কাঁদছেন নাকি আবার তিনি?…হুঁ, তাই তো, কোটের গলার কাছটায় ভিজে!, না, কাঁদবার কী আছে? বুড়ো বয়সে চোখ পানসে হয়ে যায়। কাঁদবেন কেন তিনি?
—গাঙ্গুলীবাবু, ঘুমোলেন? অমনভাবে শুয়ে কেন? শরীর খারাপ হয়নি তো?
পঞ্চানন চক্রবর্তী। চলন্ত গাড়ির দরজা খুলে ঢুকল। সাঁইথিয়া থেকে এইমাত্র ট্রেন ছেড়েছে।
কেশব যেন চমকে উঠলেন। বললেন—না তো!
—একটু চা খেয়ে নিন আগের স্টেশনে।
—এত রাত্রে চা? পাগল হয়েছ ভায়া? আমি চা খাইনে এত রাত্তিরে। তুমি খাও। ঘুমুবে না?
—আরও গোটাকতক স্টেশন পার হয়ে যাক। এখন না। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।
পঞ্চানন চক্রবর্তী ত্রু চলে গেল। গাড়ি ঝড়ের বেগে চলেছে। বাইরে একপশলা বৃষ্টি হচ্ছে বেশ জোরে। ঠাণ্ডা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টির ছাট আসছে জানলা দিয়ে কামরার মধ্যে। কী একটা ফুলের সুগন্ধ এল একঝলক।
আঃ, কী সুন্দর আরাম!… ঘুমিয়ে আরাম আছে এমন জায়গায়। বুকের মধ্যে কেমন করছে কেন, কে জানে? নির্জন গাড়ি। তিনপাহাড়ে কত রাত্রে গাড়ি পোঁছুবে? বিয়ের দু-তিন বছর পরে তিনপাহাড়ে ছিলেন তিনি মুক্তকে নিয়ে, সান্টুকে নিয়ে। সেই সময়ের কথা কখনো ভুলবেন না তিনি।
ব্যাণ্ডেল আর তিনপাহাড়। জীবনে এই দুই স্বর্গ। দুটি স্বর্গের দুটি অমর কাহিনি তাঁর বুকে লেখা রয়েছে। পঞ্চানন ঘুমিয়ে পড়লে তিনপাহাড়ে তিনি নেমে পড়বেন।
তিনপাহাড়ে এই বর্ষাকাল কাটে সেবার। একটা কী পাহাড়ের ওপর কী ঠাকুর ছিলেন। মুক্ত ও তিনি দেখতে গিয়েছিলেন। মুক্ত বললে—খাবে কি? পাহাড়ের নীচে চড়ইভাতি করব?
রান্না করতে করতে বৃষ্টি এল। একটা পাকুড়গাছের তলায় রান্না হচ্ছিল। স্টেশনমাস্টার ছিলেন শশিপদ সামন্ত, মেদিনীপুরে বাড়ি।
তাঁর দুই ছেলে ননী ও হাবু ছিল সঙ্গে।
হাবু কাঠ ভেঙে নিয়ে এল পাহাড়ের ওপর থেকে। মুক্ত খিচুড়ি রাঁধতে গিয়ে ধরিয়ে ফেললে। তাই নিয়ে কী হাসাহাসি!
পাকুড়গাছের গুড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে মুক্ত চোখ পাকিয়ে বললে,–তুমি খাবে না?
—কে বলেছে?
—ননী হাবু বলেছে।
—বাজে কথা।
চমৎকার চড়ুইভাতি।
—খেয়ে বলতে পারবে না যে, খিচুড়ি এঁটে গিয়েছে।
—না গো, বলব না। দিয়েই দ্যাখো।
মুক্ত হি হি করে হেসে উঠে বললে–ও পেটুকের পাল্লায় পড়লে খিচুড়ির হাঁড়িই কাবার হবে, তা বুঝতে পারছি—বসো। বসে যাও। ভালো সরের ঘি এনেছি, খিচুড়ি দিয়ে খাবে বলে। কিন্তু সত্যি, ধরে গেল বলে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছে।
—পাগল! দিয়েই দ্যাখো না। মন খারাপ করতে হবে সেজন্যে নয়, আও বেশি করে রাঁধ-নি কেন সেইজন্যে।
—বেশ, খাও না। আবার না-হয় চড়িয়ে দেব।
মনে আছে সেই পাহাড়ের ওধারে কোথায় ছিল কদমফুলের গাছ। ননী প্রথমে নিয়ে এল এক গুচ্ছ।
মুক্ত বললে—বাঃ, চমৎকার! খোঁপায় গুঁজব।
তারপর চুপি চুপি বললে—কিন্তু সে ফুল তোমায় নিজের হাতে তুলে এনে দিতে হবে।
—ঠিক এনে দেব। খাওয়া হয়ে যাক। যাবার সময়ে নিয়ে আসব—
পঞ্চাশ বছরের পর থেকে সেই প্রথম যৌবনের ফুটন্ত কদমফুলের সুবাস আজকার এই বর্ষা-সজল বাতাসে বৃষ্টির ছাটের সঙ্গে যেন ভেসে আসে।
সে বর্ষাদিনের সুন্দর অপরাহুটি, পাহাড়ের নীচের সেই পাকুড়গাছটি আজ স্বপ্ন হয়ে গিয়েছে। সে মুক্তকেশীও…
কখন যেন মুক্ত এসে ওর শিয়রে দাঁড়াল। সপ্তদশী তরুণী সুন্দরী মুক্তকেশী। হাসিতে মুক্তোর মতো দাঁতগুলি ঝকঝক করছে যেন। স্নেহভরে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বললে—তুমি কদমফুল এনে দেবে তো? তুমি এনে দিলে আমি খোঁপায় পরব—ভুলো না যেন, ভুলো না।
তারপর আবার চোখ নীচু করে বলছে—রোজ একখানা করে চিঠি দিতে হবে কিন্তু। আমি থাকতে পারব না—সত্যি, বলো আমাকে ছুঁয়ে দেবে তো?
পরক্ষণেই বিরলদন্তী পক্ককেশী বৃদ্ধা মুক্তকেশী হাঁটুর ওপর গামছা পরে তাঁকে ঝাঁটা উঁচিয়ে মারমুখী হয়ে বলছে—বেরো, বেরো, আপদ দূর হও বাড়ি থেকে। মলেই বাঁচি-মরণ হবে কবে তোমার? যম নেয় না কেন?
ঘুমের মধ্যেও চমকে উঠলেন কেশব। মস্ত একটা ঝাঁকুনি লাগল গাড়ি টায়।
অনেক রাতে তিনপাহাড় স্টেশনে এসে গাড়ি দাঁড়ালে তিনি নেমে পড়লেন। দৌড়ে ছুটে গেলেন প্ল্যাটফর্মের পশ্চিম প্রান্তের সেই বুড়ো ঘোড়ানিমগাছটার দিকে। আধো-অন্ধকারে গাছের তলায় খুঁজে দেখলেন।
—সান্টু—বাবা সান্টু!
আজ কোথায় গেল খোকা?
পঞ্চাশ বছর আগে সে এই ঘোড়ানিমগাছটার তলায় যে খেলা করত!
যেন শান্তি পেলেন কেশব গাঙ্গুলী যৌবনের হারানো দিনগুলোর মধ্যে আবার ফিরে এসে, তিনপাহাড়ের নির্জন প্রান্তরে, প্ল্যাটফর্মে, অন্ধকার আকাশের তলায় এসে। তিনি আবার ছাব্বিশ বছরের যুবক কেশব গাঙ্গুলী, এই ইস্টিশনের তার-বাবু —বুকে কত আশা, কত বল, কত উৎসাহ, চোখে কত স্বপ্ন! তাঁর খোকা সন্টু আছে কাছে, তার তরুণী মা মুক্তকেশী আছে।
সব তিনি ফিরে পেয়েছেন।
—সান্টু, আয় আমার কোলে আয়। রামদেও এখন তোকে বাসায় নিয়ে যাবে। খেলা করে বেড়া প্ল্যাটফর্মে।
প্ল্যাটফর্মের ঘোড়ানিমগাছটার তলায় দু-দিন কেশব গাঙ্গুলী শুয়ে রইলেন।
নির্জন স্টেশন, বিশেষ কেউ লক্ষ করত না। সত্যি, কি অপূর্ব আনন্দে কাটল এই দুটো দিন। সব ফিরে পেয়েছিলেন আবার।
পঞ্চাশ বছর আগেকার হারানো সব দিনগুলি।
তিনপাহাড়ের বিহারি স্টেশনমাস্টার একদিন কুলিদের কাছে খবর পেলেন, কে এক বুড়ো বাঙালিবাবু জ্বরে বেহুশ অবস্থায় নিমগাছটার তলায় শুয়ে আছে। কোনো পরিচয় পাওয়া গেল না তখন রোগীর কাছে। আরও দু-দিন পরে স্টেশনের মুসাফিরখানায় লোকটি মারা গেল জ্বরের তাড়নায় এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে।
