প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার কাছে এর অনেকগুলো উত্তর আছে। প্ৰথম উত্তর হচ্ছে, সংখ্যাধিক্যের উপরে কোন বৈজ্ঞানিক সত্যতা নির্ভর করে না। একটা সময় পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করতো যে পৃথিবীটা সমতল, কিংবা সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেছে বলেই সেটা সত্য হয়ে যায়নি। আজকের দিনেও অধিকাংশ মানুষ ঈশ্বর, জ্বিন, ভুত, পরকাল, স্বর্গ নরক, ফেরেশতা, ইবলিস প্রভৃতি কেচ্ছাকাহিনিতে বিশ্বাস করে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে বলেই সেগুলো সত্য নয়, বরং বোঝা যায় পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এখনো যুক্তি দিযে, বিজ্ঞানমনস্ক মানসিকতা দিয়ে বিশ্লেষণ করতে অক্ষম। সংখ্যাধিক্যের উপমা হাজির করে বিতর্কে জয়লাভের চেষ্টা আসলে একধরনের ফ্যালাসি। এর একটা কেতাবি নাম আছে– ‘Argumentum ad populum’।
আর তাছাড়া অধিকাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করে বলেই সেটা ভাইরাস হতে পারবে না তা তো নয়। বহু সময়ই আমরা ইতিহাস বইয়ে পড়েছি— প্লেগে, গুটি বসন্তে কিংবা কলেরায় গ্রামকে গ্রাম চোখের সামনে উজাড় হয়ে যেত। দেখা যেত, ভাইরাস বা। জীবাণুর মহামারীতে একটি গ্রামের সকল মানুষ মারা গেছে, বেঁচে আছে স্বল্প সংখ্যক সৌভাগ্যবানেরা, যাদের মধ্যে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছিল। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মারা গেছে বলেই ভাইরাসটি মিথ্যে হয়ে যায় না। কিংবা দু’চার জন বেঁচে থাকা গ্রামবাসীও কাঠবলদ হয়ে যায় না। যারা ডারউইনের বিবর্তন তত্বের সাথে পরিচিত এবং বোঝেন বিবর্তন কীভাবে কাজ করে, তারা জানেন, বিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে শতকরা নিরানব্বই ভাগ প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যায়। সে তুলনায় টিকে থাকে গুটি কযেক। অধিকাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায় বলেই বিবর্তন মিথ্যে হয়ে যায় না।
কাজেই, রাগ করুন আর যাই করুন, ধর্মের বিস্তার আর টিকে থাকার ব্যাপারগুলো ভাইরাসের মত করেই কাজ করে অনেকটা। একটি ভাইরাসের যেমন একগাদা ‘হোস্ট’ দরকার হয় বংশবৃদ্ধির জন্য, নিজেকে ছড়িয়ে দেবার জন্য, ধর্মেরও টিকে থাকার জন্য দরকার হয় এক গাদা অনুগত বান্দা এবং সেবকের, যাদের বুকে আশ্রয় করে ধর্ম টিকে থাকে। শুধু তাই নয়, জীবাণু যেমন নিজেকে রক্ষার জন্য অন্য জীবাণুর সাথে প্রতিযোগিতা করে, ঠিক তেমনি এক বিশ্বাসও প্রতিযোগিতা করে অন্য বিশ্বাসের সাথে। নিজেকে অন্য বিশ্বাসের হাত থেকে রক্ষা করতে চায়। বিশ্বাসী বান্দাদের মনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়— “অবিশ্বাসীদের কিংবা বিধর্মীদের কথা বেশি শুনতে যেয়ো না, ঈমান আমান নষ্ট হয়ে যাবে। ভাইরাস যেমন চোখ বন্ধ করে নিজের কপি করে করে জীবাণু ছড়িয়ে যায়, প্রতিটি ধর্মীয় বিশ্বাস অন্য বিশ্বাসগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে কেবল নিজের বিশ্বাসের কপি করে যেতে থাকে। বিস্তার ঘটাতে থাকে বিশ্বাস নির্ভর সাম্রাজ্যের।
জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘জিন’ বংশগতির ক্ষুদ্রতম একক। জিনের মধ্যে থাকে সংরক্ষিত তথ্য। জীববিজ্ঞানের বইয়ে জিনের যে ছবি দেয়া থাকে, তা থেকে দেখা যায় জিন ডিএনএ’র নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। ডিএনএ তা হলে কি? সোজা কথায় ডিএনএ হচ্ছে চারটি ভিন্ন প্রকৃতির নিউক্লিওটাইডে তৈরি অণু, যাদের বিন্যাস জীবের জিনগত বৈশিষ্ট্যের নিয়ামক। আমার মাথায় কোঁকড়া চুল থাকবে না টাক থাকবে, গায়ের রঙ কালো হবে না সাদা, সেটা জেনেটিক বৈশিষ্ট্যগুলোই নির্ধারণ করে দেয়। এখন, ডিএনএর ক্ষেত্রে আমরা তথ্য বলতে যেটাকে বুঝি সেটা আসলে ‘রাসায়নিক নির্দেশাবলী’। এই নির্দেশাবলী থেকেই কিন্তু কোষ বুঝতে পারে কিভাবে কিছু বিশেষ ধরণের প্রোটিন তৈরি করা যাবে, যার ফলে দেহের উপাদানগুলো টিকে থাকতে পারে। এই নির্দেশাবলীকেই চলতি ভাষায় ‘ক্লপ্রিন্ট’ বা নীলনকশা বলা হয়, যদিও কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন রেসিপি’ শব্দটাই বরং এক্ষেত্রে অধিকতর সঠিক[৭৭]। তবে এর বাইরে আরেকটি ব্যাপার থাকে যেটা ছাড়া পুনরাবৃত্তি বা কপির ব্যাপারটা ঘটবে না। মোটিভেশন বা প্রেষণা। এটা এক ধরনের প্রোগ্রামের মত, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে নিজেকে পুনরাবৃত্তির জন্য পরিচালিত করে।
জিনের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের তুলনা করলে দেখা যায়, সেটাও কাজ করে অনেকটা একই রকমভাবেই। ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার আচরণের মধ্যেও নানা তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। আর থাকে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী, যে নির্দেশাবলীকে ঐশ্বরিক মনে করে পালন করে যায় এর অনুগত সেবকেরা। সেবকদের সেই বিশ্বাসগুলো ছড়িয়ে দেবার পেছনেও থাকে মোটিভেশন বা প্রেষণা।
ছবি। পেজ ৯০
চিত্র: বর্ধিত স্কেলে দেহকোষ, ক্রোমোজোম, ডিএনএ এবং জিন
বিশ্বাস বা ধ্যান ধারণা ছড়ানো এবং জিনের প্রতিলিপির মাঝে যে দারুণ একটা সাদৃশ্য আছে, সেটা প্রথম নজরে পড়ে খ্যাতনামা বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্সের, যার কথা আমরা প্রথম অধ্যায়ে জেনেছি। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, বিশ্বাসের পুনরাবৃত্তি অনেকটা জিনের পুনরাবৃত্তির মতোই। তিনি এর নামকরণ করেন, ‘mnemonic gene’ বা সংক্ষেপে meme (মিম)[৭৮]। বস্তুত ডারউইনের বিবর্তনবাদের উপর ভিত্তি করেই এই মিমের ধারণা। দাঁড় করিয়েছিলেন ডকিন্স, যদিও এর বিস্তার ডারউইনীয় পদ্ধতির বদলে বহুলাংশেই। ল্যামার্কিন বলে আজকের দিনের গবেষকেরা মনে করেন।
