ঘটনাটা এরকমের। মেডেলিন কারা নিউম্যান নামের ১১ বছরের এক কিশোরী। একটা কিশোরীর যা কিছু থাকার কথা সবই ছিল কারার। চপলতা, কপট গাম্ভীর্য, দুষ্টুমি, পড়াশুনা, খেলাধুলা থেকে ঢেউ খেলানো চুলের মাঝে বেণী করার ইচ্ছা— সবই। কিন্তু তারপরেও একটা জায়গায় একটু সমস্যা ছিল। ডায়াবেটিসের সমস্যা। সাধারণত এই বয়সে ডায়াবেটিস হবার কথা নয়, কিন্তু কারার সেটা ছিল। আমেরিকায় প্রতি চারশো জন শিশুর একজন এ ধরণের ডায়াবেটিস থাকে। প্রচলিত ভাবে একে বলে ‘আনডায়াগনোসড ডায়াবেটিস’। কিন্তু এটা কোন জীবন ঝুঁকি তৈরি করে না, যদি সঠিক চিকিৎসা নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ মত চলা যায়। কারার ক্ষেত্রেও ভিন্ন কিছু হবার কথা ছিল না, যদি তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হত। কিন্তু সেটা হয়নি। কারণ, কারার বাবা মা ছিলেন খ্রিস্টধর্মে প্রচণ্ড ভাবে বিশ্বাসী দুজন মানুষ। তারা ডাক্তারের কাছে যাওয়ার চেয়ে প্রার্থনাকেই পছন্দনীয় বলে মনে করলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, কেবল প্রার্থনার মাধ্যমে যে কোন রোগীকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ করে দেয়া সম্ভব।
কারার বাবা নিজেও একটা সময় খ্রিস্টধর্মের পেন্টেকোস্টাল মিনিস্টার হিসেবে কাজ করেছিলেন, এবং তিনি অন্য সব বাবা মার মতোই তার কন্যাকে অনেক ভালবাসতেন। তিনি কখনোই চাননি তার কন্যা মারা যাক। বরং তিনি সবসময়ই ভেবেছেন তার কন্যার মাথায় একটু তেল মালিশ করে যীশুর কাছে প্রার্থনা করলে যীশু তার কথা শুনবেন এবং তার মেয়েকে সুস্থ করে দেবেন। না বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই; বাইবেল যে সাক্ষ্য দিচ্ছে–
‘তোমাদের মধ্যে কেউ কি অসুস্থ হয়েছে? তবে সে মণ্ডলীর প্রাচীনদের ডাকুক। তারা প্রভুর নামে তার মাথায় একটু তেল দিয়ে তার জন্য প্রার্থনা করুক। বিশ্বাসপূর্ণ প্রার্থনা সেই অসুস্থ ব্যক্তিকে সুস্থ করবে, প্রভুই তাকে সুস্থতা দেবেন।
(বাইবেল, যাকোবের পত্র, ০৫:১৪-১৫)।
কারার বাবা কারার জন্য কেবল মাথায় তেল দিয়ে প্রার্থনা করে গেছেন, এমনকি তার কন্যার ওজন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, উদ্দীপনা কমে যাচ্ছে, ঘন ঘন তৃষ্ণা পাচ্ছে, অবসাদ এসে গ্রাস করেছে, এমনকি মাঝে মধ্যে চোখে অন্ধকার পর্যন্ত দেখেছে– এগুলো দেখেও গা করেননি। যে কোন ডাক্তারই এই সমস্ত লক্ষণ দেখে এক মিনিটের মধ্যেই বুঝে যেত যে মেয়েটার সম্ভবত ডায়াবেটিস আছে। একটা সময় কারা
এতোই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে, হাটা চলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এমনকি কথাও। তারপরেও তার অভিভাবকেরা ডাক্তারের কাছে নেয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। তাদের চোখের সামনেই মেডেলিন কারা নিউম্যান মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। দিনটি ছিল ২০০৮ সালের মার্চ মাসের ২৩ তারিখ।
মৃত্যুর পর কারার অভিভাবকদের অভিযুক্ত করা হয় সন্তানকে অবহেলা এবং হত্যার অভিযোগে মামলা চলাকালীন সময়ে কারার বাবা ডেল নিউম্যান আদালতে পঁড়িয়ে নিরুত্তাপ গলায় বলেন— ‘প্রার্থনা বাদ দিয়ে রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়াকে আমি ঠিক মনে করি না। এটা করলে ডাক্তারকে খোদার উপর খোদকারি করার অধিকার দেয়া হয়।
‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ মনকে কতটা আচ্ছন্ন করে ফেললে কোন বাবা এভাবে চিন্তা করতে পারে কে জানে। ছেলে মেয়ে অসুস্থ হলে বাবা মা প্রথমেই ভাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। আর ডেল নিউম্যানের মনে হয়েছিল এটা ‘খোদার উপর খোদকারি’র মতন। ডাক্তারের কাছে না নিয়ে কারার অভিভাবকেরা শরণাপন্ন হয়েছিলেন এক ওঝার। ওঝা আর কেউ নয়, তার এক প্রিয় চার্চের প্রতিষ্ঠাতা ফাদার– ডেভিড ইলস। ইলস তার লেখা থেকে উদ্ধৃত করে শোনালেন,
‘যীশু কখনোই কাউকে ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে পাঠাননি। যীশু কেবল একটি মাধ্যমেই সকলের চিকিৎসা করেছেন। সেটা হচ্ছে বিশ্বাসের মাধ্যমে– হিলিং বাই ফেইথ।
এই স্টেটমেন্ট চার্চের ওয়েবসাইটেও একসময় লেখা ছিল। নিউম্যান দম্পতি প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির স্মরণ না নিয়ে প্রার্থনা করায় যে ঈশ্বরের কত ভালবাসার পাত্র হয়েছেন তার উল্লেখ ছিল সেখানে। অবশ্য আমরা এখন জানি সেই ভালবাসার প্রতিদান। ভালবাসার চোটে কারাকে একেবারে বিনা চিকিৎসায় পরপারেই চলে যেতে হয়েছে। কারার মৃত্যুর পর ডেভিড ইলস ঈশ্বরের ভালবাসার প্রমাণ’গুলো সাইট থেকে গায়েব করে দিয়েছিলেন।
আদালতে কারা নিউম্যানের পিতা মাতা দ্বিতীয় মাত্রার হঠকারী নরহত্যার দায়ে (second degree reckless homicide) অভিযুক্ত হন। তাদের ২৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারত, কিন্তু আইন কানুনের জটিলতা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদির বিবেচনায় বিচারে বাবা মা দুজনকেই শেষপর্যন্ত ১০ বছরের প্রবেশন এবং ৬ বছর ধরে ৬ মাস করে কারাদণ্ড ভোগ করার বিধান দেয়া হয়।
সাধারণত অপরাধ করলে মানুষের অনুতাপ আসে। কিন্তু কারার বাবা মা ছিলেন দুজনই অনুতাপহীন। কারণ বাইবেল নামক ‘বিশ্বাসের ভাইরাসে তাদের মন ছিল সংক্রমিত। অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য ঠিক কি করতে হবে, বাইবেল এ ব্যাপারে খুব স্পষ্ট— “যদি বিশ্বাস থাকে, তবে প্রার্থনায় তোমরা যা চাইবে তা পাবে। (মথি ২১:২২)। লক্ষ্য করুন– এখনে বলা হয়নি, হয়তো কিংবা মাঝে সাঝে” কিংবা “যদি ঈশ্বর চান’। বরং বিশ্বাস থাকলে প্রার্থনা করলেই সব পাওয়া যাবে’— এটাই বাইবেলের এ শ্লোকের বক্তব্য। উপরে যাকোবের পত্র এবং মথি সহ বাইবেলের শ্লোকের সত্যতা সম্বন্ধে কারার বাবা মা– ডেল এবং লেইলানি নিউম্যান এতোটাই নিঃসন্দেহ ছিলেন যে সেগুলো নিয়ে ন্যূনতম সংশয় করেননি। নিউম্যান দম্পতি সত্যই বিশ্বাস করেছিলেন যে প্রার্থনা করলে ঈশ্বর সাড়া দেবেন, এবং মেয়েকে সুস্থ করে দেবেন। যীশু নিজেও অলৌকিক উপায়ে বহু অন্ধ, খঞ্জ, কুষ্ঠরোগাক্রান্ত কিংবা পক্ষাঘাতগ্রস্তকে সুস্থ করে দিয়েছেন (মার্ক ৮:২২-২৬, মথি ৮:১-৪, মার্ক ১:৪০-৪৫, মথি ৯:১-৮ ইত্যাদি), কারার ক্ষেত্রেই বা হবে না কেন।
