আজকের দিনের পরিবর্তিত পরিবেশে বিজ্ঞানীদের উপর এত ঢালাওভাবে অত্যাচার করা কিংবা ডাইনি পোড়ানোর মতো তাদের পুড়িয়ে মারা না গেলেও ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দল সুযোগ পেলে এখনো বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঠেকাতে মুখিয়ে থাকে। যখনই বিজ্ঞানের কোনো নতুন আবিষ্কার তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত বিশ্বাসের বিপরীতে যায়, খোদ বিজ্ঞানকে ফেলে দিতে চায় আস্তাকুঁড়ে। তাতে অবশ্য লাভ হয় না কিছুই। অযথা গোলমাল বাধিয়ে নিজেরাই বরং সময় সময় হাস্যাস্পদ হন। অধিকাংশ ধার্মিকেরাই এখনো বিবর্তন তত্ত্বকে মন থেকে মেনে নিতে পারেন নি কারণ ডারউইন প্রদত্ত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের অবস্থান ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত সৃষ্টির কল্পকাহিনিগুলোর একশ আশি ডিগ্রী বিপরীতে। এখনো সুযোগ পেলেই ধর্মান্ধ মোল্লার দল প্রগতিশীল দার্শনিক, বিজ্ঞানী কিংবা সাহিত্যিকদেরকে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দেয়, চাপাতি দিয়ে কোপায় কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করে। এ তো গেল আমাদের মতো দেশগুলোর অবস্থা। তথাকথিত ‘উন্নত বিশ্বে এখনো অশিক্ষিত আর অর্ধশিক্ষিত পাদ্রি আর মোল্লারা উপযাজক সেজে বিজ্ঞানীদের পরামর্শ দিতে আসে বিজ্ঞানীদের কোন গবেষণা নৈতিক, আর কোনটা অনৈতিক।
ইদানীং আবার কোন কোন মহল থেকে এক ধরনের কুযুক্তি বাজারে এসেছে, বিজ্ঞানও নাকি বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। আগে ব্লগে বা ফোরামে ধর্মবাদীরা এ যুক্তি দিতেন, ইদানীং কিছু বিজ্ঞানীও যুক্ত হয়েছেন এই ধরণের প্রচারে। পল ডেভিস এমন একজন। পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে ভালো তাত্ত্বিক কাজ আছে তার। সেইসাথে তিনি একজন। বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখকও বটে। কিন্তু পল ডেভিস মাঝে মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞানের বইপত্তরগুলো পাশে তুলে রেখে ঢুকে পড়তে চান আধ্যাত্মিক জগতে। পল ডেভিস ২০০৭ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এ লেখা একটি প্রবন্ধে বিজ্ঞানকে আখ্যায়িত করেন ধর্মের মতো নতুন এক ধরনের বিশ্বাস ব্যবস্থা হিসেবে।
ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করতে যেয়ে তিনি বলেন[১৯৬], প্রকৃতি যৌক্তিক এমন একটি বিশ্বাসকে পুঁজি করে বিজ্ঞান এগিয়ে চলে’। তিনি আরও বলেন, যদি ঈশ্বর থেকেই থাকে সেক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া সিদ্ধান্ত নয় বরঞ্চ ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাই পারবে তা জানতে।
কেন? বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কাজ করে। ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা যাই হোক না কেন, সেটা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। আর যখনই কিছু পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে তখনই বিজ্ঞান সেটি নিয়ে কাজ করতে সক্ষম। পল ডেভিসের ‘বিজ্ঞানও বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত’—এই বক্তব্য যথারীতি তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তার সহকর্মী অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মাঝে।
Edge পত্রিকার পক্ষ থেকে পল ডেভিসের এই প্রবন্ধের সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল[১৯৭]। সে সমালোচনাগুলো করেছিলেন জেরেমি বার্নস্টেইন, শন ক্যারল, স্কট অ্যাট্রান, লরেন্স ক্রাউস, নেথান মার্ভোন্ড, জেরি কয়েন প্রমুখ খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরা। বহু বিজ্ঞানীই আবার নিউইয়র্ক টাইমসে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন পল ডেভিসের এই ধারনা একেবারেই ভ্রান্ত। যেমন, নিউইয়র্ক সিটি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যালেন সোকাল পাঠানো চিঠিতে লিখেছিলেন,
প্রিয় সম্পাদক,
পল ডেভিসের দাবীকৃত (সম্পাদকীয়, নভেম্বর ২৪) বিজ্ঞান এবং ধর্ম উভয়েই বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত খুবই ভ্রান্ত অনুধাবন বলে আমার মনে হয়েছে। বিজ্ঞান কার্যকরী অনুকল্পের উপর উপর ভিত্তি করে কাজ করে, এবং পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এর সত্যতা নির্ধারণ করে। এটি আমাদের বিগত চার শতকের প্রায়োগিক প্রক্রিয়া, যেটা সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এটাকে ধর্মীয় বাণী এবং বিশ্বাস নির্ভর কাঠামোর সাথে তুলনা করাটা বালখিল্যই। দুটো বিপরীত মেরুর জিনিসকে একই রকম হিসেবে চালিয়ে দেয়াটা এবং দুটোর ভিত্তিই বিশ্বাস বলে দাবী করাটা বোকামি। বিশেষত সমগ্র মানবতা যখন বিভিন্ন ধারার বিশ্বাসের পদাঘাতে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হয়ে চলেছে, তখন এ ধরণের দাবী পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে তুলবে। এই ধরনের দাবী সম্বলিত লেখা অপরিণামদর্শী এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনও বটে।
— অ্যালেন সোকাল
সোকাল মিথ্যে কিছু বলেন নি। সেকালের কথার মর্মার্থ বুঝতে হলে আমাদের বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে সেটা ভালমতো বোঝা চাই। বিজ্ঞান কিন্তু বিশ্বাসের উপর টিকে নেই, টিকে আছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। মোটা দাগে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতির অনুক্রমটি হল এরকম—
১) প্রাকৃতিক ঘটনা বা প্রপঞ্চের পর্যবেক্ষণ করা
২) প্রপঞ্চের কারণ অনুমান করে একটা সাময়িক বা অস্থায়ী ব্যাখ্যা বা অনুকল্প প্রদান।
৩) কৃত্রিম পরিবেশে পরীক্ষা করা। পরীক্ষা থেকে পাওয়া যায় ডেটা বা উপাত্ত।
৪) প্রাপ্ত উপাত্ত পূর্বোক্ত অনুকল্প বা অনুসিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা যাচাই করা।
৫) প্রাপ্ত উপাত্তের বিশ্লেষণ অনুকল্পটির সাথে মিলে গেলে বার বার পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করা হয়। এতে কোন ব্যতিক্রম না পাওয়া গেলে অনুকল্পটিকে ‘তত্ত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। আর অনুকল্পের সাথে উপাত্তের বিশ্লেষণ না মিললে পুর্বের অনুকল্পটি বাতিল করা হয় এবং শুরু হয় নতুন অনুকল্পের অনুসন্ধান।
