.
প্যারাসাইট যখন নিয়ে নেয় জৈবিক প্রক্রিয়ার দখল
আমরা বইয়ের অনেক জায়গাতেই ল্যাংসেট ফ্লক’ নামের প্যারাসাইটের সাথে পরিচিত হয়েছি। এই প্যারাসাইট যখন পিঁপড়ার মস্তিষ্ক তথা জৈবিক প্রক্রিয়ার দখল নিয়ে নেয়, তখন পিঁপড়া কেবল ঘাসের গা বেয়ে উঠা নামা করতে থাকে। বহুদিন ধরে এই অদ্ভুতুড়ে ব্যাপারটা বিজ্ঞানীদের ধাঁধায় ফেলে রেখেছিল। যখন বিজ্ঞানীরা শেষ পর্যন্ত এই ধাঁধার সমাধান করতে পারলেন, তারা বুঝলেন, পিঁপড়াগুলো আসলে একধরণের মধ্যবর্তী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পিঁপড়াগুলোর মস্তিষ্ককে আসলে ‘হাইজ্যাক করে ফেলেছে ‘ল্যাংসেট ফ্লক’ নামধারী এই প্যারাসাইটগুলো। নিজের বংশবৃদ্ধির জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য পিঁপড়ার মাথাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ল্যাংসেট ফ্লুক।
এরকম আরো একটা উদাহরণের সাথেও আমরা পরিচিত হয়েছি- যেটা কেবল হোস্টের মস্তিষ্কের সংক্রমণ ঘটিয়েই ক্ষান্ত হয় না, তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করে। নেমাটোমর্ফ হেয়ারওয়ার্ম নামের এই ফিতাকৃমি সদৃশ প্যারাসাইট ঘাসফড়িং-এর মস্তিষ্ককে সংক্রমিত করে ফেললে ঘাসফড়িং পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। এখানেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন নিজের প্রজননগত সুবিধা পেতে নেমাটোমর্ফ হেয়ারওয়ার্ম বেচারা ঘাসফড়িংকে আত্মহত্যায় পরিচালিত করে।
এবারে একটা নতুন উদাহরণ দেখি। ইকনিউমেন (lchneumon) প্রজাতির একধরণের প্যারাসিটোয়েড বোলতা আছে। এদের নিয়ে লিখেছিলাম আমার ভালবাসা কারে কয় বইটিতে। এই বোলতাগুলো শুয়োপোকার মস্তিষ্ককে নয়, তার দেহকে হোস্ট হিসেবে ব্যবহার করে সারা জীবনের খাদ্যের যোগান পেতে। কি ভাবে করে সেটা? তারা হুল ফুটিয়ে শুয়োপোকাকে প্যারালাইজড করে ফেলে এবং সেটার দেহের ভিতরে ডিম পাড়ে। অর্থাৎ, শিকারকে সরাসরি হত্যা না করে দৈহিকভাবে অবশ করে দিয়ে সেই শিকারের দেহকে ব্যবহার করে প্রজন্ম তৈরিতে। এই ডিম ফুটে যে শূককীট বের হয়, তা শিকারের দেহের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খেয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। স্ত্রী বোলতাগুলো তার শিকারের প্রত্যেকটি স্নায়ু গ্রন্থি সতর্কতার সাথে নষ্ট করে দেয় যাতে তাদের শিকার পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকে।
ছবি। পেজ ১৮০
চিত্র: ইকনিউমেন প্রজাতির বোলতা শুয়োপোকাকে হুল ফুটিয়ে দৈহিকভাবে অবশ করে দিয়ে সেই শিকারের দেহের ভেতরে ডিম পাড়ে, আর তার দেহকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।
প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার এই নির্বিচারী উন্মাদনা দেখে সময় সময় বিচলিত হয়েছেন আস্তিক, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী, প্রকৃতিবাদী, মানবতাবাদী, সংশয়বাদী– সকলেই। বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স এই ইকনিউমেন প্রজাতির বোলতার উদাহরণটিকে তার গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি রবিন উইলিয়ামসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, এই প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলোর নিষ্ঠুরতা দেখলেই বোঝা যায় যে পরম করুণাময় ঈশ্বরের মতো কোন পরিকল্পনাকারী দ্বারা এই মহাবিশ্ব তৈরি হলে তিনি একজন স্যাডিষ্টিক বাস্টার্ড ছাড়া আর কিছু হবেন না’। এই ঢালাও নিষ্ঠুরতা দেখে এক সময় বিচলিত হয়েছিলেন চার্লস ডারউইনও। তিনি প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলোর বীভৎসতা দেখে মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন
‘আমি ভাবতেই পারিনা, একজন পরম করুণাময় এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কোন ঈশ্বর এইভাবে ডিজাইন করে তার সৃষ্টি তৈরি করেছেন যে, ইকনিউমেনগুলোর খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য একটি জীবন্ত কিন্তু প্যারালাইজড শুয়োপোকার প্রয়োজন হয়।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল, সেই ডারউইন থেকে আজকের দিনের রিচার্ড ডকিন্স সহ সকল বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীরা সবাই জানেন, এ ধরণের প্যারাসাইটিক সংক্রমণগুলো যথাক্রমে পিঁপড়া, ঘাসফড়িং কিংবা শুয়োপোকার জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হবার পরেও প্রকৃতিতে টিকে আছে বিবর্তনের নিয়ম মেনেই। কাজেই কোন কিছু ক্ষতিকর হবার মানে সে বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফিল্টারে কাটা পড়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবেই, এই দিব্যি কেউ দিয়ে দেয়নি।
ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোও সমাজে টিকে আছে অনেকটা এভাবেই। এ বিশ্বাসগুলো কী ভাবে প্যারাসাইটের মতো মানব মস্তিষ্ককে অধিগ্রহণ করে ফেলে, কী ভাবে তার অনুসারীদের শুয়োপোকার মতোই পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলে, তার হাজারো উদাহরণ আমরা আমাদের চারপাশে তাকালেই দেখতে পাই। প্যারাসাইটিক ধর্মগুলো তার অনুসারীদের কাছ থেকে ইকনিউমেন প্যারাসিটোয়েড বোলতার মতোই যেন সবকিছু শুষে নেয়। দেখা যায় একটি বিশেষ ধর্মের অনুসারী বান্দারা তাদের আরাধ্য এই প্যারাসাইটিক ধর্মটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বহু কিছুই করে থাকে– দিনে একাধিকবার প্রার্থনা করা, প্রতি সপ্তাহে একবার হলেও উপাসনালয়ে যোগদান করা, যতদূর সম্ভব ধর্মীয় আইন-কানুন-রীতি-নীতি মেনে চলার চেষ্টা করা, পাশাপাশি অন্য ধর্মের সংক্রমণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ঈমান শক্ত করা, বহু টাকা খরচ করে মন্দিরে পশুবলি বা কোরবানি দেয়া, মৃত্যুর আগে মক্কা, মদিনা, কাশী গয়া পুরীর মতো পূণ্যস্থানে ভ্রমণ করা, চারপাশে আর দশজনকেও একই ধারণায় সংক্রমিত করতে চেষ্টা করা ইত্যাদি। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সায়েন্টোলজি, মরমন, জেহোভাস উইটনেস, হরেকৃষ্ণ, ইউনিফিকেশন চার্চ, ভুজ, ইয়াজাদি, অমিসসহ সকল ধর্ম এবং কাল্টই একই কায়দায় তাদের অনুসারীদের মস্তিষ্ককে সংক্রমিত করে।
