বাইবেলে বর্ণিত অন্যান্য যে শ্লোকগুলো ডেল এবং লেইলানি নিউম্যানকে প্রভাবিত করেছিল, তার মধ্যে—
‘চাইতে থাক, তোমাদের দেওয়া হবে। খুঁজতে থাক, পাবে। দরজায় ধাক্কা দিতে থাক, তোমাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হবে। কারণ যে চাইতে থাকে সে পায়, যে খুঁজতে থাকে সে খুঁজে পায়, আর য়ে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে তার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়’ (মথি ৭:৭-৮, যীশুর উপদেশ)। কিংবা—
‘তোমরা মন্দ হয়েও যদি তোমাদের সন্তানদের ভাল ভাল জিনিস দিতে জানো, তবে তোমাদের স্বর্গের পিতা ঈশ্বরের কাছে যাঁরা চায়, তাদের তিনি নিশ্চয়ই উৎকৃষ্ট জিনিস দেবেন’ (মথি ৫:১১, যীশু সুবর্ণ উপদেশ দেওয়ার ঠিক আগেকার বক্তব্য)। অথবা–
‘আমি তোমাদের আবার বলছি, পৃথিবীতে তোমাদের মধ্যে দুজন যদি একমত হয়ে কোন বিষয় নিয়ে প্রার্থনা কর, তবে আমার স্বর্গের পিতা তাদের জন্য তা পূরণ করবেন’ (মথি ১৮:১৯)।
এধরণের অসংখ্য বাইবেলের আয়াত থেকে নিউম্যান দম্পতি নির্দেশনা পেয়েছিলেন যে, প্রার্থনায় সত্যই সুস্থ হয়ে উঠে অসুস্থ রোগী। যীশু উপদেশ দিয়েছেন সবাইকে প্রার্থনা করার, কেবল প্রার্থনা করলেই তিনি শুনবেন, ডাক্তারের কাছে গেলে নয়–
‘আমি তোমাদের সত্যি বলছি, যে আমার ওপর বিশ্বাস রাখে, আমি যে কাজই করি না কেন, সেও তা করবে, বলতে কি সে এর থেকেও মহান মহান কাজ করবে, কারণ আমি পিতার কাছে যাচ্ছি। আর তোমরা আমার নামে যা কিছু চাইবে, আমি তা পূর্ণ করব, যেন পিতা পুত্রের দ্বারা মহিমান্বিত হন। তোমরা যদি আমার নামে আমার কাছে কিছু চাও, আমি তা পূর্ণ করব’ (যোহন ১৪:১২-১৪)।
এখানে কোন ‘আউট অফ কন্টেক্সট’ কিংবা ‘মিসইন্টারপ্রিটেশনের সুযোগ নেই। যীশু বলছেন, যদি আমার নামে আমার কাছে কিছু চাও, আমি তা পূর্ণ করব। খুব সোজাসাপ্টা কথা। যীশু নিজে বহু সময়েই অসুস্থকে সুস্থ করেছেন। তার কাছে প্রার্থনা করলে আপনিও অসুস্থকে সুস্থ করতে পারবেন।
বাইবেল থেকে জানা যায়, যীশু একবার বৈথনিয়া ছেড়ে আসার সময় একটা ডুমুর (ফিগ) গাছকে অভিসম্পাত করেছিলেন, কারণ তিনি ক্ষুধার্ত ছিলেন, কিন্তু গাছটি ফলবতী ছিল না সেসময়। যীশু অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, এখন থেকে (তামার ফল আর কেউ কোন দিন খেতে পারবে না!’। পরদিন তার শিষ্যরা গাছটির কাছে গিয়ে দেখল ডুমুর গাছটি মূল থেকে শুকিয়ে গেছে। শিষ্যরা অবাক হয়ে তাকে এই অলৌকিক ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে, যীশু বললেন,
‘ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখ! আমি তোমাদের সত্যি বলছি, কেউ যদি ঐ পাহাড়কে বলে, “উপরে যাও এবং সমুদ্রে গিয়ে পড়, আর তার মনে কোন সন্দেহ না থাকে এবং সে যদি বিশ্বাস করে যে সে যা বলছে তা হবে, তাহলে ঈশ্বর তার জন্য তাই করবেন। এইজন্য আমি তোমাদের বলি, তোমরা যা কিছুর জন্য প্রার্থনা কর, যদি বিশ্বাস কর যে, তোমরা তা পেয়েছ, তাহলে তোমাদের জন্য তা হবেই (মার্ক, ১১:২২-২৪)।
এখন কথা হচ্ছে বাইবেল সত্য হলে কারাকে মৃত্যুবরণ করতে হল কেন? যেখানে বাইবেলের ছত্রে ছত্রে বিশ্বাসের মাধ্যমে অসুস্থ রোগীকে সুস্থ করার প্রমাণ আছে, কেন ঈশ্বর কারার বিশ্বাসী বাবা মার ডাকে সারা দিয়ে তাদের সন্তানকে সুস্থ করে তুললেন? আমার মত সংশয়বাদীরা বলবেন, এর একটা বড় কারণ, প্রার্থনা আসলে কোন কাজে আসে না। মুক্তমনার একসময়কার মডারেটর ফরিদ আহমেদ একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন প্রার্থনা কি কোন কাজে আসে?” শিরোনামে। লেখাটি মুক্তমনার বহুল আলোচিত ‘বিজ্ঞান ও ধর্ম– সংঘাত নাকি সমন্বয়?” শিরোনামের গ্রন্থটির অনলাইন সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। প্রবন্ধটি তিনি শুরু করেছিলেন আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদের সময়কার একটি ঘটনা উল্লেখ করে[১৭৬]–
‘অনেকেরই স্বৈরাচারী এরশাদের সময়কার একটা বিশেষ ঘটনার কথা মনে থাকার কথা। সন তারিখ অবশ্য খুব ভাল করে মনে নেই আমার। তবে এইটুকু মনে আছে যে, বাংলাদেশে তখন বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠের ভয়াবহ দাবদাহ। খরায় পুড়ছে সারাদেশ। বৃষ্টির নাম নিশানাও নেই অনেকদিন ধরে। আল্লাহ প্রেমিক এরশাদ বেশ ঘটা করে একদিন ঢাক ঢোল পিটিয়ে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ইসতিশকা নামাজ (বৃষ্টির জন্যে এই নামাজ পড়া হয়) পড়ার ঘোষণা দিল। নির্দিষ্ট দিনে সকালের দিকে অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে সেই নামাজ পড়াও হলো। আর কি আশ্চর্য! দুপুর গড়াতে না গড়াতেই কাল বৈশাখীর ঝড় হয়ে বৃষ্টি ঝুঁপিয়ে পড়লো ঢাকাসহ মোটামুটি প্রায় সারা দেশে। এরশাদ যে আল্লাহর খুব পেয়ারের বান্দা এবং খোদা যে মুমিন মুসলমানের ডাকে সাড়া দেন সে ব্যাপারে মানুষের আর কোন সন্দেহই রইলো না। দুমুখেরা অবশ্য বলে থাকেন যে আবহাওয়া অফিস থেকে ওইদিন বিকালে বৃষ্টি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনার পূর্বাভাস পেয়েই এরশাদ জনগণকে নামাজ পড়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল। অনেকে হয়তো ভাবছেন বাংলাদেশের মত অশিক্ষিত এবং ধর্মভীরু মানুষের দেশে এটাইতো স্বাভাবিক। তাদের জন্য বলছি, এ ধরনের অন্ধবিশ্বাস শুধুমাত্র যে শুধুমাত্র আমাদের মতো পশ্চাৎপদ দেশেই রয়েছে তা কিন্তু নয়। এই সেদিনও পোলিশ পার্লামেন্টে যখন সরকারী দলের পক্ষ থেকে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করার প্রস্তাব করা হয় তখন পার্লামেন্টে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে, সত্যি সত্যিই বিশ জনেরও বেশী এমপি সংসদীয় চ্যাপেলে ঈশ্বরের কাছে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছিল। যারা এই ঘটনাকে কৌতুক হিসাবে নিয়ে বেশ মজা পাচ্ছেন তাদের জন্য তথ্য হচ্ছে পোল্যান্ড ক্যাথলিক দেশ এবং প্রয়াত পোপ দ্বিতীয় জন পল ক্যাথলিকদেরকে আহ্বান জানিয়েছিলেন তৃষ্ণার্ত ধরিত্রীকে বৃষ্টির সুশীতল পরশ দেওয়ার জন্য সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নিকট আকুল অনুরোধ করতে।
