খোকন বললে—ঠাকুরদাদা, তুমি ওপরে যাও—মা বলছে।
ভবতারণ সাহস পেয়ে বললে—আমি তাড়িয়ে দেবার কথা আগে মুখে এনিছি না আপনার গুণধর বউমা? জিজ্ঞেস করুন তো কে আগে কাকে বেরিয়ে যাবার কথা বলেছে? হ্যাঁ খোকা, বল তো? আপনার বউমাই বললে না আমাকে বেরিয়ে যেতে? কেন, ওর বাবার বাড়ি?
—হ্যাঁ, ওর বাবার বাড়ি। আলবত ওর বাবার বাড়ি। হারামজাদা, ফের যদি তুমি ওসব কথা মুখে এনেছ তবে তোমাকে আমি–
উপেন ভটচাজ ওপরে উঠে চলে গেলেন। ভবতারণ চুপ করে বসে রইল তক্তপোশের এক কোণে।
খানিকক্ষণ সবাই চুপচাপ। হঠাৎ ভবতারণ উঠে জামার পকেট হাতড়ে একখানা দু-টাকার নোট বার করে স্ত্রীর দিকে ছুড়ে দিয়ে বললে, এই দিলাম—ধার দেনা শোধ দিও। আমি এক্ষুনি চললাম। দেশলাই কে নিল আমার?
তারা বললে—খোকন, দেশলাইটা ওই রয়েছে, দে তো।
একটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে ভবতারণ জামা গায়ে দিতে দিতে বললে, এসেছিলাম অনেক আশা করে। তা এ বাড়িতে আমি থাকব না। এখানে আমার পোেষাবে না বুঝলাম। কেউ যখন আমাকে দেখতে পারে না এ বাড়িতে খাওয়া হল না, শরীরটাও খারাপ। তা হোক, যাবই।আর আসছিনে। দেখ থোকন, যাবি কলকাতায়? চল আমার সঙ্গে, মোটর কিনে দেব, লবেঞ্চস কিনে দেব–
করুণা নিরুত্তর।
—যাবি?
–না।
এসো আমার সোনা, আমার মানিক, চলো আমার সঙ্গে এই সময় তারা এগিয়ে এসে স্বামীর হাত ধরে বললে, কেন পাগলামি করছ? বোসো, এখনও অন্ধকার রয়েছে—এখন কোথায় যাবে? ছিঃ–
—ছাড়ো হাত—
ঝটকা মেরে ভবতারণ হাত ছাড়িয়ে নিলে।
—তোমার মতো ইতরের সঙ্গে আমি কথা বলিনি। আমি খোকনের সঙ্গে কথা বলছি।
–রাগ করে না—ছিঃ—
—ফের আবার? এইবার কিন্তু ভালো হবে না বলছি। খবরদার, আমার গা ছুঁয়ো না!
–আচ্ছা ছোঁব না। বসো ওখানে।
—ফের কথা বলে! খোকন, ও খোকন—যাবি আমার সঙ্গে? আয়—আর কখনো যদি এ ভিটেতে পদার্পণ করি তবে আমার–
করুণা মায়ের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে আছে। তার কোনও সাড়া পাওয়া গেল না—
সকালবেলা। বেশ রোদ উঠেছে।
তারা স্বামীকে দু-খানা পেঁপের টুকরো হাতে দিয়ে বললে, খাও। পেট ঠাণ্ডা হবে।
ভবতারণ এই ঘুমিয়ে উঠেছে। চোখ ভারি-ভারি। পেঁপের রেকাবি হাতে নিয়ে বললে, উনি কোথায়?
—ওপরে।
–যাবেন না?
—তা কী জানি।
—খাবেন?
—উনি কবে খান? কাল সন্ধের সময় এলেন, বললাম ভাত বেঁধে দিই। উনি বললেন, না।
—পেঁপে আর আছে? দিয়ে এসো না ওপরে।
—সে তুমি বললে তবে দেব? সে দিয়ে এসেছি, তুমি তখন ঘুমিয়ে।
—দিও। বুড়ো মানুষ।
—সে তোমাকে শেখাতে হবে না।
—খোকন—ও খোকন—শোন—
-ও খেয়েছে, ওকে ডাকছ কেন? তুমি খেয়ে ফেল। তোমার পেট ঠাণ্ডা হবে পেঁপে খেলে। এখন কেমন মনে হচ্ছে?
—এখনও গোলযোগ যায়নি। ভাতে জল দিয়ে নুন নেবু দিয়ে তাই খাব। তেল দ্যাও, নেয়ে আসি।
করুণা বাপের কাছে এসে বললে, কী বাবা?
—এই নে, খা—
তারা বললে, আহা, কেন আবার—তুমি খাও—
এই সময় উপেন ভটচাজ খড়ম পায়ে দিয়ে উপর থেকে নেমে এলেন। ঘরে উঁকি দিয়ে বললেন—কে? ভবতারণ? ভালো পেঁপে, খা। ইয়ে বউমা, আমি আসি—ওখানেই খাব। ভবতারণ আজ আছিস তো?
ভবতারণ দাঁড়িয়ে উঠে বললে, না বাবা, ওবেলা চলে যাব। আপনি আসবেন না ওবেলা?
—আচ্ছা, তুই যাবার আগে আমি ফিরে আসব। আমি—
এই সময় তারা ফিস ফিস স্বরে কী বললে স্বামীকে। ভবতারণ ডেকে বললে, বাবা
—কী?
—এবেলা এখানে দুটো খাবেন, আপনার বউমা বলছে। কই মাছ আনতে যাচ্ছি বাঁধালে। একসঙ্গে বসে অনেকদিন খাইনি—কেমন?
উপেন ভটচাজ সম্মতি জ্ঞাপন করে রোয়াক থেকে উঠোনে পা দিলেন। কী ভেবে এসে আবার বসলেন রোয়াকে।
পুত্রবধূ বললে—তামাক সেজে দেব?
—দেও দিকি।
ছেলে ভবতারণ নিজেই তামাক সেজে নিয়ে এল। বৃদ্ধ উপেন ভটচাজ চোখ বুজে হুঁকোয় টান দিতে দিতে চিন্তা করতে লাগলেন, এমন সকালবেলা কতকাল আসেনি তাঁর জীবনে। স্ত্রী মারা গিয়েছে আজ বোধ হয় বিশ বছর, ভবতারণ তখন এগারো বছরের বালক। তার পর থেকেই ছন্নছাড়া সংসারজীবন চলছে, আঁটসাঁট নেই কোনো বিষয়ে কারও। তার ওপরে দারিদ্র্য তো আছেই। হাতে পয়সা ছিল না বলেই ভবতারণকে লেখাপড়া শেখাতে পারেননি। লেখাপড়া শেখালে অত খারাপ হত না সে। অবহেলিত পুত্রের প্রতি উপেন ভটচাজের মায়া হল। কাল অত বকুনি দেওয়াটা উচিত হয়নি।
ভবতারণ বাড়ি ফিরে এল আটটার সময়। স্ত্রীকে বললে—দেখো, কারে বলে যশুরে কই! আধ পোয়র নামও নেই, ওপরে এক পোয়া, পাঁচ ছটাক। বাবাকে দেখাও।
পুত্রবধূ বললে—এই দেখুন–
—বাঃ বাঃ—কত করে সের নিলে?
—সাড়ে তিন টাকা।
—তা হবে। যুদ্ধের সময় ছিল ভালো। এ দিন দিন যা হয়ে উঠল—
অনেক দিন পরে পুত্র ও পুত্রবধূর সেবাযত্ন জুটল উপেন ভটচাজের ভাগ্যে। এমন একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া কতকাল হয়নি। তিনি পড়ে থাকেন মজুমদারদের ঠাকুরবাড়িতে পেটের দায়েই তো। ছেলে উপযুক্ত হয়নি, নিজেরই ছেলেটাকে সে খেতে দিতে পারে না। ওদের ভার লাঘব করবার জন্যেই তিনি পরের বাড়ি খান।
খাওয়া-দাওয়ার পর উপেন ভটচাজ দিবানিদ্রা দেবার জন্যে ওপরের ঘরে চলে গেলেন। পুত্রবধূ তামাক সেজে দিয়ে গেল। আঃ, কী আরাম। সব আছে তাঁর, অথচ নেই কিছুই।
আজ দিনটা একটা চমৎকার দিন, এমন দিন আবার কবে আসবে!
বারোমেসে সজনেগাছে ফুল ফুটেছে। ডালপাতা নড়ছে বর্ষার সজল বাতাসে! ঘুমিয়ে পড়লেন উপেন ভটচাজ। উপেন ভটচাজের পুত্রবধূও আপন মনে আজ খুব খুশি। ছন্নছাড়া ভাঙা বৃহৎ বাড়ি আজ যেন কার পাদস্পর্শে লক্ষ্মীর সংসারে পরিণত হয়েছে। দোতলায় শ্বশুরকে তামাক সেজে দিতে যাওয়ার সময় এই কথাই তার মনে হচ্ছিল। তার আছে সবাই। শ্বশুর, স্বামী, পুত্র—যা চায় মেয়েরা, এত বড়ো বাড়ি, জাজ্বল্যমান সংসার যাকে বলে। ওদের সকলের পাতে পাতে ভাত-মাছ দিয়ে আজ কত সুখ পেয়েছে সে। ওদের খাইয়ে সুখ। ভাবতে ভাবতে সেও ঘুমিয়ে পড়ল।
