কথাটি মিথ্যে নয়। বিশ্বাস অপ্রয়োজনীয় তো বটেই উপরন্তু এটা ক্ষতিকর, এবং এমনকি তা তৈরি করতে পারে ভাইরাসের এবং মহামারীর; এবং সেটা করেও। বিশ্বাসের একনিষ্ঠ অনুগামীরা বিধর্মীদের হত্যা করা শুরু করে, ডাইনি পোড়ানোতে কিংবা সতীদাহে মেতে উঠে, কখনো গণ-আত্মহত্যায় জীবন শেষ করে দেয় কিংবা বিমান নিয়ে সোজা হামলে পড়ে টুইন টাওয়ারের উপর।
কিন্তু তারপরেও কি বিশ্বাস বলে কি কিছু লাগে না? এমনকি আমরা মুক্তমনারাও যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, প্রগতিতে বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করি মানবতায় বলি, সেগুলো? প্রশ্নটি করেছিলেন এক পাঠক আমাকে ফেসবুকে। সত্যই তো আমরা বহু কিছুতেই ‘বিশ্বাস করি’ বলি। তাহলে বিশ্বাস বাবাজিকে এড়ানো যাচ্ছে কই? কিন্তু আমার মতে, সে ‘বিশ্বাস’গুলো আসলে বিশ্বাস নয়, আস্থার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের আস্থা আছে গণতন্ত্রে, প্রগতিতে কিংবা মানবতায়। এই আস্থা আমাদের এমনিতে গড়ে ওঠেনি। উঠেছে বহুদিনের অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতিতে। আমরা আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রপরিচালনার যে উপাত্ত পাচ্ছি– সে অভিজ্ঞতায় জেনেছি স্বৈরতন্ত্র কিংবা মোল্লাতন্ত্রের চেয়ে গণতন্ত্র অনেক বেশি কার্যকরী। তেমনি, প্রগতি কিংবা মানবতাবাদকেও আমরা বিভিন্নভাবে পাওয়া উপাত্তের কষ্টিপাথরে যাচাই করেছি বলেই এগুলোতে আমাদের আস্থার প্রতিফলন ঘটছে। এখানে বিশ্বাসের আসলে কোন স্থান নেই।
আমরা অনেক সময়ই না ভেবে কিছু বাক্য বলে ফেলি, যা থেকে মনে হতে পারে বিশ্বাসটাই মুখ্য। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই দেখা যায়, এই ধরণের বাক্যে ব্যবহৃত ‘বিশ্বাস করা (believe) শব্দটি সহজেই অন্য কোন শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়। যেমন এই বাক্যটি—
‘আমি বিশ্বাস করি আজ রাতে বৃষ্টি হবে। এটাকে আসলে সহজেই ‘মনে করি’ (think) দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়–
‘আমি মনে করি আজকে বৃষ্টি হবে।
এরকম অনেক কিছুই আমরা চলতি কথায় বলি। এমনকি বিজ্ঞানের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও মাঝে সাঝে এ ধরনের বাক্য ব্যবহার করে বসেন–
‘আমরা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি বিশ্বাস করব ততক্ষণই, যতক্ষণ সেটা সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে সমর্থিত হবে’।
উনি আসলে বলতে চাইছেন—
‘আমরা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি ব্যবহার করব ততক্ষণই, যতক্ষণ সেটা সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে সমর্থিত হবে।
কাজেই এ ব্যাপারেও বিশ্বাসের কোন দরকার পড়ছে না। বিশ্বাস বলতে আসলে সাক্ষ্য প্রমাণহীনভাবে কোন ধারনা কিংবা সত্ত্বার উপর নির্ভরতা বোঝায়, বোঝায় স্রেফ অন্ধ আনুগত্য। আর এ ধরণের অন্ধ আনুগত্যের কুফল সম্বন্ধে নতুন কিছু আর বোধ হয় দরকার নেই। প্রতিটি বিশ্বাস-নির্ভর গ্রন্থের বিভিন্ন আয়াত এবং শ্লোকে বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে ঢালাওভাবে, কখনো দেয়া হয়েছে হত্যার নির্দেশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্ম আসলে জ্বিহাদ, দাসত্ব, জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, হোমোফোবিয়া, অসহিষ্ণুতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নির্যাতন এবং সমঅধিকার হরণের মূল চাবিকাঠি হিসেবে প্রতিটি যুগেই ব্যবহৃত হয়েছে। শুধু অতীতে হয়, আজকের এই প্রযুক্তিময় একবিংশ শতকেও এটা ভয়াবহ রকমের বাস্তব। বইয়ের এই অংশটা লেখার সময় বিভিন্ন খবরে চোখ বোলাচ্ছিলাম। ফলাফল মোটেই শুভ হল না, বলাই বাহুল্য—
- বিবর্তনীয় পথে কুকুর কিভাবে মানুষের পোষা জীবে পরিণত হয়েছে তা সবার জানা থাকলেও ইসলামী শরিয়া বিজ্ঞান বলছে ‘কুকুরকে পোষ মানানো যায় না[১৭৮]
- বাংলাদেশে মাত্র ছয় বছর বয়সী এক মেয়ে জামে মসজিদের ইমামের যৌন হয়রানীর শিকার[১৭৯]।
- ১৯ জনকে হত্যা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছে নাইজেরিয়ার ইসলামিস্টদের দল[১৮৯]।
- বাগদাদে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা গেছে কমপক্ষে ৩৮ জন[১৮১]।
- যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দিল্লি পুলিশ আটক করেছে আশ্রমের নারায়ণ সাঁইকে[১৮২]।
- পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ট্রেন হামলায় শান্তিবিরোধী ৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে[১৮৩]।
- ক্যাথলিক চার্চ তাদের যৌনকুকীর্তির কাহিনি জাতিসংঘকে জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে[১৮৪]।
- অযোধ্যার সাধু সন্ন্যাসীরা হত্যা, চোরাচালান, মাদকসেবন সহ নানা অপরাধচক্রের সাথে জড়িত বলে রিপোর্টে প্রকাশ[১৮৫]।
- খ্রিসমাসের সময়ে ইরাকে দু’টি পৃথক হামলায় ইসলামিস্টরা ৩৭ জন খ্রিষ্টানকে হত্যা করেছে[১৮৬]।
- মাজারে যাওয়ার অপরাধে হয় ব্যক্তির গলা কেটে ফেলেছে পাকিস্তানী তালিবানরা[১৮৭]।
- আফগানিস্তানে আট বছর বয়সী শিশুদের আত্মঘাতী বোমারু হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে[১৮৮]।
- সিরিয়ার রিফিউজি মেয়েদের দশ হাজার রিয়ালের বিনিময়ে ক্রয় করতে চাওয়ার বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে সৌদি আরবের পত্রিকায়[১৮৯]।
- নারী-পুরুষের অনলাইন চ্যাট নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে ইরানে[১৯০]।
- আই.এইচ.ইউ’র রিপোর্ট অনুযায়ী, তেরটি দেশে নাস্তিকতার ‘অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, সবগুলোই মুসলিম প্রধান[১৯১]।
- নির্বাচনে পরাজয়ের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে ঋষিপল্লীর দুই গৃহবধূকে ধর্ষণ করেছে মৌলবাদীরা[১৯২]। সারা দেশেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে বিভিন্ন স্থানে বিধর্মী জনগণের উপর এরকম হামলা চালিয়েছে মৌলবাদী শক্তি। নির্যাতনের মাত্রা এতোটাই আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে যে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে[১৯৩]।
এ খবরগুলো মূলত ডিসেম্বর (২০১৩)– জানুয়ারি (২০১৪) মাসের কয়েকদিনের পত্রিকায় খবর। প্রতিদিনই বিশ্বাসের ভাইরাস সংক্রমিত করছে মানুষকে, আমাদের সমাজকে। নানা ভাবে। এর বলি হচ্ছে অজস্র নিরীহ প্রাণ।
