পরদিন (এপ্রিল ৭, ২০১৩) আরো বলিষ্ঠ ভাবে ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সংহতি সমাবেশে অভিমত দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ। ‘মুক্তচিন্তার প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে সরকার শিরোনামের সংবাদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উঠে এসেছিল—
‘ধর্মান্ধ মৌলবাদী হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে ব্লগারদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু যারা ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। এর মাধ্যমে সরকার মুক্তচিন্তার প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুব্রত অধিকারী শুভসহ গ্রেপ্তার করা ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত সংহতি সমাবেশে এসব কথা বলেন বক্তারা।
আজ রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান বলেন, যারা ব্লগ সম্পর্কে জানে না, তারা ব্লগ নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখে না। গ্রেপ্তারকৃতদের ব্লগার বলতে চাই না, তাঁদের লেখক বলতে চাই। প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে এদেরকে মুক্তি দিন।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাবেরী গাযেন বলেছিলেন, “ব্যক্তিগত ব্লগ নিয়ে নিয়ে যারা গণমাধ্যমে প্রচার করে সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিল, তাদের গ্রেপ্তার করা হলো না। গ্রেপ্তার করা হলো মুক্তচিন্তার মানুষকে। যারা হাজার হাজার মন্দির ভাঙছে, সহিংসতা চালাচ্ছে, বোমা মেরে মানুষ হত্যা করছে, তারা কি অন্য মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছে না? রাষ্ট্র আসলে কার ধর্মানুভূতি রক্ষা করতে চায়?
রাষ্ট্র আসলে কার ধর্মানুভূতি রক্ষা করতে চায়— এ প্রশ্নটা তো ছিল আমারো। এ ধরণের প্রশ্ন অনেক আগেই করেছেন হুমায়ুন আজাদ তাঁর বিখ্যাত ‘ধর্মানুভূতির উপকথা শীর্ষক প্রবন্ধে। তিনি বলেছিলেন, “আমার অজস্র অনুভূতি দিনরাত আহত হয়; পত্রপত্রিকায় গ্রন্থে গ্রন্থে নিকৃষ্ট শিল্পকলাহীন কবিতার মতো ছোটো বড়ো পঙক্তির প্রাচুর্য দেখে আহত হয় আমার কাব্যানুভূতি, নিকৃষ্ট লঘু অপন্যাসের লোকপ্রিয়তা দেখে আঘাত পায় আমার উপন্যাসানুভূতি; রাজনীতিবিদদের অসততা ভণ্ডামোতে আহত হয় আমার রাজনীতিকানুভূতি; এবং আমার এমন অজস্র অনুভূতি নিরন্তর আহত রক্তাক্ত হয়, আমি ওগুলোর কোনো চিকিৎসা জানি না, ওগুলো নিয়ে আমি কোন জঙ্গলে কোন রাস্তায় চিৎকার করবো, তাও জানি না। রাষ্ট্র এগুলোকে অনাহত রাখার কোনো ব্যবস্থা করে নি, রাষ্ট্রের মনেই পড়ে নি এগুলোর কথা। রাষ্ট্রের কি দাযিত্ব নয় আমার এসব অমূল্য অনুভূতিকে অনাহত রাখার সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেয়া? সবাই বলবে এটা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়, তাহলে তাকে খুলতে হবে একটি বিকট ‘অনুভূতি মন্ত্রণালয়, যার কাজ হবে কোটি কোটি মানুষের কোটি কোটি অনুভূতির হিশেব নেয়া, সেগুলোর আহত হওয়ার সূত্র বের করা, এবং সেগুলোকে সব ধরনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করা। আমার শিল্পানুভূতি, সৌন্দর্যানুভূত রাজনীতিকানুভূতি, কাব্যানুভূতি প্রভৃতি পাহারা দেয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়; কিন্তু এখন রাষ্ট্র এক উদ্ভট দায়িত্ব নিয়েছে, মনে করছে ধর্মানুভূতি পাহারা দেয়া তার কাজ। তাই রাষ্ট্র দেখে চলছে কোথায় আহত হচ্ছে কার ধর্মানুভূতি।’
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা যখন ‘ধর্মানুভূতি’ রক্ষায় ব্যস্ত, এ সময় সেন্টার ফর ইনকোয়েরির পাবলিক পলিসি বিভাগের ডিরেক্টর মাইকেল ডি ডোরা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে আসলেন আমার কাছে। তারা সারা বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করতে চান। আর এই প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেবেন সিএফ আই, আইএইচইউ, অ্যাথিস্ট অ্যালায়েন্স, আমেরিকান এথিস্ট, আমেরিকান হিউম্যানিস্ট সহ সারা বিশ্বের বড় বড় মুক্তচিন্তার সংগঠনগুলো।
এই সব মুক্তচিন্তক সংগঠনের সবারই আলাদা আলাদা এজেন্ডা আর আদর্শ থাকলেও বাংলাদেশের ব্লগারদের মুক্তির ব্যাপারে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদের একটা কর্মসূচী হাতে নিলেন তারা। শুরু হল ‘Worldwide Protests for Free Expression in Bangladesh ক্যাম্পেইন[৭২]।
প্রথমে ২৫শে এপ্রিল প্রতিবাদ কর্মসূচীর তারিখ ধার্য হয়, কিন্তু কর্মসূচীর একদিন আগে সাভারে রানা প্লাজা নামের একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। সহস্রাধিক মানুষ এ দুর্ঘটনায় নিহত হয়, আহত হয় দুই হাজারের বেশি মানুষ। এই মর্মান্তিক সাভার দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে সেটা পিছিয়ে ২রা মে তে নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যে কিছু সংগঠন পূর্বনির্ধারিত ২৫শে এপ্রিলেই প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অন্যরা ২রা মে।
ছবি। পেজ ৭৯
চিত্র: আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ অ্যাম্বেসির সামনে আন্তর্জাতিক মুক্তচিন্তার সাথে জড়িত সংগঠনের প্রতিবাদের কিছু ছবি।
এ নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করার তাগিদ অনুভব করছি। সাড়া বিশ্বে অনেক মুক্তচিন্তক এবং মানবতাবাদী প্রতিষ্ঠান প্রতিবাদের ডাক দিলেও, ২রা মে বাংলাদেশের কাউকেই এ নিয়ে উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছিল না। যে দিনটিতে বাংলাদেশের ব্লগারদের মুক্তির জন্য সাড়া বিশ্বের মুক্তচিন্তার মানুষগুলো সমাবেশ করার উদ্যোগ নিয়েছিল, সেখানে খোদ বাংলাদেশে সে দিনটিতে কোন কর্মসূচী না থাকাটা পীড়াদায়ক ছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু শেষ সময় সবার সাথে যোগাযোগ রলি এবং মানববন্ধন করার মত অসম্ভব কাজকে সম্ভব করে তুললেন ফারজানা কবীর খান সিদ্ধা। স্নিগ্ধার আহবানে সাড়া দিয়ে ইশরাথ রথী, সৈয়দ ইমরান আলী, মিরাজি মিরাজ, মিয়া সাজু, আশরাফুল পিস, পারভেজ আলম, বাকী বিল্লাহ, আকতারুজ্জামান আজাদ, অনন্য আজাদ, ওয়াহিদা হোসেন প্রিয়া, ওয়াশিকুর বাবু, জুযেল মাহমুদ, সাদাত নিলয়, এবং সাদমান সৌমিক, ইয়াসির জুয়েল সহ আরো অনেক অনলাইন এক্টিভিষ্ট এবং ব্লগাররা মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সকল বাধা, ভয় ভীতিকে দূরে ঠেলে দিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সভা ও মানব বন্ধনে দাড়িয়ে গেলেন তারা।
