এই আইন আজ পরিচিতি পেয়েছে ‘নতুন কালাকানুন’ হিসেবে[৭৪]। ইতোমধ্যেই এই কালাকানুনের শিকার হয়ে কারাবরণ করেছেন মুক্তচিন্তার দুই তরুণ মাহমুদর রহমান রায়হান (রায়হান রাহী) এবং উল্লাস দাশ। ফেসবুকে ধর্মবিরোধী মন্তব্য করার অজুহাতে এই দুই কিশোরকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়, এবং শেষ পর্যন্ত তুলে দেয়া হয় পুলিশের হাতে। আর পুরো ঘটনাটিতে উস্কানি দিয়েছিল রাজীব হায়দার শোভনের জানাজার ইমামকে হত্যার ফতোয়া দো উগ্র-জিহাদি তরুণ শাফিউর রহমান ফারাবী[৭৫]। ‘মানুষিকতা’ গ্রন্থের লেখক রায়হান আবীর বিডিনিউজ পত্রিকায় ঘটনাটির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখেন[৭৬]—
‘ঘটনার সূত্রপাত ৩০ মার্চ, ২০১৪। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র সংগ্রহের জন্য রাহী ও উল্লাস যখন কলেজে যাচ্ছিল বেলা এগারোটার দিকে, তখন স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংঘ ইসলামী ছাত্র শিবিরের পঞ্চাশ থেকে ষাটজন ক্যাডার তাদের উপর হামলা চালায়। অবশ্যই ধর্মানুভূতির জুজু পুঁজি করে।
হামলাকারীরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, প্রস্তুত ছিল তাদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা সম্বলিত উস্কানিমূলক পাঁচ পাতার ছাপানো লিফলেট। প্রথমে রাহী ও উল্লাসকে স্থানীয় মসজিদে নিয়ে মারধর করা হয় এবং পরে রাস্তায় নামিয়ে লিফলেট দেখিয়ে ও অন্য অনেকভাবে আশেপাশের মানুষদের উত্তেজিত করে নির্মম গণধোলাইযের আযোজন করা হয়।
ব্লগ ও পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি, জনতার ধর্মীয় জেশ উজ্জীবিত করতে কৈশোর-অতিক্রান্ত ছেলে দুটোকে ‘নারায়ে তাকবির শ্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে পিটিয়ে মুমূর্ষ করা হয়। শাহবাগ আন্দোলনের পর থেকে আমরা দেখেছি, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা মানুষের জ্যের প্রতিহত করতে স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে তাদের সরকারও যেন একাট্টা।
রাহী-উল্লাসের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উত্তেজিত জনতা যখন শিবিরের ক্যাডারদের সঙ্গে মিলেমিশে এই ছেলেগুলোকে হত্যাচেষ্টায় মগ্ন, সে সময় আগমন ঘটে স্থানীয় চকবাজার থানার পুলিশের। জনতার হাত থেকে ছাড়িয়ে এবার তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। যারা রাহী ও উল্লাসকে হত্যাচেষ্টায় লিপ্ত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার পরিবর্তে, তাদেরই চাপে পড়ে পুলিশ উল্টো ছেলে দুটোর নামে মামলা করে।
বাংলাদেশের সংবিধান পরিপন্থী কালাকানুন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধনী ২০১৩)–এর ৫৭ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আটক রাখা হয়। … মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে==
‘..দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাইয়া দেখিতে পাই যে, দুই জন লোককে ৫০/৬০ জন উত্তেজিত জনতা মারধর করিতেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ধৃত আসামীদ্বয়কে উত্তেজিত জনতার কবল হইতে উদ্ধার করিয়া উপস্থিত জনসাধারণকে জিজ্ঞেস করিয়া জানিতে পারি যে, উক্ত আসামিদ্বয় ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) সম্পর্কে বিভিন্ন অবমাননাকর ও মানহানিকর ধর্মীয় উস্কানিমূলক বক্তব্য পোস্ট করিয়াছে। এই সময় ঘটনার বিষয়ে ধৃত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করিলে তাহারা উপস্থিত লোকজনের সামনে নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে ফেসবুকে প্রকাশিত কটুক্তির বিষয় স্বীকার করে।
পাঠক লক্ষ্য করুন, এজাহারে কেমন করে নির্দোষ ছেলে দুটোকে আসামি এবং যারা হত্যাচেষ্টায় লিপ্ত তাদের উপস্থিত জনসাধারণ তকমা প্রদান করে সাধু সাব্যস্ত করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা নাকি ফারাবী শফিউর রহমান নামে একজনের ফেসবুক দেওয়ালে গিয়ে ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ করা বক্তব্য দিয়েছেন। ঠিক একই ধরনের অভিযোগ উল্লাসের বিরুদ্ধেও।
প্রতিদিন একজন করে মানুষকে নাস্তিক’ প্রমাণ শেষে তাকে হত্যা করার আহবান জানিয়ে ফারাবী আজ ইন্টারনেটের পরিচিত মুখ। অপরাজ্যে সংঘ’ নামক জামায়াত মনস্ক এক সন্ত্রাসী সংগঠনের আড়ালে থেকে ফারাবী গংই রাহী ও উল্লাসের উপর আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে।’
বোঝা যাচ্ছে ৫৭ ধারা তৈরি এবং এটি প্রয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে তথাকথিত ‘ধর্মানুভূতি’ রক্ষার নাজুক প্রক্রিয়া হিসেবেই। আর এই কালাকানুন নির্দ্বিধায় প্রযুক্ত হবে যখন রাষ্ট্র মনে করবে কোন লেখক ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ করছে। এই আইনের অপপ্রয়োগের ফলে সবচে’ বেশী ক্ষতি হবে অনলাইনের মুক্তমনা এবং প্রথাবিরোধী লেখকেরা। কারণ, কিছু লিখতে গেলেই ‘অনুভূতির বাণিজ্য’ টেনে এনে লেখককে গারদে পোরার বন্দোবস্ত করা হবে। এমনকি লেখকের নিজেকে দোষী কিংবা নির্দোষ প্রমাণের আগেই জেলে থাকতে হবে দিনের পর দিন, যেটা মানবিক এবং নাগরিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বোঝাই যাচ্ছে, ‘বিশ্বাসের ভাইরাস থেকে মুক্তি এত সহজ নয়!
০৪. ধর্ম কেন ভাইরাসের সমতুল্য?
ধর্মকে ভাইরাসের সাথে তুলনা করলে অনেক পাঠকই হয়তো গোস্বা করবেন। যারা আরেকটু আবেগপ্রবণ তারা হয়ত শুনেই কুৎসিত কুৎসিত কিছু গালি দিয়ে বসবেন। গালি দ্যোরই তো কথা। এত কোটি কোটি মানুষ যে ধর্মে বিশ্বাস করে, তারা কি সবাই ভাইরাস আক্রান্ত? আর সুস্থ কেবল আপনার মতো নাস্তিক নামধারী গুটিকয় কাঠবলদেরা?
