এই রকম চলল আরও দিন–দশ–বারো। তার পরে সাধুর ডাক এল বরাকর না কোডার্মার এক গাড়োয়ালী জমিদারবাড়িতে কি শান্তি–স্বস্ত্যয়ন করার জন্যে। সাধুজী প্রথমে যেতে রাজী হন নি, দু–দিন তাদের লোক ফিরে গিয়েছিল কিন্তু তৃতীয় বারে জমিদারের ছোট ভাই নিজে পাল্কী নিয়ে এসে সাধুকে অনেক খোশামোদ করে নিয়ে গেলেন।
মনে ভাবলম এ আর কিছু নয়, সাধুজী সেই মেয়েটিকে ছেড়ে একটি রাত্রিও বাইরে কাটাতে রাজী নন।
কিন্তু নিকটে কোথাও বস্তি নেই, মেয়েটি আসেই বা কোথা থেকে? আর সাধারণ সাঁওতাল বা বিহারী মেয়ে নয়—আমি অনেকবার দেখেছি সেটিকে এবং প্রত্যেক বারই আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে এ কোন বড় ঘরের মেয়ে, যেমন রুপসী, তেমনি তার অন্তত ধরণের অতি চমৎকার এবং দামী পরণ-পরিচ্ছদ।
হঠাৎ আমার মনে একটা দুষ্টবুদ্ধি জাগল। আমার মনে হয়েছিল মেয়েটিকে সাধুজীর হয়তো খবর দেওয়ার সুযোগ হয় নি দেখাই যাক না আজ রাত্রে আসে কি না? তখন ছিল অল্প বয়েস, তোমরা যাকে বল রোমান্স, তার ইয়ে তখন যে আমার যথেষ্টই ছিল, এতে তুমি আমাকে দোষ দিতে পার না।
নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগে রাত্রে সেদিন আমি নিজেই গিয়ে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে রইলাম। মনে ভয়ানক কৌতূহল, দেখি আজ মেয়েটি আসে কিনা। কেউ কোন দিকে নেই, নির্জন রাত্রি, মনে একট, ভয়ও হ’ল—এ ধরণের কাজ কখনও করি নি, কোন হাঙ্গামায় আবার না পড়ে যাই!
তখন আমি অপরিণতবুদ্ধি নির্বোধ যুবক মাত্র, তখন ঘুণাক্ষরেও যদি জানতাম অজ্ঞাতসারে কি ব্যাপারের সম্মুখীন হতে চলেছি তবে কি আর ছাতিমতলায় একা পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসতে যাই?
তার নয়, ও আমার অষ্টের লিপি। সে রাত্রির জের আমার জীবনে আজও মেটে নি। আমার মনের শান্তি চিরদিনের জন্যে হারানোর সুত্রপাতটি ঘটেছিল সেই কালরাত্রে–তা কি আর তখন বুঝেছিলাম!
যাক, ও-কথা।
রাত ক্রমে গভীর হ’ল। পুব দিকের গাছপালার আড়াল থেকে চাঁদ উঠতে লাগল একটু একটু করে। আমার ডাইনেই বরাকর নদী, দুই পাড়েই শিলাখন্ড ছড়ানো, তার ওপর জ্যোৎস্না এসে পড়ল। সেই নদীর পাড়েই ছাতিমতলা ও পঞ্চমুণ্ডির আসন—আমি যেখানে বসে আছি। আমার বাঁ দিকে খানিকটা ফাঁকা ঘাসের মাঠ—তার পর শালবন শুরু হয়েছে।
হঠাৎ সামনের দিকে চেয়ে আমি চমকে উঠলাম। আমার সামনে সেই মেয়েটি কখন এসে দাঁড়িয়েছে এমন নিঃশব্দে, এমন অতর্কিত ভাবে যে আমি একেবারেই কিছু টের পাই নি। অথচ আগেই বলেছি আমার একদিকে বরাকর নদীর জ্যোৎস্না–ওঠা শিলাবিস্তৃত পাড় আর এক দিকে ফাঁকা মাঠ। আসনে বসে পর্যন্ত আমি সতর্ক দৃষ্টিও রেখেছি। মাঠের দিকে! নদীর দিক থেকে আমার কাছে কারো আসা সম্ভব নয়—মাঠের দিক থেকে কেউ এলে আমার দৃষ্টি এড়ানোর কথা নয়। মেয়েটি যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে আধ সেকেণ্ড আগেও কেউ ছিল না আমি জানি, আধ সেকেণ্ড পরেই সেখানে জলজ্যান্ত একটি রুপসী মেয়ের আবির্ভাব আমার কাছে সম্পণ ইন্দ্রজালের মত ঠেকল বলেই আমি চমকে উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে সেই মদ, মধুর সুগন্ধ! আমার সারা দেহ–মন অবশ আচ্ছন্ন হয়ে উঠল।…আমার জ্ঞানও বোধ হয় ছিল তার পর আর এক সেকেণ্ড। তার পরে কি ঘটল আমি আর কিছুই জানি না।
যখন আমার আবার জ্ঞান ফিরে এল তখন ভোর হয়েছে। উঠে দেখি সারারাত সেই পঞ্চমুণ্ডির আসনেই আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলাম। নৈশ শীতল বায়তে বাইরে সারারাত পড়ে থাকার দরুন গায়ে ব্যথা হয়েছে, গলা ভার হয়েছে। উঠে ধীরে ধীরে মন্দিরে চলে এলাম। এসে আবার শুয়ে পড়লাম। আমার মনে হল আমার জ্বর হবে, শরীর এত খারাপ।
পরদিন সারাদিন কিছু না খেয়ে শুয়েই রইলাম আর কেবলই কাল রাত্রের কথাটা ভাবি।
মেয়েটি কে? কি করে অমন নিঃশব্দে অতর্কিতে ওখানে এল? এ তো একেবারে অসম্ভব। অসামান্য রপসী যে মেয়েটি, অজ্ঞান হয়ে পড়বার পর্বে ওই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা আমি দেখে নিয়েছিলাম। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লামই বা কেন, এরও তো কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পেলাম না! অথচ সেই কথা নিয়ে মনের মধ্যে তোলাপাড়া করাও সারাদিন আমার ঘচল না। বিকেলের দিকে সাধুবাবাজী গাড়োয়াল। জমিদারবাড়ি থেকে ফিরলেন। আমার জন্যে লাড্ড, কচৌড়ি এবং একটা মোটা সুতি চাদর এনেছেন—তাঁর নিজের জন্যে জমিদারবাড়ি থেকে ভাল একখানা পশমী আলোয়ন দিয়েছে!
আমায় বললেন—শুয়ে কেন? ওঠ—জিনিসগুলো রেখে দাও–
অতিকষ্টে উঠে সাধুর হাত থেকে পুঁটুলিটা নিলাম। তিনি আমার দিকে চেয়ে বললেন—কি হয়েছে?…অসুখ-বিসুখ নাকি?
কিছু জবাব দিলাম না।
সাধু স্নান করতে গেলেন এবং এসে জমিদার-বাড়ির কাণ্ড কি রকম তারই সবিস্তারে বর্ণনা করতে লাগলেন। আমায় বললেন–তোমার কি হয়েছে বল তো? অমন মনমরা ভাব কেন? বারি জন্যে মন কেমন করছে বুঝি? বলেছি তো বাবা, তোমরা ছেলে-ছোকরা এ-পথে কি নামলেই নামা যায় রে বাপু! বড় কঠিন পথ।
সেই রাত্রে আমার খুব জ্বর এল। কত দিন ঠিক জানি না—অজ্ঞান অচৈতন্য রইলাম। জ্ঞান হ’লেই দেখতাম সাধু শিয়রে বসে আছেন। বোধহয় তাঁরই সেবাষত্নে এবং দয়ায় সেবার ক্রমে সেরে উঠলাম।
সেরে উঠে একদিন গাছতলায় বসেছি দুপুরের পরে, সাধু, বললেন—ছেলেছোকরা কিনা, কি কাণ্ডটা বাধিয়ে বসেছিলে বাপ? এবার তো বাঁচতে না—অতিকষ্টে বাঁচাতে হয়েছে। আচ্ছা বাপু, পঞ্চমুণ্ডির আসনে কি জন্যে গিয়েছিলে সেদিন রাত্রে?
