কে জানে— তাঁর কাছে হয়তো যুক্তিবাদীরাই সবচেয়ে আপন, কারণ তারা এই পৃথিবীতে যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করেছে, ভেড়ার পালের মতোন গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয় নাই। তাদেরই তো ঈশ্বরের পরীক্ষায় ফুলমার্ক পেয়ে পাশ করার কথা। সংশয়বাদী রিচার্ড ক্যারিয়ার ২০০২ সালে একটা প্রবন্ধ লিখছিলেন, শিরোনাম ‘প্যাস্কেলের ওয়েজারের সমাপ্তি— কেবল অবিশ্বাসীরাই স্বর্গে যাবেন। সেই প্রবন্ধ থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ বয়ান করা যাক[২০৪]–
