মুক্তকেশীর সঙ্গে তখন সবে বিয়ে হয়েছে। ঘোড়ানিমগাছের তলাকার সেই বাসায় মুক্তকেশী ঠিক সন্ধ্যা সাতটার সময় জানলার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকত। তিনি ফিরবেন, তাঁকে দেখবে বলে।
ষোড়শী বালিকা মুক্তকেশী। কী হাসি ছিল মুখের! চোখ হাসত তাঁকে দূরে পথের উপর দেখতে পেয়ে।
আছে সেই বাড়িটা আজও? তাঁদের দুজনের অতীত যৌবনের সুখের প্রহরগুলিতে সাক্ষী সেই বাড়িটা।
একদিন বললেন—আচ্ছা মুক্ত, তুমি দাঁড়িয়ে থাকো কেন জানলায়? মুক্ত বলেছিল—তুমি আসো, তাই।
-কেন?
—পথের ওপর দেখতে পেয়ে খুশি লাগে। কতক্ষণ দেখিনে।
—মন কেমন করে?
—তা করে না? একদিন মনে আছে, তাঁকে জানলা থেকে বললে—আজ কী করেছি বলো তো তোমারঃজন্যে?
—কী গো?
—ডালপুরি।
—সত্যি?
—হ্যাঁ, এসে দ্যাখো।
তারপর তিনি বাড়িতে ঢুকলে তাঁকে পাখার বাতাস দিয়ে সুস্থ করে মুক্ত পিঁড়ি পেতে বসিয়ে ১৬/১৭ খানা গরম ডালপুরি খাইয়েছিল কত যত্ন করে।
আর সেই মুক্তকেশী আজ পঞ্চাশ বছর পরে তাঁকে ‘দূর দূর’ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। আজ যখন মুক্তকেশীর সেবা সবচেয়ে তাঁর দরকার হয়েছে, তখন!
চোখ দিয়ে জল বেয়ে পড়ল হু হু করে কেশব গাঙ্গুলীর। কেমন যেন মনে হল সব শূন্য। ওই আকাশের নিরালা মেঘগুলির মতোই তাঁর মন শূন্য, জীবন শূন্য, নিরালা, নিরবলম্বন। পৃথিবীতে কেউ তাঁর কোথাও নেই—পঞ্চাশ বছর আগের সেই ষোড়শী রূপসী মুক্তকেশীকে আজ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কোন অজানা দিগন্তে সে মিলিয়ে গিয়েছে বহুকাল আগে!
জীবনটা কেন এত বড়ো ফাঁকি, এত বড়ো মিথ্যে, এত বড়ো জুয়োচুরি?
—আরে গাঙ্গুলীবাবু যে! কোথায় ছিলেন এতদিন?
কেশব চমকে পিছন ফিরে চেয়ে দেখলেন। একজন মধ্যবয়স্ক টিকিটচেকার, ত্রু–দলের মোড়ল। ওর নামটা তিনি জানতেন, এইমাত্র তিনি হঠাৎ ভুলে গেলেন। বুড়ো হয়েছেন, মুখ দেখে এখন আর ভালো বলতে পারেন না।
—বাড়ি ছিলাম ভাই।
–তারপর এখানে কী মনে করে? বউদির সঙ্গে ঝগড়া করে নাকি?
কেশবের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন—হ্যাঁ ভাই—সে-সব –তাই বটে।
—চলুন, সাহেবগঞ্জ পর্যন্ত বেড়িয়ে আসা যাক। চেক করতে বেরিয়েছি। চলুন আমার সঙ্গে। সেকেন্ড ক্লাসে তুলে দিচ্ছি। আসুন—
–খাব কোথায়?
—আপনি খাননি এখনো? বর্ধমানে খাওয়াব চলুন! জিনিসপত্র কিছু আছে?
—কিছু না।
—তবে চলুন। এক্সপ্রেস এসে পড়ল। বর্ধমানের ক্রু দের ঘর থেকে সঙ্গী লোকটির জন্যে ভাত-তরকারি এল। রাত তখন সাড়ে সাতটা। দুজনে ভাগ করে খেলেন।
সঙ্গী ব্রাহ্মণ, নাম পঞ্চানন বাঁড়য্যে, বাড়ি জয়নগর মজিলপুর। পেটভরে ভাত খেয়ে কেশব গাঙ্গুলীর যেন ধড়ে প্রাণ এল। উঃ, সোজা খিদেটা পেয়েছিল?
কী সুন্দর বর্ষা-সজল বাতাস দু-দিকের মাঠে-বনে বইছে! কুরচি ফুলের সুবাস মাঝে মাঝে আসে বাতাসে। এইসব বন, এই অন্ধকার আকাশ, নক্ষত্রের দল কেমন যেন তাঁকে বহুদূরের সঙ্গীহীন একক জীবনের বাণী এনে দিচ্ছে! নিঃসঙ্গ জীবনে কতদূরে কোথায় যেন যাচ্ছেন তিনি। আর বাড়ি ফিরবেন না। আর মুক্তকেশীর হাতে হাটের থলে তুলে দেবেন না। তাঁর সংসার করা ফুরিয়ে গিয়েছে। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে নিরুদ্দেশের দিকে যাত্রা শুরু করলেন আজ তিনি।
সেকেন্ড ক্লাস গাড়ি তে তিনি একা। বেশ লাগছে অনেক দিন পরে। গত এক বছর শুধু মাথায় মোট করে হাট ঘুরেছেন, বাজার করেছেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রেশনের আটা, চিনি, কেরোসিন তেল এনেছেন—যাদের জন্যে, তারা আজ এই তিয়াত্তর বছর বয়সে তাঁকে পারলে ঘরের বার করে দিতে! পয়সার তাঁর দরকার নেই। পয়সা সব মুক্তকেশীর হাতে থাকুক। তাঁর পয়সাকেই ওদের দরকার, তাঁকে নয় তো! বেশ, পয়সাই রইল, চললেন তিনি।
…সাঁইথিয়া।
অনেক রাত হয়েছে। এবার একটু ঘুমুলে হত না। সারাদিন টো টো করে বেড়িয়েছেন ব্যাণ্ডেলে। এই সাঁইথিয়াতে একবার তিনি রিলিফে এসেছিলেন মনে আছে, বহুকাল আগে। তখন মুক্ত বলে দিয়েছিল, রোজ একখানা করে চিঠি দিয়ো। আটখানা পোস্টকার্ড সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল কথাটা।
সাঁইথিয়াতে তখন বিধুভূষণ রায় ছিলেন স্টেশনমাস্টার। তাঁর বাড়িতেই খাওয়া দাওয়া হত। বিধুবাবুর ছেলে সদানন্দ তাঁর চেয়ে কিছু ছোটো, সদানন্দ ও তিনি একসঙ্গে তাস খেলতেন কাছাকাছি একজন ভদ্রলোকের বাইরের ঘরে বসে।
একবার একটা পাকা কাঁঠাল বিধুবাবু নামিয়ে নিলেন গার্ডের গাড়ি থেকে। কাঁঠালটা আধপচা। সদানন্দ বললে—দাদা, মা বলেছেন, ক্ষীর-কাঁঠাল খাবেন ওবেলা।
কেশব বললেন,—দূর! ওর বিচি ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না—
—আমি বলছি পাওয়া যাবে।
—কখখনো না।
—বাজি?
—কি, বলো?
-বউদিদিকে তিনদিন চিঠি দিতে পারবেন না দাদা। অত কি টেবিলে বসে লেখেন? খুদে খুদে লেখাতে একখানা পোস্টকার্ডে একখানা খামের কাজ করে নেন। ফেলবেন বাজি?
রাজি হননি কেশব। মুক্তকে চিঠি না-দিয়ে থাকা? অসম্ভব। সে একা সেই ব্যাণ্ডেলের সেই ছোট্ট বাসাতে বসে তাঁর জন্যে দিন গুনছে, রোজ ঘোড়ানিমগাছটার তলায় পিয়োনের আবির্ভাবের অপেক্ষায় বসে থাকে খাওয়া দাওয়ার পর জানলাটিতে। তাকে তিনদিন চিঠি না-দিয়ে বঞ্চিত করতে পারবেন না। তা কখনই হয় না।
সে-সব দিন কী খুব দূরে চলে গিয়েছে? বড্ড পেছনে ফেলে এসেছেন কি? স্বপ্নের মতো মনে হল—আবছায়া আবছায়া, সব মিলে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মুক্তকেশী…সান্ট…ব্যাণ্ডেল… তিনপাহাড়। প্রথম যৌবন…তিয়াত্তর বছরের বার্ধক্য! স্বপ্ন।
