তারপর কলকাতায় এলুম। তখন নতুন মতের অভিনয় সবে কলকাতায় শুরু হয়েছে। বড়ো বড়ো বহু বিখ্যাত নটদের অভিনয় দেখবার সুযোগ জীবনে এই প্রথম ঘটল, তাদের নানা পালাতে নানা অভিনয় দেখলুম—বিলিতি ফিলমে বিশ্ববিখ্যাত নটদের অভিনয় অনেকদিন ধরে দেখলুম—মানুষ ক্রমে ক্রমে বিজ্ঞ হয়, উকিল মোক্তারদের প্রধান অভিনেতা গুরুদাস ঘোষ—যাকে এতকাল মনে মনে কত বড়ো বলে ভেবে এসেছি—এখন তার কথা ভাবলে আমার হাসি পায়।
আরও কয়েক বছর কেটে গেল। কলেজ থেকে বেরিয়ে চাকুরি করি। কলকাতার থিয়েটারের অভিনেতারাও তখন আমার কাছে পুরোনো ও একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে—থিয়েটার দেখাই দিয়েছি ছেড়ে। ফিলম সম্বন্ধেও তাই। খুব নামজাদা অভিনেতা না-থাকলে সে-ছবি দেখতে যাইনে—যাঁদের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি একদিন—এখন তাঁদের অনেকের সম্বন্ধেই মত বদলেছি।
এই যখন অবস্থা, তখন কী একটা ছুটিতে বাড়ি গিয়ে শুনি দেশে বারোয়ারি। শুনলুম, কলকাতা থেকে বড় যাত্রার দল আসছে—দেড়শো টাকা এক রাত্রির জন্যে নিয়েছে, এমন দল নাকি এদেশে আর কখনো আসেনি। ভালো বিলিতি ফিলমই দেখিনে, থিয়েটার দেখাই ছেড়ে দিয়েছি ভালো লাগে না বলে—এ অবস্থায় রাত জেগে যাত্রা দেখবার যে বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও মনে জাগবে না—এ কথা বলাই বাহুল্য। যাত্রা আবার কী দেখব! নিতান্ত বাজে জিনিসকে কষ্ট করে এই গরমের মধ্যে লোকের ভিড়ে বসে যাত্রা দেখতে যাবে?
কিন্তু বন্ধুবান্ধবেরা ছাড়লেন না। বারোয়ারির কর্তৃপক্ষেরা বিশেষ বিশেষ অনুরোধ করে গেলেন—আমার যাওয়া চাই-ই। কী করি, ভদ্রতা বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। খানিকটা দেখে না-হয় উঠে এলেই হবে। নিতান্ত না যাওয়াটা ভালো দেখাবে না হয়তো—বিশেষ দেশে যখন তত বেশি যাতায়াত নেই।
সন্ধ্যার সময় যাত্রা বসল। যাত্রা জিনিসটা দেখিনি অনেককাল—দেখে বুঝলুম সেকালের যাত্রা আর নেই। জুড়ির গান, মেডেলধারী বেহালাদারদের দীর্ঘ কসরত—এসব অতীত ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। সলমা-চুমকির কাজ করা সাজ পোশাকও আর নেই—কলকাতার থিয়েটারের হুবহু অনুকরণ যেমন সাজ পোশাকে, তেমনি তরুণ অভিনেতাদের অভিনয়ের ঢঙে। এমনকী কয়েকজন অভিনেতার বলবার ধরন, মুখভঙ্গি ও হাত-পা নাড়ার কায়দা কলকাতার স্টেজের কোনো কোনো নামজাদা বিশিষ্ট অভিনেতার মতো। দেখলুম, আসরের শ্রোতার দলের মধ্যে যারা তরুণ বয়স্ক তাদের কাছে এরা পেলে ঘন ঘন হাততালি। কেউ কেউ বললে—ওঃ, কী চমৎকার নকলই করেছে কলকাতার স্টেজের অমুককে বাস্তবিক দেখবার জিনিস বটে!
এমন সময়ে আসরে ঢুকল একজন মোটা কালো ও বেঁটে লোক। কীসের পার্টে তা আমার মনে নেই। লোকটির বয়স ষাটের উপর হবে, তবে স্বাস্থ্যটা ভালো। কেউ তার বেলা একটা হাততালি দিলে না, যদিও সে দর্শকদের খুশি করার জন্যে অনেক-রকম মুখভঙ্গি করলে, অনেক হাত-পা নাড়লে। আমার সঙ্গে একদল স্কুলের ছেলে বসেছিল, তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল—এ বুড়োটাকে আবার কোথা থেকে জুটিয়েছে? দেখতে যেন একটা পিপে। অ্যাক্টিং করছে দ্যাখো না, ঠিক যেন সং!
পাশের আর একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন—ও এককালে খুব নামজাদা অ্যাক্টর ছিল হে, তখন তোমরা জন্মাওনি! ওর নাম যদু হাজরা।
আমি হঠাৎ ভদ্রলোকের মুখের দিকে চাইলুম, তারপর একবার বৃদ্ধ অভিনেতাটির দিকে চাইলুম। বাল্যদিনের একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল। সেই কনকনে শীতের রাত্রি, সেই শহুরে-ভেঁপো-ছেলেদের সঙ্গ, সেই তারা আমাকে ফেলে কোথায় পালাল—তারপর বাড়ি থেকে অনেক দূরে এক অপরিচিত গঞ্জের বারোয়ারি আসরে ময়রার দোকানে খাবার খেয়ে আমার সেই
একা বিদেশে দু-দিন কাটানো। সে রাত্রে যার অভিনয় দেখে আমার বালক মন মুগ্ধ বিস্মিত উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল—সেই যদু হাজরা এই?
একসময়ে তার যে ধরনের মুখভঙ্গি দেখে ও কথাবার্তার উচ্চারণ শুনে দর্শকেরা আনন্দে উন্মত্ত হয়ে উঠত, আজও যদু হাজরা সেইসব হুবহু করে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে—অথচ দর্শকেরা খুশি নয় কেন? খুশি তো দূরের কথা, তাদের মধ্যে অনেকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করছে কেন, বসে বসে এই কথাটাই ভাবলুম।
মন যেন কেমন বিষণ্ণ হয়ে উঠল। অপর লোকের কথা কী, আমারই তো যদু হাজরার হাবভাব হাস্যকর ঠেকছে! কেন এমন হয়?
বাল্যদিনের সেই যাত্রার আসরে এঁকে আমি দেখেছিলুম, এঁর সেই অভিনয় এখনও স্পষ্ট মনে আছে। বিশ্বাসঘাতক সেনাপতির সঙ্গে রাজার কনিষ্ঠ পত্নী ভ্রষ্টা, রাজা একদিন দু-জনকে নির্জনে প্রেমালাপে নিমগ্ন দেখতে পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কী ভেবে বললেন—’মধুছন্দা, আমি প্রৌঢ়, তুমি তরুণী, এই বয়সে তোমায় বিবাহ করে ভুল করেছি। তোমায় আমি এখনও ভালোবাসি, প্রাণে মারব না—তোমরা দুজনে আমার চোখের সামনে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো হাত-ধরাধরি করে চলে যাও। কিন্তু আমার রাজ্যের বাইরে। আর কখনো তোমাদের মুখ না দেখি।’ ওরা ধরা পড়ে দুজনে ভয়ে ও লজ্জায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে। রাজার সামনে এ কাজ কেমন করে করবে? হাত-ধরাধরি করে কেমন করে যাবে? রাজা তলোয়ার খুলে বললেন—’যাও, নইলে দুজনকেই কেটে ফেলব—ঠিক ওইভাবেই যাও।’
শেষে তারা তাই করতে বাধ্য হল। রাজা স্থিরদৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়েছিলেন।
—তারা যখন কিছুদূর চলে গিয়েছে, তখন তিনি হঠাৎ উদভ্রান্তের মতো মুক্ত তলোয়ার হাতে ‘হা-হা-হা’ রবে একটা চিৎকার করে তাদের দিকে ছুটে গেলেন —সঙ্গে সঙ্গে তারাও আসরের বাইরে চলে গেল। মনে আছে রাজার সেই চমৎকার ভঙ্গিতে, তার হতাশ ‘হা-হা’ রবের মধ্যে এমন একটা ট্র্যাজিক সুর ছিল, আসরসুদ্ধ দর্শককে তা বিচলিত করেছিল। আমি তখন যদিও নিতান্ত বালক, কিন্তু আমার মনে সেই দৃশ্যটি এমন গভীর দাগ দিয়েছিল যে, এই এত বয়সেও তা ভুলিনি।
