ছবি। পেজ ৮১
ছবি। পেজ ৮২
চিত্র: ২০১৩ সালের ২রা মে ব্লগারদের মুক্তির দাবীতে বাংলাদেশের প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন।
সিলেটেও আমাদের মুক্তমনা এবং যুক্তিবাদী বন্ধুরা মিছিল করেছিল ব্লগারদের মুক্তির দাবীতে।
ছবি। পেজ ৮২
চিত্র: সিলেটে ব্লগারদের মুক্তির দাবীতে বিক্ষোভ
আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম যে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে ক্রমশ। দেশে বিদেশে গড়ে উঠা আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে সরকারকে রীতিমত হিমসিম খেতে হবে। আমার অনুমান মিথ্যে হয়নি। একটা সময় পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে আটককৃত ব্লগার সুব্রত শুভ এবং রাসেল পারভেজকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। এর পর ব্লগার বিপ্লব এবং সবশেষে আসিফ মহিউদ্দীন মুক্তি পান জুন মাসে।
আসিফের মুক্তির পরপরই আমি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম—
‘গাধা সবসময়ই পানি খায়, কিন্তু একটু ঘোলা করে।
আসিফ মহিউদ্দীনের জামিনের খবরটা শুনে এটাই মনে পড়ল প্রথমে। গত পয়লা এপ্রিল জামাতি আর হেফাজতি মোল্লাদের তোষামোদ করতে গিয়ে যেভাবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রগতিশীল ব্লগারদের হাতকড়া পরিয়ে পাকড়াও করা হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এর পর থেকেই আমরা চেষ্টা করেছি ব্লগারদের মুক্ত করতে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। আমাদের সে আহবানে সাড়া দিয়ে সারা বিশ্বের মুক্তচিন্তক আর মানবতাবাদীরা রাস্তায় নেমেছেন প্ল্যাকার্ড হাতে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সিএফআই, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস সহ বহু সংগঠনই বিবৃতি দিয়েছিল সরকারের বাক স্বাধীনতার উপর এই আগ্রাসনের প্রতিবাদে আমি নিজেও বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলাম আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। আর বাংলাদেশে ব্লগার এবং অ্যাক্টিভিস্টরা তো কয়েক দফা করে পথে নেমেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাই সবাইকে যারা আসিফের এই কঠিন সময়গুলোতে পাশে ছিলেন, আশার খোরাক যুগিয়েছিলেন।
তবে বিপরীত দৃশ্যও যে দেখিনি তা নয়। অনেকে আবার চেয়েছিলেন সাড়া জীবনই আসিফ জেলে থাকুন। রাস্তায় ফেলে আরেক দফা কোপালে কিংবা ফাঁসি দিয়ে দিলে তো আরো ভাল। কেবল ‘কাঁঠাল পাতা চিবানো ছাগুরা নয়, ছাগু ভাড়ানো’ সেলেব্রিটি ব্লগার, আম্বালিগার, পর্নস্টার সবাই ছিলেন আসিফের এই কল্লা ফেলার মিশনে অগ্রণী শরিক। ছাগুবাহিনী আর মুজিব বাহিনী গ্যাং-ব্যাং গ্রুপ করে মিশনে নেমেছিলেন; আসিফের মুক্তি চেযে কেউ স্ট্যাটাস দিলেই মুছে দিতে শুরু করেছিল তারা। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম— এরাই নাকি শাহবাগ আন্দোলনের পুরোধা, এরাই নাকি দেবে জাতিকে মুক্তি!
আমি অনেক দিন ধরেই দাঁতে দাঁত চেপে আজকের এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম, এক মাঘে শীত যায় না। আসিফ একদিন মুক্তি পাবেন, লেখালিখি শুরু করবেন, শুধু জামিন নয়, সামগ্রিকভাবে মামলা থেকেও মুক্তি পাবেন তিনি। তিনি এখন স্বনামেই পরিচিত দেশে, বহির্বিশ্বে– হয়তো দেশের বাইরেও চলে আসতে পারবেন, চাইলেই, কিন্তু কারাগারে বন্দি অবস্থায় যে বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ তিনি পেয়েছেন সেলেব্রিটি নামধারী কিছু সহব্লগারদের কাছ থেকে সেটা ইতিহাসে লেখা থাকবে।
অভিনন্দন আসিফ মহিউদ্দীন। অভিনন্দন মুক্তচিন্তার বিজযে। আমরা পাশে আছি।’
এই সময় ব্লগারদের মুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে আমি একটা লেখা লিখি ফ্রি ইনকোয়েরি (Free Inquiry) নামে আমেরিকার বিখ্যাত একটি ম্যাগাজিনে ‘ফাদার অব সেকুলারিজম’ হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত দার্শনিক পল কার্ড ছিলেন এই ম্যাগাজিনটির প্রতিষ্ঠাতা। ক্রিস্টোফার হিচেন্স, রিচার্ড ডকিন্স, স্যাম হ্যারিস, পিজি মায়ার্স এর মত বিদগ্ধ লেখক এবং চিন্তাবিদেরা এই ম্যাগাজিনটির সাথে জড়িত। বাংলাদেশে ব্লগারদের উপর আগ্রাসনের পর থেকেই তারা এ ব্যাপারে একটি লেখা প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিলেন। আমি আমার বিশ্লেষণ হাজির করেছিলাম অক্টোবর/নভেম্বর সংখ্যায় Freethought Under Attack in Bangladesh নামে[৭৩]।
লেখাটিতে বলেছিলাম, “হ্যাঁ ব্লগারদের মুক্তি নিঃসন্দেহে মুক্তচিন্তার বিজয়। তবে, একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে। দেশ এবং দেশের বাইরে মুক্তমনাদের সম্মিলিত চাপের কাছে সরকার নতি স্বীকার করলেও তাদের পরিপূর্ণভাবে মুক্তি দেওয়া হয়নি, মুক্তি দেয়া হয়েছে জামিনে। রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা মাঝে মধ্যে মুক্তবুদ্ধিকে জামিন দেয়, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে মুক্তি দিতে পারেনা। মুক্তবুদ্ধি এবং মুক্তান্বেষণের পরিপূর্ণ মুক্তি রাষ্ট্রের শাসক এবং ভাইরাস-আক্রান্ত মননের প্রজাদের জন্য বিপদজনক।’
আমার অনুমান যে ভুল ছিল না, তার প্রমাণ পাওয়া গেল কিছুদিনের মধ্যেই। ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (সংশোধন) অধ্যাদেশে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা, যেখানে ৫৭ ধারা নামে একটি ধারা সংযুক্ত হয়েছে। এই ধারায় আছে, ‘রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তা হলে তার এই কার্য হবে একটি অপরাধ।
