৬) তত্ত্ব থেকে আরো নতুন নতুন অনুসিদ্ধান্তে বা অবরোহে উপনীত হওয়া, পূর্বাভাস প্রদান করা। নতুন পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ দ্বারা বারংবার এগুলো সঠিক বলে প্রমাণিত হলে, প্রপঞ্চটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কিছু প্রপঞ্চকে তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করতে পারলে, তত্ত্বটিকে প্রাকৃতিক আইনের (Natural Law) মর্যাদা প্রদান করা হয়।
কাজেই উপরের পয়েন্টগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারছি– বিজ্ঞান ভাববাদ ভাগ্যবাদ কিংবা বিশ্বাস কোন কিছুর উপরই টিকে নেই– টিকে আছে এবং থাকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নির্ভর নিগুঢ় পদ্ধতির উপরে। বিজ্ঞানে তত্ত্বের ভাঙ্গা চোরা চলে নিয়ত, হয় পুরনো তত্ত্বের পতন, কিংবা নতুন তত্ত্বের উত্থান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়মাল্য যায় বিজ্ঞানের গলাতেই। বিজ্ঞানে কোন কিছুই পাথরে খোদাই করে লেখা হয় না। বরং বিজ্ঞান নির্দয়ভাবে সংশয়ের তীর হানতে থাকে সর্বক্ষণ তা যে রথী মহারথীর তত্ত্বই হোক না কেন। অনেকেরই হয়তো মনে আছে ২০১১ সালে সার্নের “অপেরা” প্রজেক্টের একটি গবেষণা থেকে পাওয়া ফলাফলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে নিউট্রিনো আসার। আলামত পাওয়া যাচ্ছিল, যা কিনা আইনস্টাইনের তত্ত্বের লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছিল[১৯৮]। বিজ্ঞানের এই সংশয়, এই পরিবর্তনশীলতাই বিজ্ঞানের এগিয়ে চলার শক্তি। অনেকেই সেটার মর্ম না বুঝে একে ধর্মবিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক বিশ্বাসের মতোই এক ধরণের বিশ্বাস বলে মনে করেন। এটি সত্য নয়। বিজ্ঞান সংশয় করে বলেই আইনস্টাইনের মত বিজ্ঞানীকেও পর্যবেক্ষণবিদেরা সেসময় ছাড় দেয়নি। তারা সতোর সাথে নিজেদের পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন এবং প্রশ্ন করেছিলেন সত্যই আইনস্টাইন ভুল প্রমাণিত হবার দ্বারপ্রান্তে কিনা। সেসময় (২০১১ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর) গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি ব্যতিক্রমী নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল ‘Faster than light story highlights the difference between science and religion’ শিরোনামে। সেখানে লেখক স্পষ্ট করেছেন, বিজ্ঞান কখনোই কোন কিছুকে বিশ্বাস করে বসে থাকে না, বরং পুনঃ পুনঃ পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান’ এর আলোয় নিজেকে আলোকিত করে এগিয়ে যেতে চায়। বিজ্ঞান স্থবির নয়, প্রগতিশীল। পরে অবশ্য দেখা গিয়েছিল সার্নের সেই পরীক্ষায় জিপিএস ইউনিটের সাথে কম্পিউটার কানেকশনের ঝামেলার কারণে ভুল ফলাফল এসেছিল, আইনস্টাইনের তত্ত্বে আসলে ভুল নেই[১৯৯]।
কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, আইনস্টাইনের তত্ত্বের ভুল পাওয়া গেলে সেই তত্ত্ব প্রত্যাখ্যাত হতে সময় লাগত না। পর্যবেক্ষণের সাথে তত্ত্ব না মিললে, প্রাচীন কালের কোন পয়গম্বরের কিংবা দেবদূতের বাণীর মতো আঁকড়ে ধরে ফুল চন্দন যোগে কারো পুজো চলে না বিজ্ঞানে। বিজ্ঞানে পবিত্র তত্ত্ব বলে কিছু নেই। এখনে পল ডেভিস কিংবা একশ জন বিশেষজ্ঞের অভিমতের মূল্য নগণ্য। বরং নিগুঢ় এবং নির্ভুল পরীক্ষণ, এবং সেই পরীক্ষণ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল, যা আবার অন্যদের দ্বারা পুনঃ-পরীক্ষিত এবং সমর্থিত হবে– সেটাই বিজ্ঞানের রায় বলে বিবেচিত। তাই আমাদের আস্থা থাকবে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানের প্রক্রিয়ার প্রতি, সেখান থেকে পাওয়া নির্মোহ রায়ের উপরেই, বিশ্বাসের উপরে নয়।
.
নাস্তিকতাও কি এক ধরণের বিশ্বাস?
ব্লগে তর্ক বিতর্ক করতে গিয়ে অনেককেই বলতে শুনি, আস্তিক্যবাদের মতো নাস্তিক্যবাদও নাকি এক ধরনের বিশ্বাস। আস্তিকরা যেমন ‘ঈশ্বর আছে এই মতবাদে বিশ্বাস করে, তেমন নাস্তিকরা বিশ্বাস করে ঈশ্বর নেই’- এই মতবাদে। দুটোই নাকি বিশ্বাস। যেমন, একবার মুক্তমনা ব্লগে এক ভদ্রলোক তর্ক করতে গিয়ে বলে বসলেন
‘নাস্তিক মানেই বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর নেই। কিন্তু ঈশ্বর নেই’ এটি প্রমাণিত সত্য নয়। শুধু যুক্তি দিয়েই বোঝানো সম্ভব ‘ঈশ্বর নেই’
বিবৃতিটি আসলে ফাঁকিবাজি’। নাস্তিক মানেই বিশ্বাসী, কিংবা নাস্তিকতাবাদও একটি বিশ্বাস- এগুলো ঢালাওভাবে আউরে দিয়ে নাস্তিকতাবাদকেও এক ধরনের ‘ধর্ম হিসেবে হাজির করার চেষ্টাটি আমরা বহু মহলেই দেখেছি। নাস্তিকদের এভাবে সংজ্ঞায়ন সঠিক কি ভুল, তা বুঝবার আগে ‘নাস্তিক’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থটি আমাদের জানা প্রয়োজন। নাস্তিক’ শব্দটি ভাঙলে দাঁড়ায়, নাস্তি + কন বা নাস্তি+ক। ‘নাস্তি’ শব্দের অর্থ হলো নাই, অবিদ্যমান। নাস্তি শব্দটি মূল সংস্কৃত হতে বাংলায় এসে ‘ক’ বা ‘কন’ প্রত্যয় যোগে নাস্তিক হয়েছে যা তৎসম শব্দ হিসেবে গৃহীত। ন আস্তিক = নাস্তিক– যা নঞ তৎপুরুষ সমাসে সিদ্ধ এবং আস্তিকের বিপরীত শব্দ। আরো সহজ বাংলায় বললে বলা যায়, না + আস্তিক = নাস্তিক। খুবই পরিষ্কার যে, সঙ্গত কারণেই আস্তিকের আগে ‘না’ প্রত্যয় যোগ করে নাস্তিক শব্দটি তৈরি করা হয়েছে। আস্তিকরা যে ঈশ্বর/আল্লাহ/খোদা ইত্যাদি পরম সত্তায় বিশ্বাস করে এ তো সবারই জানা। কাজেই নাস্তিক হচ্ছে তারাই, যারা এই ধরনের বিশ্বাস হতে মুক্ত। তাই সংজ্ঞানুযায়ী নাস্তিকতা কোনো বিশ্বাস নয়, বরং বিশ্বাস হতে মুক্তি বা বিশ্বাসহীনতা’। ইংরেজিতে নাস্তিকতার প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘Atheist’T সেখানেও আমরা দেখছি theist শব্দটির আগে ‘a’ প্রিফিক্সটি জুড়ে দিয়ে Atheist শব্দটি তৈরি করা হয়েছে। নাস্তিকতা এবং মুক্তচিন্তার উপর বহুল প্রচারিত গবেষণাধর্মী একটি ওয়েব সাইটে শব্দটির সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এভাবে–
