মেয়ে চলিয়া গেলে আমার দিকে চাহিয়া বলিল—ছেলেপিলের সামনে সে-সব গল্প–চা-টা খেয়ে নাও, পরোটাখানা–না না, ফেলতে পারবে না, ইয়ং ম্যান তোমরা এখন–খাওয়ার বেলা অমন—ওই বৃষ্টির জলেই হাত ধুয়ে ফেলো–
চা পানের পরে তারানাথ বলিতে আরম্ভ করিলঃ
বীরভূমের শ্মশানের যে পাগলীর অদ্ভুত কাণ্ড সেবার গল্প করেছিলাম, তার ওখান থেকে তো চলে এলাম সেই কাণ্ডের পরেই।
কিন্তু তন্ত্রশাস্ত্রের প্রতি আমার একটা অত্যন্ত শ্রদ্ধা হয়ে গেল তার পর থেকে। নিজের চোখে যা দেখলুম, তা তো আর বিশ্বাস না করে পারি না। এটা পাগলীর কথা থেকে বুঝেছিলাম, পাগলী আমায় ইন্দ্রজাল দেখিয়েছিল নিম্নতন্ত্রের সাহায্যে। কিন্তু সে তো ব্ল্যাক ম্যাজিক ছাড়া উচচতন্ত্রের কথাও বলেছিল। ভাবলাম দেখি না কি আছে এর মধ্যে। গুরু খুঁজতে লাগলাম।
খুঁজলে কি হবে, ও পথের পথিকের দর্শন পাওয়া অত্যন্ত দুর্লভ।
এই সময়ে বহু স্থান ঘুরে বেড়িয়ে আমার দুটি মল্যবান অভিজ্ঞতা হল। প্রথম, ধুনি-জ্বালানো সাধুদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বই জন ব্যবসাদার, ধর্ম জিনিসটা এদের কাছে একটা বেচাকেনার বস্তু, ক্রেতাকে ঠকাবার বিপুল কৌশল ও আয়োজন এদের আয়ত্তাধীনে। দ্বিতীয়, সাধারণ মানুষ অত্যন্ত বোকা, এদের ঠকানো খুব সহজ, বিশেষত ধর্মের ব্যাপারে।
যাক ওসব কথা। আমি ধুনি-জ্বালানো ব্যবসাদার সাধু অনেক দেখলাম ইনসিওরেন্সের দালাল দেখলুম, দৈবী ঔষধের মাদলি বিক্রেতাকে দেখলুম, সাধুবেশী ভিক্ষুক দেখলুম–সত্যিকার সাধু একটাও দেখলাম না।
এ অবস্থায় বরাকর নদীর ধারে শালবনের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র গ্রামের সীমায় এক মন্দিরে একদিন আশ্রয় নিয়েছি, শীতকাল, আমি বনের ডালপালা কুড়িয়ে আগন করবার যোগাড় করতে যাচ্ছি, এমন সময়ে একজন শ্যামবর্ণ, ঋজ, ও দীর্ঘাকৃতি প্রৌঢ় সাধ দেখি একটা পুটলি বগলে মন্দিরে ঢুকছেন। আমি গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলুম।
সাধুটি বেশ মিষ্টভাষী, বললেন—তুই যে দেখছি বড় ভক্ত! কি চাস এখানে? বাড়ি ছেড়ে দেখছি রাগ করে বেরিয়েছিস।
আমি বিনীত প্রতিবাদের সুরে বলতে গেলম—রাগ নয় বাবাজী, বৈরাগ্য–
সাধুজী হেসে বললেন, যে কথাটি পাগলীও বলেছিল—ওহে ছোকরা, সাধু হব বললেই হওয়া যায় না। তোর মধ্যে ভোগের বাসনা এখনও পুরো মাত্রায় রয়েছে। সংসারধর্ম কর, গে যা।
মন্দির থেকে একটু দুরে ছাতিম গাছের তলায় সাধুর পঞ্চমুণ্ডির আসন—পাঁচটি নরমুণ্ড পেতে তৈরী। সাধু রাত্রে সেখানে নির্জনে সাধনা করেন তাও দেখলুম। মনে ভারী শ্রদ্ধা হ’ল, সংকল্প করলুম এ মহাপুরুষকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছিনে এবার।
কিছুদিন লেগে রইলাম তাঁর পিছনে। তাঁর হোমের কাঠ ভেঙ্গে এনে দিই, তিন মাইল দুরের কুসুমবনী বলে গ্রাম থেকে তাঁর চাল–ডাল কিনে আনি। গ্রামের সকল লোকের মুখে শুনলুম সাধটি বড় একজন তান্ত্রিক। অনেক অত ক্রিয়াকলাপ তাঁর আছে। তবে পাগলীর কাছে যেতে লোকে যেমন আমায় ভয় দেখিয়েছিল—এখানেও তেমনি ভয় দেখালে। বললে—তান্ত্রিক সাধু-সন্নিসিদের বিশ্বাস করো না বেশী। ওরা সব পারে, একট, সাবধান হয়ে চলো। বিপদে পড়ে যাবে।
শীঘ্রই ওদের কথার সত্যতা একদিন বুঝলুম।
গভীর রাত্রিতে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। সেদিন শুক্লপক্ষের রাত্রি, বেশ ফটফটে জ্যোৎস্না। মন্দির থেকে ছাতিম গাছের দিকে চেয়ে দেখি সাধু বাবাজী কার সঙ্গে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে কথা বলছেন। কৌতূহল হল—এত রাত্রে কে এল এই নির্জন নদীতীরের জঙ্গলের মধ্যে?
কৌতূহল সামলাতে না পেরে এগিয়ে গেলাম। অল্প দরে গিয়েই যা দেখলুম তাতে আর এগিয়ে যেতে সকোচ বোধ হ’ল এবং সঙ্গে সঙ্গে রীতিমত আশ্চর্য হয়ে গেলম।
সাধু বাবাজী এত রাত্রে একজন মেয়েমানুষের সঙ্গে কথা বলছেন—গাছের আড়াল কে মেয়েমানুষটিকে আমি খানিকটা স্পষ্ট খানিকটা অস্পষ্টভাবে দেখে আমার মনে হ’ল মেয়েটি যুবতী এবং পরমা সুন্দরী।
এত রাত্রে গুরুদেব কোন মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন, সে মেয়েটি এলই বা কেমন করে একা এই নির্জন জায়গায়?
যাই হোক আর বেশীদর অগ্রসর হ’লেই ওরা আমায় টের পাবে। মনে কেমন ভয়ও হ’ল, সে দিন চলে এলাম। তার পরদিন রাত্রে আমি ঘুমুলাম না। গভীর রাত্রে উঠে পা টিপে টিপে বাইরে গিয়ে গাছের আড়াল থেকে উঁকি মেরে দেখি কাল রাতের সে-মানুষটি আজও এসেছে। ভোর হবার কিছু আগে পর্যন্ত আমি সেদিন গা ছর আড়ালে রইলাম দাঁড়িয়ে। ফরসা হবার লক্ষণ হচ্ছে দেখে আর সাহস হল না—মন্দিরে গিয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন রাত্রেও আবার অবিকল তাই।
একদিন আর একটি জিনিস লক্ষ্য করলাম। যে-মেয়েমানুষটির সঙ্গে কথা হচ্ছে আর পরণের বস্ত্রাদি বড় অদ্ভুত ধরণের। সে যে কোন দেশের বস্ত্র পরেছে, সেটা না শাড়ি, না ঘাঘরা, না জাপানী কিমোনো, না মেয়েদের গাউন!—অজানা যদিও, ভারী চমৎকার মানিয়েছেও বটে।
সেদিন আরও একটা কথা আমার মনে হ’ল।
মেয়েমানুষটি যেই হোক, সে জানে আমি রোজ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে থাকি। কি করে আমার একথা মনে হ’ল তা আমি বলতে পারব না, কিন্তু এই কথা আবছা ভাবে আমার মনের মধ্যে উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে কেমন একট, ভয়ও হ’ল।
সরে পড়ি বাবা, দরকার কি আমার এ সবের মধ্যে থেকে?
কিন্তু পরদিন রাত্রে এক সময়ে আর শুয়ে থাকতে পারলাম না নিশ্চিন্ত মনেউঠে যেতেই হ’ল। সেদিন আর একটি জিনিস লক্ষ্য করলাম মেয়েমানুষটি যখন থাকে, তখন এক ধরণের খুব মদ, সুগন্ধ যেন বাতাসে পাওয়া যায়—এ কদিনও এই গন্ধটা পেয়েছি, কিন্তু ভেবেছিলাম কোনও বন্য ফলের গন্ধ হয়তো। আজ বেশ মনে হ’ল এ গন্ধের সঙ্গে ওই মেয়েটির উপস্থিতির একটা সম্বন্ধ বর্তমান।
