স্বাস্থ্য, নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা, ভাল রেজাল্ট, চাকুরীর প্রমোশন, বিত্ত বা আরো বৃহৎ কোন লক্ষ্য যেমন বিশ্ব শান্তি ও মানব জাতির দুর্দশার অবসান ইত্যাদি হাজারো নানান বিষয়ে প্রতিদিন মানুষ সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করে থাকে। প্রার্থনা যে সবসময় ভাল কিছুর জন্যই করা হবে তা কিন্তু নয়। খারাপ উদ্দেশ্যেও প্রার্থনা করা হতে পারে। কেউ কেউ দেখা যায় চুরি চোট্টামি, ডাকাতি, প্রতারণা, ধান্ধাবাজি বা ভয়ংকর প্রতিশোধের জন্যও ঈশ্বরের হস্তক্ষেপ কামনা করে থাকে।
ফরিদ আহমেদ ভুল বলেননি। প্রার্থনা বর্তমানে সারাবিশ্বে যেন এক ‘নয়া কুটির শিল্পে পরিণত হয়েছে যেন। প্রার্থনার ফলে রোগ নিরাময় হয়ে যায়– এই ভ্রান্ত ধারণার উপর নামী দামী সব জার্নালে অসংখ্য তথাকথিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল ছাপার কথা বলা হয় মিডিয়ায়। গত দশ বছরে প্রার্থনার সাহায্যে অনেক জটিল রোগীদের নিরাময় করা গিয়েছে’ ধরণের দাবী সম্বলিত কমপক্ষে আধ ডজন বই বেস্ট-সেলারের তালিকায় উঠেছে। নিউজ উইকের মত আরো অনেক ম্যাগাজিনের কভার স্টোরিও হয়েছে এই বিষয়কে নিয়ে। ডেটলাইন এনবিসি-র মত টেলিভিশনের কোন কোন প্রোগ্রামের পুরোটাই প্রার্থনাকে কেন্দ্র করে হয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসক ল্যারি ডোসি তার “Prayer is Good Medicine: How to Reap the Healing Benefits of Prayer’ এবং “Healing Words: The Power of Prayer and Practice of Medicine’ প্রভৃতি ছদ্মবৈজ্ঞানিক বইয়ে প্রার্থনা যে রোগ নিরাময়ে দারুণভাবে কাজ করে তার অনেক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে– এই ধারণাকে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করতে যেন উঠে পড়ে লেগেছেন।
কিন্তু আদৌ কি প্রার্থনা কি কাজ করে? আসলে প্রার্থনা কাজ করার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ তো পাওয়া যায়ই নি, বরং কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সম্পূর্ণ উলটো ফলাফল বেরিয়ে এসেছে। যেমন, ডিউক ইউনিভার্সিটির চিকিৎসকদের তিন বছর ধরে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ফলদায়ক প্রার্থনার প্রভাব যাচাইয়ের জন্য আমেরিকার নয়টি হাসপাতালের ৭৪৮ জন রোগীর উপর গবেষণা চালানো হয়। লে এবং মোনাস্টিক। ক্রিশ্চিয়ান, সুফি মুসলিম এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ সারা বিশ্বের বারোটি প্রার্থনা গ্রুপ এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রার্থনা ই-মেইলের মাধ্যমে জেরুজালেমেও পাঠানো হয়েছিল। করোনারি আর্টারি অবস্ট্রাকসনের রুগীদের কম্পুটারের সাহায্যে এলোপাথাড়ি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয় এবং বারোটি প্রার্থনা গ্রুপের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গ্রুপগুলো রোগীদের সম্পূর্ণ আরোগ্যের জন্য প্রার্থনা করে। এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছিল দ্বৈত অন্ধ (Double blind)। হাসপাতালের স্টাফ বা রোগী কেউই জানতো না কার জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে। The Lancet জার্নালে প্রকাশিত ফলাফল থেকে দেখা যায় যে, দুই গ্রুপের নিরাময় হওয়া এবং স্বাস্থ্যের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ কোন পার্থক্য নেই। একই রকম আরেকটা স্টাডি হয়েছিল হার্ভার্ড এবং মায়ো ক্লিনিকের তত্ত্বাবধানে– যেটা স্টেপ স্টাডি’ নামে পরিচিত। ১৮০২ জন রোগীর উপর পরীক্ষার ফলাফল আরো চমকপ্রদ। স্টেপ স্টাডি থেকে পাওয়া ফলাফলে দেখা গেছে, প্রার্থনা তো কোন কাজে আসেই না, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রার্থনা বরং মানসিক উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। যাদের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে, দেখা গিয়েছিলো পরবর্তীতে তাদের অনেকেরই শারীরিক অবস্থার অবনমন ঘটেছে। এটা কেন হল গবেষকেরা হলফ করে বলতে পারেননি, তবে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে তারা বলেছেন, যে সমস্ত রোগী জানতে পেরেছে যে তাঁদের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে, তারা ভেবে নিয়েছে তাদের অবস্থা এতোটাই গুরুতর যে সঙ্ঘবদ্ধ প্রার্থনার দরকার পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে উদ্বেগের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর সেই সাথে ঘটেছে শারীরিক জটিলতা বৃদ্ধি[১৭৭]। তবে ‘নেগেটিভ’ ফলাফলের ব্যাপারটা যদি আমরা বাদও দেই এটা নিশ্চিত, প্রার্থনার কোন সুপ্রভাব নেই, অন্তত নিরপেক্ষ গবেষণায় তা পাওয়া যায়নি।
আর রোগাক্রান্ত রোগীকে ডাক্তারের কাছে না নিয়ে কেবল প্রার্থনা করলে কি দুর্ভোগ রোগী এবং পরিবারের জন্য বয়ে আনতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। কিশোরী মেডেলিন কারা নিউম্যান নিজের জীবন দিয়ে সেটা আমাদের দেখিয়ে গেছে। কিন্তু তারপরেও আমাদের চারিদিকের বিশ্বাসের ভাইরাসাক্রান্ত মন অনেক সময়েই সেটা বুঝতে সক্ষম হয় না।
.
বিশ্বাসের কি আদৌ দরকার আছে?
অনেকেই মনে করেন বিশ্বাস না থাকলে জীবনের কোন অর্থ থাকে না। শিক্ষা, যুক্তি, জ্ঞান প্রভৃতির যেমন দরকার হয় জীবনে, বিশ্বাসেরও দরকার আছে। নইলে জীবন নাকি ‘পরিপূর্ণ হয় না। আমি মনে করিনা সেটা সত্য। বিশ্বাস’ ব্যাপারটিই দাঁড়িয়ে আছে একটি ‘অপ-বিশ্বাসমূলক প্রক্রিয়ার উপর। ড. হুমায়ুন আজাদের একবার একটি উক্তি করেছিলেন সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে, যা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক:
‘যে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই, যার কোনো অস্তিত্ব নেই যা প্রমাণ করা যায় না, তাতে মানুষকে বিশ্বাস করতে হয়। মানুষ ভুতে বিশ্বাস করে, পরীতে বিশ্বাস করে বা ভগবানে, ঈশ্বরে বা আল্লায় বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাস সত্য নয়, এগুলোর কোনো বাস্তবরূপ নেই। মানুষ বলে না, আমি গ্রাসে বিশ্বাস করি বা পানিতে বিশ্বাস করি, মেঘে বিশ্বাস করি। যেগুলো নেই সেগুলোই মানুষ বিশ্বাস করে। বিশ্বাস একটি অপবিশ্বাসমূলক ক্রিয়া। যা সত্য, তাতে বিশ্বাস করতে হয় না; যা মিথ্যে তাতে বিশ্বাস করতে হয়। তাই মানুষের সব বিশ্বাস ভুল বা ভ্রান্ত, তা অপবিশ্বাস।
