মৌলবাদীদের বানানো ৮৪ জন ব্লগারের তালিকা সরকারীভাবে গ্রহণ এবং পত্রিকায় প্রকাশেরও সমালোচনা করল তারা। আই. এইচ.ই.ইউর প্রেসিডেন্ট তার বার্তায় উল্লেখ করেছেন, “এই নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে সরকারী ধরপাকড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আই.এইচ.ই.ইউ দ্বিতীয় আরেকটি স্টেটমেন্ট প্রদান করে এপ্রিল মাসের নয় তারিখে। ‘Call to action: Defend the bloggers of Bangladesh’ শিরোনামের এ বিবৃতিতে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের মুক্তচিন্তকদের উপর আগ্রাসন প্রতিরোধ করার আহবান জানিয়েছে সংগঠনের সদস্যদের।
এর পরে বহু বড় ঘটনাই ঘটেছে। এর মধ্যে সেন্টার ফর ইনকোয়েরি (CFI) এর পক্ষ থেকে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে চিঠি লেখা হয়েছে। চিঠি লেখা হয়েছে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূতকেও। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট (IFJ) ব্লগারদের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এথিস্ট অ্যালায়েন্স ইন্টারন্যাশনাল’ (AAI) ব্লগারদের তাৎক্ষণিক মুক্তি দাবী করেছে। এথিস্ট অ্যালায়েন্স-এর প্রেসিডেন্ট কার্লোস ডিজ স্বাক্ষরিত বক্তব্যে তারা ব্লগারদের মুক্তির ব্যাপারে যে কোন সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। তীব্র প্রতিবাদ এসেছে গ্লোবাল ভয়েস এডভোকেসি গ্রুপ থেকেও প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী এবং অ্যাক্টিভিস্ট পি জে মায়ার্স তার ব্লগে বাংলাদেশী মুক্তচিন্তকদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। ব্লগে বিবৃতি দিয়েছেন বিখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন, মরিয়ম নামাজী প্রমুখ। সিএনএন, বিবিসি, হাফিংটনপোস্ট, স্লেট সহ বহু মিডিয়ায় মুক্তচিন্তকদের গ্রেফতারের ব্যাপারে সরকারের সমালোচনামূলক প্রবন্ধ এবং পোস্ট এসেছে। ব্লগারদের মুক্তির দাবীতে পিটিশনও হয়েছে বেশ কিছু ব্যক্তি এবং সংঘের পক্ষ থেকে। এর মধ্যে আমেরিকান হিউম্যানিস্ট আমেরিকার অ্যাম্বাসেডরকে পদক্ষেপ চেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে তাদের পিটিশনে। প্রতিবাদ এবং কর্মসূচী এসেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকেও। এই আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর অবদানের কথা উল্লেখ করে আমি ইংরেজি এবং বাংলায় বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখি।
এ সময় মাইকেল শারমার তার পত্রিকায় বাংলাদেশের ব্লগারদের নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন। যারা বিজ্ঞানমনষ্কতা, সংশয়বাদ, যুক্তিবাদ নিয়ে কাজ করেন তারা সবাই মাইকেল শারমারকে এক নামে চেনেন। এই ভদ্রলোক আজ যুক্তি এবং শিক্ষার প্রসারে সারা বিশ্বের ‘আইকন’। ‘বিলিভিং ব্রেন’, ‘হোয়াই ডারউইন ম্যাটারস’, ‘দ্য সাযেন্স অব গুড এন্ড ইভিল সহ একগাদা ভাল বই আছে তার, আর পাশাপাশি তিনি প্রকাশ করেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন ‘স্কেপ্টিক’ (Skeptic) নামে। এ ম্যাগাজিনটি অলৌকিকতা, কুসংস্কার এবং অপবিশ্বাসের বিপরীতে সোচ্চার কণ্ঠ। সেই স্কেপ্টিক ম্যাগাজিনের অনলাইন ভার্শন ইস্কেপ্টিকে আমার ‘The Struggle of Bangladeshi Bloggers’ প্রবন্ধটি শারমার ‘ফিচার আর্টিকেল হিসেবে প্রকাশ করেন[৭০]। স্কেপ্টিকের মত সাইটে ফিচার আর্টিকেল হিসেবে লেখা প্রকাশিত হওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের এবং গর্বের। কিন্তু তখনো আমার সহব্লগারেরা অন্যায়ভাবে জেলখানায় আটকে ছিল, তাই আমার মনে ছিল না কোন গর্ব, ছিল না কোন আনন্দ।
বিডিনিউজ পত্রিকায় সে সময় একটি লেখা লিখেছিলাম, ‘মুক্তমতের প্রকাশ ও মুক্তবিশ্বের ভাবনা’ শিরোনামে, যেখানে আভাস দিয়েছিলাম[৭১]।—
‘ধর্মদ্রোহিতার অজুহাতে আটক চারজন ব্লগারের মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য মৌলবাদী দলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সুব্রত অধিকারী শুভ, মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ ও আসিফ মহিউদ্দীনকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাকে মতপ্রকাশের উপর আঘাত হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার সংস্থা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী বিভিন্ন সংগঠন। …বহির্বিশ্বের মিডিয়া এবং সংবাদপত্রগুলোতেও বাংলাদেশের ব্যাপারে নেতিবাচক সংবাদ এসেছে ব্লগারদের উপর ধরপাকড় চালানোর পর। সিএনএন, বিবিসি, হাফিংটন পোস্ট, স্লেটসহ বহু মিডিয়ায় মুক্তচিন্তকদের গ্রেফতারের ব্যাপারে সরকারের সমালোচনামূলক প্রবন্ধ এবং পোস্ট এসেছে। ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে পিটিশনও হয়েছে বেশ কিছু ব্যক্তি এবং সংঘের পক্ষ থেকে। এর মধ্যে আমেরিকান হিউম্যানিস্ট আমেরিকার অ্যাম্বেসেডরকে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে তাদের পিটিশনে। বোঝাই যাচ্ছে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
অনেকেই ধারণা করছেন সরকার যদি এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করেন, যদি ব্লগারদের বাকস্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে তাদের মুক্তি না দেন, তবে তা বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তির জন্য শুভ ফলাফল বয়ে আনবে না।
বাংলাদেশ থেকেও আমরা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সমর্থন পাচ্ছিলাম, বিশেষতঃ সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের তরফ থেকে। যেমন, ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের ৫ তারিখে ‘মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ না করার আহবান জানিয়েছিলেন দেশের ২০ বিশিষ্ট নাগরিক। তার মধ্যে আছেন, ড. সালাউদ্দিন আহমেদ, ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ড. আকবর আলি খান, অজয় রায়, কাইয়ূম চৌধুরী, রামেন্দু মজুমদার, ডা. সারওয়ার আলী, অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী, খুশী কবীর, সুপ্রিয় চক্রবর্তী, তারেক আলী, ড. মুহাম্মদ। জাফর ইকবাল, এম এম আকাশ, ড. ইয়াসমিন হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, শাহীন আনাম ও রোবায়েত ফেরদৌস। তারা বলেছেন, আপনারা সর্বজনের ধর্মানুভূতি রক্ষা করুন, তবে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করবেন না। এর ফলে দেশে বিদেশে ভুল বার্তা। পৌঁছুবে। দেশের স্বনামখ্যাত বুদ্ধিজীবীরা গ্রেফতারকৃত চার ব্লগারদের মুক্তি দাবী করেছিলেন সেসময়।
