.
বহির্সংক্রমণ
এই অনুচ্ছেদটা লিখতে গিয়ে এমন এক ঘটনার কথা মনে পড়ছে, যা না বললেই নয়। ১৮৬৯ সালে থমাস অষ্টিন নামে এক ব্যক্তি এমন একটা জিনিস করলেন যা ইতিহাসে এখন পরিচিত হয়ে আছে চরম হঠকারী একটা কাজ হিসেবে। তার সেই কাজের মাশুল হিসেবে অস্ট্রেলিয়াকে এখন প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের স্তন্যপায়ী জীবদের আটভাগের এক ভাগ অস্টিন সাহেবের কাজের কারণে কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ভিদজগত যেভাবে ধ্বংস হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। ভুমির অবক্ষয় হয়েছে ভীষণ, জমির উর্বরাশক্তির উপর প্রভাব পড়েছে, প্রভাব পড়েছে জলবায়ুর উপরে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সীমাহীন। ক্ষতির পরিমাণ এতোই বেশি যে সরকার এমনকি সবটুকু হিসেব করে উঠতেও পারেনি।
তা কী করেছিলেন থমাস অস্টিন? শুনলে খুব নিরীহ ব্যাপার বলে মনে হবে। তিনি তার বন্ধুকে দিয়ে জাহাজে করে বারো জোড়া অর্থাৎ চৰ্বিশটি খরগোশ আনিয়েছিলেন ইংল্যান্ড থেকে। থমাস সেই চৰ্বিশটি খরগোশ ১৮৫৯ সালের অক্টোবর মাসে খাঁচা খুলে উন্মুক্ত করে দেন।
কেন এ কাজ করলেন অস্টিন? কারণ হচ্ছে, অষ্টিন আগে খুব শিকার করতে পছন্দ করতেন। অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নেবার পর থেকে শিকার করার আনন্দ তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সেই আনন্দধারা আবার নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য এই খরগোশ গুলো এতদূর পাড়ি দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, আর উঠোনে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন ইংল্যান্ডের পুরনো দিনগুলো আবার বুঝি ফিরে আসবে– যে সময়টাতে তিনি মধ্যাহ্নভোজনের আগে বন্দুক নিয়ে বের হয়ে গোটা কয়েক খরগোশ শিকার করে বস্তাবন্দি করে ফিরতেন। সে কথা মনে করে ইংল্যান্ডে তার ভাগ্নেকে চিঠি লিখলেন, ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় কিছু খরগোশের চালান আনা যায় কিনা।
সেই আনাই তার কাল হল। অস্ট্রেলিয়ায় এর আগে খরগোশ বলে কিছু ছিল না। ১৮৫৯ সালে মাত্র চব্বিশটা খরগোশ উঠোনে ছেড়ে দেবার পর, ‘Breeding like rabbits’ এর পুরনো উসমাকে সত্য প্রমাণিত করে দশ বছরের মধ্যে সারা অস্ট্রেলিয়া এমনভাবে খরগোশে ছেয়ে গেল যে এখন প্রতি বছর অস্ট্রেলীয় সরকারকে প্রায় বিশ লক্ষ খরগোশ মেরে ফেলতে হয়। খরগোশের জন্য নিত্যনৈমন্তিক ভূমি ক্ষয়, ফসলের ক্ষতি, অন্য প্রজাতির ধংস এগুলো লেগেই আছে। সরকার খরগোশ মারার মিশন নিয়ে নামলেন। গুলি করে করে খরগোশ। মেরে ফায়দা হচ্ছে না দেখে সরকার একসময় কৃত্রিমভাবে খরগোশের প্লেগ তৈরি করলেন। ১৯৫০ সালে সরকারের তরফ থেকে বিধ্বংসী মাইক্সোমা ভাইরাস প্রবিষ্ট করে খরগোশের প্রজাতিতে মহামারী তৈরি করা হল। ১৯৯৬ সালে প্রযুক্ত হল ক্যালসিভাইরাস যেটাকে চলতি ভাষায় বলা হয় ‘Rabbit hemorrhagic disease’। তাতেও কোন লাভ হয়নি। খরগোশের প্রজাতির বিস্তার এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে পরিবেশবিদরা রীতিমত শঙ্কিত। জীবজগতের সামগ্রিক ভারসাম্যই হুমকির মুখে।
অষ্ট্রেলিয়ার খরগোশের উদাহরণটি জীবজগতের হাজারো উদাহরণের একটি– যেখানে ‘এলিয়েন ইনভেশন বা বহিস্থ সংক্রমণের ফলে আঞ্চলিক পরিবেশ প্রায় ধ্বংসের সম্মুখীন হয়ে গেছে। এ ধরণের আরো অনেক উদাহরণ আছে। যেমন, ভূমধ্যসাগরীয় ফলের মাছির প্রকোপে হাওয়াই অঞ্চলের শস্যের বড় একটা অংশ বিলীন হয়ে যাওয়া, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কলার্সা শৈবালের প্রকোপে ভূমধ্যসাগরের পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হওয়া, আমেরিকার হ্রদে রাশিয়ান জেব্রা ঝিনুক আশঙ্কাজনক ভাবে ছড়িয়ে পড়া প্রভৃতির কথা বলা যায়।
বিশ্বাসের ব্যাপারগুলোও তেমনি। যেভাবে সম্পূর্ণ অপরিচিত অঞ্চলে ইসলাম এবং খ্রিস্টধর্মের বীজ প্রবিষ্ট করিয়ে জনগণকে বিশ্বাসের আওতায় আনা হয়েছে তা বহির্সংক্রমণ ছাড়া আর কিছু নয়। ইসলামের নবী মুহম্মদ জীবনের শেষ বছরগুলোতে নাখলার যুদ্ধ, বদরের যুদ্ধ, বানু কাইনুকা, বানু নাদির, বানু মুস্তালাক, আহজাব, বানু কোরাইজা, খাইবারের যুদ্ধ করেছিলেন, কিংবা পরবর্তী চার খলিফার নেতৃত্বে ওমান, ইয়েমেন, ইয়ামাহ, সিরিয়া, পারশিয়া, বাসরা, দামাস্কাস জেরুজালেম, মিশর, আজারবাইজান, সাইপ্রাস, বাইজেন্টাইন সিসিলি, কনস্টানটিপোল, উত্তর আফ্রিকা ফ্রান্স এবং স্পেন আক্রমণ করে সে সমস্ত জায়গাকে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসার চেষ্টা হয়েছে তা এক ধরণের বহির্সংক্রমণই বলা যায়। ভারতবর্ষেও মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল এভাবেই। এ প্রসঙ্গে গবেষক আবুল কাশেম মুক্তমনায় প্রকাশিত ‘ইসলামে বর্বরতা’ নামক প্রবন্ধে লেখেন
‘মোহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধুর দেবাল বন্দর জয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ইসলামের শক্ত ও স্থায়ী ভিত্তি রচনা করে। বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ আল-বিরাদুরী লিখেছেন: ‘দেবাল আক্রমণ করে সেখানে তিনদিন ধরে লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়; মন্দিরের যাজকদের সবাইকে হত্যা করা হয়। কাসিম ১৭ বছরের অধিক বয়সী পুরুষদেরকে তলোয়ারের ডগায় হত্যা করে এবং নারী ও শিশুদেরকে ক্রীতদাস বানায়। দেবালে কত লোককে বন্দি করা হয়েছিল সে সংখ্যা লিখিত হয়নি, তবে ‘চাচনামা থেকে জানা যায়, বন্দিদের মধ্যে ছিল মন্দিরে আশ্রয়গ্রহণকারী ৭০০ রমণীও লুণ্ঠিত মালামাল ও ক্রীতদাসদের মধ্যে খলিফার এক-পঞ্চমাংশের হিস্যায় ছিল পঁচাত্তর জন কুমারী, যাদেরকে হাজ্জাজের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অবশিষ্টদেরকে কাসিম তার সেনাদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়।
