‘এমনিতে তো ধর্মগুলির পরস্পরের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। একটি যদি পূবদিকে মুখ করিয়া পূজা করিবার বিধান দেয় তো অপরটি পশ্চিম দিকে। একটি যদি মাথার চুল বড় রাখিতে বলে, অপরটি বলে দাড়িকে বড় করিতে। একটি যদি গোঁফ কাটিতে নির্দেশ দেয় তো অপরটি বলে গোঁফ রাখিতে। একটি যদি জবাই করিয়া পশু হত্যা করিতে বলে তো অপরটি বলে এক কোপে কাটিয়া ফেলিতে। এক যদি জামার গলা দক্ষিণদিকে রাখে তো অপরটি বামদিকে। একটি এঁটোর বিচার করে না, অপরটির একটি জাতির মধ্যেও অনেক ভাগ। একটি একমাত্র খোদাতালা ছাড়া পৃথিবীতে দ্বিতীয় কাহারো নাম নিতে রাজি নয়, অপরটিতে দেব দেবতাদের সীমা নাই। একটি গাভীর জীবন। রক্ষা করিতে গিয়া নিজের প্রাণ উৎসর্গ করিতে বলে তো অপরটি গো কোরবানিকে পুন্যকার্য বলিয়া মনে করে।
পাদ্রী সাহেবকে বললাম, আপনারা যেমন যীশুকে ঈশ্বর মনে করেন, মুসলিমরা তা মনে করে না। তাদের চোখে ঈশা নবী ঈশ্বর নয়, কেবল মানুষ। আপনেরা যে সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ির মতো রং বেরঙের ‘হোলি ট্রিনিটি’র ঝাপি খুলে বসেছেন— গড দ্য ফাদার, জেসাস দ্য সন, আর হোলি স্পিরিট— এই ধরণের ত্রৈমাত্রিক ঈশ্বরে মুসলিমরা বিশ্বাস করে না। এখন ইসলাম ধর্ম যদি সত্যি হয়, তাহলে তো ‘আপনের খবরাছে। কোরআনে (সুরা সূরা আল ইমরান) আল্লাহ স্পষ্টই বলছে—
‘যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত। (৩:৮৫)।
কাজেই বোঝা যাচ্ছে যে, ইসলাম সত্য হলে খ্রিষ্টান বাবা, হিন্দু বাবা, সাঁই বাবা, মঙ্গা বাবা সবাই গুষ্টিশুদ্ধ দোজখের আগুনে বেগুন-পোড়া হবে— নাস্তিক হওয়ার জন্য নয়, বরং না জেনে ভুল একটা ধর্ম পালন করে যাবার জন্য। চিন্তা করে দেখুন– আজ যে শিশুটি সুদূর উত্তর মেরুর কাছাকাছি Inuit Religion মানে এস্কিমো পরিবারে জন্মেছে, সে কেমন করে জানবে, শত সহস্র মাইল দূরে আরব মরুর বুকে চোদ্দশ বছর আগে জন্ম নেওয়া এক বেদুইনের প্রচারিত ধর্মটার ঈশ্বরই ‘আসল ঈশ্বর’? ছেলেটি না জেনে না বুঝেই মরার পরে বেগুন পোড়া হয়ে যাবে, পরম করুণাময়ের করুণ কারসাজিতে।
কিন্তু মুসলিম ভাইদের এত শান্তিতে থাকার কারণ নেই। খ্রিষ্ট ধর্মের ঈশ্বর— হলি ট্রিনিটির সেই থ্রিসাম গড– মুসলমানদের আল্লাহ থেকে অনেক আলাদা। কাজেই যদি মরার পর যদি দেখা যায় সেই খ্রিষ্টানদের ঈশ্বরই প্রকৃত ঈশ্বর— তখন কিন্তু মুসলিম ভাইদের কম্ম সাবাড়। বাইবেলে আছে—
‘আমি এ জগতে আলো রূপে এসেছি যাতে যে আমায় বিশ্বাস করে তাকে যেন অন্ধকারে থাকতে না হয়। আর যে কেউ আমার কথা শোনে অথচ তা মেনে চলে না, তার বিচার করতে আমি চাই না, কারণ আমি জগতের বিচার করতে আসিনি, এসেছি জগতকে রক্ষা করতে। যে কেউ আমাকে অগ্রাহ্য করে ও আমার কথা গ্রহণ না করে, তার বিচার করার জন্য একজন বিচারক আছেন। আমি যে বার্তা দিয়েছি শেষ দিনে সেই বার্তাই তার বিচার করবে’ (যোহন ১২: ৪৬-৪৮)।
এর মানে হচ্ছে, খ্রিষ্টান ধর্মের দেওয়া ঈশ্বরের ফরম্যাটে আপনি বিশ্বাস না করলে আপনি যতই ধর্মমানেওয়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া কামেল আদমি হন না কেন, দোজখের আগুনে পুড়বেন নিশ্চিত। কিন্তু মুসলিমদের মাথায় সেই লজিক ঢুকে না। তাদের কাছে কাছে ‘আল্লাহই প্রকৃত ঈশ্বর। কোরআনে আছে না! তারা বরং অনুসরণ করে তাদের মনমতো ‘ইসলামী যুক্তি’[২০২]–
আচ্ছা, কোরআন যে খাঁটি তা কিভাবে জানি আমরা?
— সোজা। কারণ মহান আল্লাহ তালা বলেছেন যে।
আল্লাহ যে মিথ্যে বলছেন না বুঝবো কি করে?
— খুব সহজেই। হযরত মোহাম্মদ (সঃ) বলেছেন যে।
মোহাম্মদই যে সত্যি বলছে তারই বা নিশ্চয়তা কি?
–কেন? কোরআন সাক্ষী দিয়েছে না।
বাহ! কোরআনই যে সত্যি কথা বলছে সেটাই বা কে বললো?
— কেন? জান না বুঝি? আল্লাহইতো বলেছেন যে কোরআন সত্যি।
এতো ত্যানা পাচাও ক্যান শুনি?
এখন ইহুদী, খ্রিষ্টান আর মুসলমানদের অনাদি উৎস আব্রাহামিক ধর্মগুলো সব একেশ্বরবাদ শিক্ষা দেয়। একজন ঈশ্বরই আসমানের আরশে বসে আছেন, তিনিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু তৈরি করছেন ছয় দিন ধরে। আবার অন্য দিকে প্যাগান উৎস থেকে আসা হিন্দুরা লক্ষ কোটি দেব দেবীতে বিশ্বাস করে। মুসলমানেরা মূর্তি পূজাকে শিরক সমতুল্য অপরাধ মনে করে। আর অন্যদিকে হিন্দুরা বুকে পেটে গলায় ঘন্টা বেঁধে মূর্তির সামনে জপ করতে বসে যায়। মুসলমানেরা গরু খেয়ে সাফ করে ফেলে তো হিন্দুরা তাকে মা ডেকে কুল পায় না। অন্য ধর্মের আচার ব্যবহার তুক তাক আর মন্ত্ৰ-টন্ত্রে এত ধরনের পরস্পরবিরোধিতা থাকলে কী হবে, বিধর্মীদের ক্ষেত্রে তার হুশিয়ারি একই রকমের—
‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহ।
মানে সোজা কথা হল হিন্দু ধর্মে থেকে জুতার বারি খাওয়াও বোধ হয় ভাল, অন্য ধর্মে যাওয়ার চেয়ে। কাজেই মুসলিমরা যদি পরপারে গিয়ে দেখেন, আখেরাতের ময়দানে আল্লাহ সুবানআল্লাহ তায়লা বসে নেই— বরং পীনোন্নত কালা পাহাড়সম মা-কালী খড়গ উঁচিয়ে রয়েছে এবং মোল্লা দেখলেই সমানে কোপাচ্ছে— তখন আঙ্কেল প্যাস্কেল কিংবা হুজুরেআলমপনা মুহম্মদ (সঃ) কারো নাম নিয়েই বোধ করি বাঁচতে পারবেন না। বলা বাহুল্য, তারা শাস্তি পাবেন নাস্তিকতার জন্য না, আগাগোড়া ভুল একটি ধর্মে বিশ্বাসের কারণে।
