এই যুক্তিটা আসলে পুরানো। বলা হয় ফরাসী দার্শনিক কাম গণিতবিদ ব্লেই প্যাস্কেল (১৬২৩– ১৬৬২) নাকি এই যুক্তিটা একসময় দিয়েছিলেন, তাই একে বলে। প্যাস্কেলের ওয়েজার বা প্যাস্কেলের বাজি। বলা হয়, যে সমস্ত অবিশ্বাসীরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রথাগত ‘যুক্তিগুলোতে সন্তুষ্ট নন, তাদের জন্য সম্ভাবনার গণিত ব্যবহার করে যুক্তিমালা সাজিয়েছিলেন ঈশ্বর-বিশ্বাসী প্যাস্কেল। ভেবেছিলেন এটা হবে নাস্তিকদের কফিনে শেষ পেরেক। প্যাস্কেলের ভাষাতেই—
‘If you believe in God and turn out to be incorrect, you have lost nothing— but if you don’t believe in God and turn out to be incorrect, you will go to hell. Therefore it is foolish to be an atheisť.
নাস্তিকেরা যে কত বড় গাধা’ সেটা আবার নানা ধরণের ছক টক কেটে দ্বিমাত্রিক ম্যাট্রিক্স বানিয়ে একেবারে গাণিতিক ভাবে প্রমাণ করে দেন প্যাস্কেল।
কিন্তু তার গণিতের শুভঙ্করের ফাঁকি তিনি ধরতে না পারলেও অন্যরা ঠিকই ধরে ফেলেছিল। আসলে তার সম্ভাবনার সূত্রে ফাঁক ফোকর এতই বেশি যে একে গণিত না বলে গোঁজামিল বলাই ভাল। যে ব্যক্তিকে ‘ফাদার অব মডার্ন প্রোবাবিলিটি’ বলে উপাধি দেয়া হয়েছে তার মাথা থেকে এমন দুর্বল গণিতে খোঁজা যুক্তি বেরিয়ে এসেছিল, যে ভাবতেই এখন অবাক লাগে। চলুন দেখা যাক এই প্যাস্কেলীয় (মামদো) বাজির দুর্বলতাগুলো কী কী ….
কোন ধর্ম সত্য ধর্ম? আর সত্যিকার ঈশ্বরটাই বা কোনটা? এক্ষেত্রে প্রথম সমস্যাটা হল— কি করে বোঝা যাবে কোন ধর্মটা সঠিক, আর সত্যিকার ঈশ্বরই বা কোনটা? প্যাস্কেল সাহেব ছিলেন রোমান ক্যাথলিক। তার কাছে ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ধর্মের ঈশ্বরই ছিলেন সত্যিকার ঈশ্বর। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে তার ক্যাথলিক ধর্মের ঈশ্বরকে সত্য প্রমাণের জন্য কষ্ট টষ্ট করে যে যুক্তিমালা সাজিয়েছিলেন, তা দেদারসে এখন ব্যবহার করেন প্রটেস্টান্ট, ইসলামিষ্ট, বুদ্ধি, হিন্দু, জৈন— সবাই, তারা সবাই নিজ নিজ ধর্মের ঈশ্বরকে সত্যিকারের ঈশ্বর মনে করেন। প্যাস্কেলীয় যুক্তিতে ‘ঈশ্বর যদি থাকে আমরা যামু বেহেস্তে আর আপনেরা খাইবেন হের কোপানি’— এই হুমকি থাকলেও হুমকিতে বলা নাই, কোন ধর্ম অনুসরণ করলে কোপানি থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁচা যাবে। এটাকে ইংরেজিতে বলে ‘Avoiding the wrong hell dilemma’। হ্যাঁ, আপনি সঠিক ধর্ম অনুসরণ করলে স্বর্গে যাবেন, কিংবা নরকের আগুন থেকে হয়তো বাঁচবেন; কিন্তু আপনি যদি ভুল ধর্মের অনুসারী হয়ে মারা যান, কোন উপায় নাই— সেই নরকই হবে আপনার ভবিতব্য।
এখন কথা হল, সব ধর্মবিশ্বাসীরাই হুক্কা-হুঁয়া রব তুলে ঘোষণা দেয়, তার নিজের ধর্মটাই সঠিক। তাদের কখনোই মনে হয় না যে, সারা জীবন ধরে মিথ্যা একটা ধর্ম পালন করে মারা যাচ্ছেন আর মরার পর নরকে যাওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন। এটাই হল সমস্যা। জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ সিম্পসনের একটি চরিত্র হোমার সিম্পসনের একটা ক্লাসিক উক্তি— “Suppose we’ve chosen the wrong god. Every time we go to church we’re just making him madder and madder.’ আপনি এই দার্শনিক সমস্যাটা ধর্মবাদীদের ধরিয়ে দিলে একটুক্ষণের জন্য হয়ত তার থমকাবেন, কিন্তু আবার সম্বিত ফিরে পেয়ে আপনাকে বুঝিয়ে দিবে, আরে ‘আমার ধর্মই যে সঠিক সেটা তো দেখলেই বুঝা যায়।
একবার এক খ্রিষ্টান পাদ্রী কি কারণে যেন আমার বাসায় এসেছিল। এসেই ‘যীশু যীশু’ করে মুখে ফ্যানা তুলে ফেললো আর আমাকে ‘হেদায়েত’ শুরু করে দিল, আমদের দেশের ‘তবলীগ পার্টি’র মতন অনেকটা। যখন খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না, এবং শুনলেন আমি নাস্তিক, ওমনি যীশুর মহিমা কীর্তন বাদ দিয়ে প্যাস্কেলের (কু) যুক্তি হাজির হয়ে গেল … “ঈশ্বর যদি সত্যি সত্যি একজন থাকেন এবং … তখন আপনারা … দোজখে …”। আমি বললাম কিন্তু সত্যিকারের ঈশ্বর যে যীশুই হবেন এটা স্বতঃসিদ্ধ ভাবে বুজে গেলেন কী ভাবে, মা কালী বা গণেশ বাবা সত্যিকার ঈশ্বর হলে কিন্তু ভাই আপনার খবর আছে’! এত যীশু যীশু করার পরেও তো সেই নরকের আগুনে পুড়বেন। পাদ্রী সাব একটু থমকালেন, তারপরেই একগাল হেসে বললেন— “আহ! আরে গণেশ টনেশ আবার ঈশ্বর হৈতে পারে নাকি, যীশুই আসল ঈশ্বর’। তা তো বটেই, পেট মোটা হাতীর শুরওয়ালা মোটা মাথা গণেশ আসল ঈশ্বর হতেই পারে না, যীশুই হচ্ছেন প্রকৃত ঈশ্বর, যিনি অলৌকিক উপায়ে কুমারী মাতা মেরির গর্ভে হাজির হয়েছিলেন, এবং পরিণত বয়সে, বোবা কালা খঞ্জ পঙ্গু সবাইকে হাতের ছোঁয়ায় নীরোগ করে দিয়েছিলেন, আর ক্রুশবিদ্ধ করার পরেও পুনরুত্থিত হয়েছিলেন কবর থেকে!
এখন পাদ্রীকে কীভাবে বোঝাই— এই পৃথিবীতে হাজারটা ধর্ম, হাজারটা বিশ্বাস পাখা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে। সবাই যে যার মত নিজেদের ‘সহি ধর্ম’ বলে জিকির তুলছে আর নিজের ঈশ্বরকে আসল ঈশ্বর বলে দাবী করছে। বহু ধর্ম আবার একটা আরেকটার সাথে আক্ষরিক অর্থেই দায়ে-কুমড়ায় সম্পর্ক, এক ধর্মের বিশ্বাসের সাথে আরেক ধর্মবিশ্বাসের আকাশ পাতাল তফাত। রাহুল সাংকৃত্যায়নের উদ্ধৃতি দিয়েই বলি[২০১]–
