ওয়াল্টার ক্লেমেন্ট নোয়েল ১৯০৭ সালে ডেন্টাল স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েট হন, এবং সেন্ট জর্জ সিটিতে প্রফেশনাল দন্ত চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু নোয়েলের স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তার জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অবশেষে ১৯১৬ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে নোয়েলকে মারা যেতে হয়। যদিও তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে সেসময় লেখা হয়েছিল ‘আনডিটেকটেড পালমোনারি হাইপারটেনশন’ এখন সবাই জানে, নোয়েল আসলে ছিলেন আমেরিকার প্রথম সিকেল সেল অ্যানিমিয়া রোগী।
সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার ব্যাপারটা আসলে অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে ‘ধাঁধার মত ছিল। এটা একধরণের ত্রুটিপূর্ণ হিমগ্লোবিনজনিত রোগ, আফ্রিকার ম্যালেরিয়া প্রবণ অঞ্চলে টিকে আছে কারণ, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার রোগীরা সুস্থ কোষের চেয়ে একটু বেশি ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে সক্ষম। আফ্রিকার যে অঞ্চলগুলোতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি, সেসমস্ত জায়গাগুলোতেই সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার রোগী অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। কোন একসময় মিউটেশনের ফলে আফ্রিকাবাসীদের মধ্যে এই বিকৃত রোগের উৎসের জিনটা ছড়িয়ে পড়েছিলো। প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়ম মেনে দেখা গেলো, যে অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশী সেখানে সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার একটা জিন ধারণকারী লোকের টিকে থাকার ক্ষমতাও বেড়ে যাচ্ছে, কারণ হিমোগ্লোবিনের এই রোগ বহনকারী জিন ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধে বেশী কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে। অন্যদিকে যাদের মধ্যে দু’টিই সুস্থ জিন রয়েছে তারা ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে অনেক বেশী হারে। সেজন্যই প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়ম মেনে এখানে এই ত্রুটিপূর্ণ জিন বহনকারী মানুষগুলোই শেষ পর্যন্ত ম্যালেরিয়া রোগের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে বেশীদিন টিকে থাকতে পারছে এবং বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম হচ্ছে। এই টিকে থাকার দায়েই শত শত প্রজন্ম পরে দেখা গেলো আফ্রিকাবাসীদের একটা বিশাল অংশের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। বিকৃত সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার জিন। বিবর্তনের মাথায় কিন্তু সিকেল সেল অ্যানিমিয়াকে রক্ষা করার কোন পরিকল্পনা আগে থেকে ছিলো না। এটা স্রেফ টিকে গেছে আফ্রিকায় ম্যালেরিয়ার উপদ্রবের কারণেই। নোয়েল ছিলেন এমনই একজন সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার রোগ বহনকারী। এই রোগ থাকার কারণে তার দেহ আফ্রিকায় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে সক্ষম ছিল, কিন্তু আমেরিকায় এসে অপরিণত বয়সে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়।
কাজেই জেনেটিক ট্রেইট খারাপ বা ভাল– দুইই হতে পারে। জিনের ‘সারভাইভাল’ বা উদ্বর্তন নির্ভর করে ‘নীট’ বা সামগ্রিক ফলাফলের উপর– কেবল যে কোন এক দিকের ভাল বা খারাপ ফলাফলের উপর নয়। সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার উপযোগিতা পাওয়া যায়। যখন কোন অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বিদ্যমান থাকে। এর ফলে ম্যালেরিয়ার হাত থেকে হয়তো বাঁচা যায়, কিন্তু সেটা আবার রোগজনিত কষ্টভোগ এবং অকাল প্রয়াণের মাধ্যমে অনেকটাই প্রশমিত হয়ে যায়। ধর্মের এই টিকে থাকাও অনেকটা সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার মতোই পরিস্থিতি নির্ভর হতে পারে। কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে এক ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে আরেক বিশ্বাসের জন্ম হতে পারে এবং ছড়িয়ে পড়তে পারে দ্রুত গতিতে। এগুলো সমাজে টিকে থাকতে পারে এমনকি এদের ট্রেইট খারাপ প্রমাণিত হবার পরেও।
.
ধর্ম তাহলে কীভাবে টিকে আছে?
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বেকি গ্যারিসনের ‘ধর্ম যদি ক্ষতিকারক হলে টিকে আছে কি করে? এই বিখ্যাত ধাঁধাটির অন্তত পাঁচটি সমাধান দেখতে পাচ্ছি:
১) বিবর্তন কাজ করে ব্যক্তির জিনের উপর, সমষ্টির উপরে নয়। ফলে সমষ্টির জন্য আপাত ক্ষতিকারক অনেক বৈশিষ্ট্যই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় বাতিল না হয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা দিতে গিয়ে টিকে থাকতে পারে।
২) প্যারাসাইটগুলো মস্তিষ্ক এবং দেহের জৈবিক প্রক্রিয়ার দখল নিয়ে নিতে পারে, যদিও তাদের উদ্ভব হয়তো একটা সময় ঘটেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রয়োজনে।
৩) জিন কিংবা মিমের বহির্সংক্রমণ ঘটতে পারে এবং যে কোন সময় আঞ্চলিক পরিবেশের কিংবা মানস-কাঠামোর ধংসসাধন ঘটতে পারে।
৪) জিন কিংবা মিমের ভাল কিংবা মন্দ বৈশিষ্ট্য পরিস্থিতিভেদে বিলুপ্ত হতে পারে কিংবা সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার মতো টিকে থাকতে পারে।
এবং সর্বোপরি—
৫) ধর্মীয় বিশ্বাস বিলুপ্ত না হয়ে টিকে থাকে, কারণ এগুলো আসলে ভাইরাস।
ভাইরাসের মতোই এরা দেহকোষ কিংবা মস্তিষ্কের দখল নিতে পারে, এবং পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এক হোস্ট থেকে অন্য হোস্টে। একটি ভাইরাস যখন কোথাও সংক্রমণ ঘটায় তখন যেমন কখনো চিন্তা করে না একটি দেহের জৈব রাসায়নিক উপাদান কত সুষম বা সুন্দর, কিংবা কখনোই ভেবে দেখে না সে মোটা দাগে জীবদেহের, সমাজের কিংবা পরিবেশের ক্ষতি করছে না উপকার, সে কেবল ওটাকে ব্যবহার করে যেতে থাকে। মানব মনে প্রোথিত বিশ্বাসগুলোও তেমনি। যদিও ধর্ম বর্তমান এবং আগামী সভ্যতার জন্য এক ধরণের বোঝা কিংবা অভিশাপের মতো হয়ে উঠেছে, কিন্তু এর বৈশিষ্ট্য ক্ষতিকর হলেও এটা টিকে থাকতে পারে চিরায়ত বিবর্তনের নিয়ম মেনেই। ভাইরাস বা প্যারাসাইটগুলো যেভাবে প্রকৃতিতে টিকে থাকে।
০৮. ভাইরাস থেকে মুক্তি
২০০৮ সালের একটি ঘটনা। আমি তখন সবেমাত্র সিঙ্গাপুরের পাট চুকিয়ে আমেরিকা এসে বসেছি। একটি খবর দাবানলের মতো আমেরিকার পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে পড়ল। উইসকনসিনের এক দম্পতি বাইবেলের উপর আক্ষরিক ভাবে বিশ্বাস রাখতে গিয়ে নিজের মেয়েকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
