অনেক ভালভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কারণ, নির্বাচন হয় জিন লেভেলে, গ্রুপ লেভেলে নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জীববিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন নিজের জিনকে রক্ষা কিংবা যাদের সাথে জিনের নৈকট্য বেশি থাকে, তাদেরকেই রক্ষার তাগিদ প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। আর তা থেকেই ঘটে বৃহৎ স্কেলে পরার্থিতার সুত্রপাত। পিঁপড়া, মৌমাছি,উইপোকা থেকে শুরু করে বানর, শিম্পাঞ্জি কিংবা মানুষ— সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে জিনগত স্বার্থপরতা থেকেই উদ্ভব ঘটে পরার্থিতার, যা এতদিন ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করা হতো দলগত নির্বাচনের মাধ্যমে। জীববিজ্ঞানে এ এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। মানবসমাজের বিভিন্ন সামাজিক প্যাটার্ন ব্যাখ্যা করার নতুন এক দুয়ার খুলে দিলো ডকিন্সের স্বার্থপর জিন তত্ত্বা স্বার্থপর জিনতত্ত্বই দলগত নির্বাচনকে সার্থক ভাবে প্রতিস্থাপন করলো উইলিয়ামস- হ্যামিলটন-স্মিথের প্রস্তাবিত স্বজাতি নির্বাচন (Kin selection) দিয়ে। আমি ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘ভালবাসা কারে কয়’ বইটিতে এ নিয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করছিলাম। উৎসাহী পাঠকেরা পড়ে নিতে পারেন। কিছু গবেষক ধর্ম, নৈতিকতা প্রভৃতির উদ্ভব এবং অস্তিত্ব ব্যাখ্যার জন্য এখনো দলগত নির্বাচনের সহায় হলেও রিচার্ড ডকিন্স, জেরি কয়েন, স্টিভেন পিঙ্কার, ওয়েস্ট, গ্রিফিন গার্ডেনার প্রমুখ নানাভাবে দেখিয়েছেন যে দলগত নির্বাচনের চেয়ে স্বার্থপর জিনতত্ত্ব এবং স্বজাতি নির্বাচন দিয়েই ব্যাপারগুলোকে আরো ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়
বিবর্তন দলগতভাবে কাজ করে না বলেই আমরা জীবজগতে অনেক উদাহরণ দেখতে পাই যেটা ব্যক্তির জন্য উপকার আনলেও সমষ্টিগতভাবে ক্ষতিকর হয়ে যেতে পারে। এটা কেবল জীববিজ্ঞানে নয় আমাদের চারপাশের সামাজিক জীবনেও দৃশ্যমান। রাস্তার যানজট এর একটি ভাল উদাহরণ। সবাই চায় অফিস যাওয়ার সময় রাস্তাঘাট যানজট মুক্ত থাকুক, কিন্তু সবাই অফিসে যাবার সময় নিজের গাড়ি হাঁকিয়ে ঠিক একই সময় বাড়ি থেকে বের হয়, আর রাস্তায় তৈরি করে অসহনীয় যানজটের। ব্যক্তিগত সুবিধা পেতে গিয়ে সমষ্টিগত অসুবিধা তৈরি করার চমৎকার দৃষ্টান্ত এটি।
আমি আমেরিকার আটলান্টার যে প্রান্তে থাকি, সেখান থেকে অফিসে যেতে (খালি রাস্তায় ড্রাইভ করে) বিশ পঁচিশ মিনিট সময় লাগার কথা। কিন্তু প্রতিদিন অফিস আওয়ারে’র সূচনালগ্নে অর্থাৎ সকাল আটটা থেকে নটার মধ্যে অফিস যাওয়ার জন্য হাইওয়ে ৪০০ এ উঠলেই দেখা যায় গাড়ির লম্বা বহর। যানজটে গাড়ি যেন নড়তেই চায় না। বিশ মিনিটের পথ পেরিয়ে অফিসে পৌঁছুতে অনেক সময় এক ঘণ্টার উপর লেগে যায় আমারা সবাই যদি নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বের না হয়ে কেউ কেউ যদি সরকারী বাস কিংবা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতো, তাহলে তাদের অফিসে পৌঁছুতে বিশ মিনিটের জায়গায় হয়তো ত্রিশ চল্লিশ মিনিট সময় লাগতো, কিন্তু দেড় ঘণ্টার সমষ্টিগত যানজটের এই দুর্বিপাক এড়ানো যেত সহজেই। গরীব মানুষেরা কিছুটা করে বটে, কিন্তু যাদের গাড়ি আছে, তারা কেউই তা করে না।
এর পেছনে একটা কারণ আছে। একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক। ধরা যাক, আটলান্টা কমিউনিটি থেকে ঠিক করা হল, একটা সপ্তাহ সবাই বাসে করে অফিসে যাবে। এই ব্যাপারটা ঠিক করার পর প্রথম কয়েকদিনেই যানজট একেবারেই কমে যাবে। সমষ্টিগতভাবে সবার অফিসে যেতে সামান্য দেরি হলেও, কাউকে দেড় ঘণ্টা ধরে রাস্তায় ধুকে ধুকে অফিসে পৌঁছুতে হবে না। কিন্তু এ অবস্থায় শুরু হবে আরেক সমস্যা। দেখা যাবে, কমিউনিটির সুযোগসন্ধানীরা এই ফাঁকা রাস্তার সুযোগ নিতে শুরু করেছে। ধরা যাক আটলান্টা কমিউনিটির মিষ্টার জন দুদিন বাসে করে অফিস যেতে যেতে দেখল— আরে রাস্তা তো ফঁকাই থাকে এখন। আমি বাসে যাওয়ার চেয়ে গাড়ি নিয়ে রওনা হই না কেন। জন এর পরদিন বাসের জন্য দাঁড়িয়ে না থেকে সকালে গ্যারেজ থেকে নিজের গাড়ি বের করে সাঁ সাঁ করে চালিয়ে বিশ মিনিটে অফিসে পৌঁছিয়ে গেল। জনের এই সুযোগসন্ধানী কাজ যথারীতি নজরে পড়বে অন্যদেরও। তারাও ঠিক করবে, আমরাই বা এভাবে বাসের জন্য পঁড়িয়ে থেকে, এবং বাসে উঠে পুঁকতে ধুকতে অফিসে যাব কেন। জন যেখানে বিশ মিনিটে অফিসে পৌঁছিয়ে যাচ্ছে, আমাদের চল্লিশ মিনিট ধরে বাসে ঝুলে ঝুলে অফিসে যাওয়ার কোন অর্থ নেই, আমাদের নিজেদের গ্যারেজেও তো গাড়ি আছে। অতএব একে একে সবাই আবার পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জনের দেখাদেখি নিজেদের গাড়ি নিয়ে বের হবে, এবং শেষ মেষ তৈরি করবে আবারো সেই আগের মতো অসহনীয় যানজটের। বিশেষত সম্পদ যখন সীমাবদ্ধ থাকে তখন ব্যক্তিগত সুবিধা পেতে গিয়ে সমষ্টির সুবিধাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর ব্যাপারটাকে চলতি ভাষায় বলে ‘ট্র্যাজেডি অব দ্য কমনস’। এ ব্যাপারটাকে প্রথম একাডেমিয়ায় তুলে ধরেছিলেন প্রাণীবিজ্ঞানী গ্যারেট হার্ডিন্স ১৯৬৮ সালে একটি গবেষণাপত্রের মাধ্যমে। পরবর্তীতে আরো অনেক গবেষকদের গবেষণাতেই এবং গাণিতিক মডেলে এর সত্যতা পাওয়া গেছে।
বহু গবেষকই অভিমত দিয়েছেন ধর্মের ব্যাপারটাও সেরকমের। ধর্ম মানুষকে ব্যক্তিগত সুবিধা দিতে গিয়ে সমাজের সমষ্টির ক্ষতি করে চলেছে অবিরত। অনেকেই ধর্ম পালনের পেছনে কারণ হিসেবে বলেন, তারা ধর্ম পালন করেন, কারণ ঈশ্বরকে ডেকে কিংবা ধর্মের আচার আচরণ পালন করে তারা শান্তি পান। কথাটা হয়তো ঠিকই। ব্যক্তিগতভাবে শান্তি পেলেও, সমষ্টিগতভাবে সেগুলো তৈরি করছে বর্ণবৈষম্য, ধর্মযুদ্ধ, জাতিভেদ, নিম্ন বর্ণের উপর অত্যাচার কিংবা নারীদের অন্তরিন রাখার উপকরণ সহ নানা ধরণের অরাজকতা। বিবর্তন প্রক্রিয়া যেহেতু সমষ্টির উপর কাজ করে না, বরং কাজ করে একক ব্যক্তির জিনের উপর, এ ধরণের ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য তাই বিলুপ্ত না হয়ে টিকে থাকতেই পারে।
