যাত্রা বোধ হয় রাত্রে, তখন সবে সন্ধ্যা হয়েছে, বারোয়ারির খুব বড়ো আসর, অনেক ঝাড়লণ্ঠন টাঙিয়েছে—বাঁশের জাফরির গায়ে লাল-নীল কাগজের মালা ও ফুল, আসরের চারিধারে রেলিং দিয়ে ঘেরা, রেলিং-এর মধ্যে বোধ হয় ভদ্রলোকদের বসবার জায়গা—বাইরে বাজে লোকদের।
রাজগঞ্জের বাজারে আমি জীবনে আরও দু-একবার বাবার সঙ্গে এর আগে যে–এসেছি এমন নয়, কিন্তু এখানে না-আমি কাউকে চিনি, না-আমাকে কেউ চেনে। রেলিং-এর ভিতরে জায়গা আমার মতো ছোটো ছেলেকে কেউ দিলে না— আমিও সাহস করে তার মধ্যে ঢুকতে পারলুম না, বাইরে বাজে লোকদের ভিড়ের মধ্যে ঠেসাঠেসি করে ইট পেতে বসতে গেলুম—তাতেও নিস্তার নেই— বারোয়ারির মুরুব্বি পক্ষের লোকেরা এসে আমাদের সে জায়গা থেকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে বিশিষ্ট লোকদের জন্যে বেঞ্চি আনিয়ে পাতিয়ে দেয়,আবার যেখানে গিয়ে বসি, সেখানেও কিছুক্ষণ পরে সেই অবস্থা। অতিকষ্টে আসরের কোণের দিকে দাঁড়াবার জায়গা কোনোমতে খুঁজে নিলুম। অন্যান্য বাজে লোকদের কী কষ্ট! তারা প্রায়ই চাষাভুষো লোক, পাঁচ-ছয় ক্লোশ দূর থেকে পর্যন্ত অনেকে মহা আগ্রহে যাত্রা শুনতে এসেছে—এই শীতে তারা কোথায়ও বসবার জায়গা পায় না, কেউ তাদের বসবার বন্দোবস্ত করে না—স্টেশন মাস্টারবাবু, মালবাবু, কেরানিবাবু ও পোস্টমাস্টারবাবুদের যত্ন করে বসাতে সবাই মহাব্যস্ত।
যাত্রা আরম্ভ হল। নল-দময়ন্তীর পালা। একটু পরেই যদু হাজরা ‘নল’ সেজে আসরে ঢুকতেই—তখন হাততালির রেওয়াজ ছিল না—চারিদিকে হরিধ্বনি উঠল। অত বড়ো আসর মন্ত্রমুগ্ধবৎ স্থির ও নীরব হয়ে গেল।
আমি যদু হাজরার নাম কখনো এর আগে শুনিনি, এই প্রথম শুনলাম। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলুম, শ্যামবর্ণ, সুপুরুষ—বয়স তখন বোঝবার ক্ষমতা হয়নি, ত্রিশও হতে পারে, পঞ্চাশও হতে পারে। কিন্তু কী কথা বলবার ভঙ্গি, কী চোখমুখের ভাব, কী হাত-পা নাড়ার ঢং। আমার এগারো বৎসরের জীবনে আর কখনো অমনটি দেখিনি। ভিড়ের কষ্ট ভুলে গেলুম, কিছু খেয়ে বেরুইনি, খিদেতে পেটের মধ্যে যেন বোলতায় হুল ফোটাচ্ছে—সে-কথা ভুললুম।
যাত্রা থেমে গেলে এত রাত্রে এক অজানা স্থানে শীতে কোথায় যাব—সে-সব কথাও ভুলে গেলুম—পঞ্চ দেবতা পঞ্চ নলরূপে দময়ন্তীর স্বয়ংবর সভায় এসে বসেছেন, আসল ‘নল’-রূপী যদু হাজরা বিস্ময়বিহ্বল দৃষ্টিতে চারিদিক চেয়ে বলছেন—
এ কি হেরি চৌদিকে আমার–
মম সম রূপ নল চতুষ্টয়
মম সম সাজে সাজি বসিয়াছে
সভা মাঝে
বুঝিতে না পারি কিবা মায়াজাল
ইষ্টদেব,
পুরাও বাসনা মোর, মায়া জাল ফেল ছিন্ন করি।
এমন সময়ে বরমালা হস্তে দময়ন্তী সভায় প্রবেশ করতেই নল বলে উঠলেন—
দময়ন্তী, দময়ন্তী, মনে পড়ে হংসী মুখে
আনন্দ-বারতা? এই আমি নল-রাজ
বসি স্তম্ভ পাশে।–
অপর চারজনও সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরে বলে উঠল—
দময়ন্তী, দময়ন্তী, মনে পড়ে হংসী মুখে
আনন্দ-বারতা? এই আমি নল-রাজ
বসি স্তম্ভ পাশে।–
প্রকৃত নলের তখন বিমূঢ় দৃষ্টি!
তারপরে বনে বনে ভ্রাম্যমান রাজ্যহীন সহায়-সম্পদহীন উন্মত্ত নলের সে কী করুণ ও মর্মস্পর্শী চিত্র! কতকাল তো হয়ে গেল, যদু হাজরার সে অপূর্ব অভিনয় আজও ভুলিনি। চোখের জল কতবার গোপনে মুছলুম সারারাত্রির মধ্যে, পাছে আশেপাশের লোক কান্না দেখতে পায়, কতবার হাঁচি আনবার ভঙ্গিতে কাপড় দিয়ে মুখ চেপে রাখলুম। যাত্রা শেষরাত্রে ভাঙল। কিন্তু পরদিনও আবার যাত্রা হবে শুনে আমি বাড়ি গেলুম না। একটা খাবারের দোকানে কিছু খেয়ে সারাদিন কাটিয়ে দিলাম। রাত্রে আবার যাত্রা হল—শিখিধ্বজের পালা। যদু হাজরা সাজল শিখিধ্বজ। এটা নাকি তার বিখ্যাত ভূমিকা, শিখিধ্বজের ভূমিকায় যদু হাজরা আসর মাতিয়ে পাগল করে দিলে। সেই একরাত্রের অভিনয়ের জন্যে চার-পাঁচখানা সোনা ও রুপোর মেডেল পেলে যদু হাজরা। যাত্রা ভাঙল যখন তখন রাত বেশি নেই। আসরে একটা বেঞ্চিতে শুয়ে রাত কাটিয়ে সকালে একা নিজের গ্রামে ফিরে এলুম।
তারপর কয়েক বছর কেটেছে। তখন আমি আরও একটু বড় হয়েছি—স্কুলে ভর্তি হয়েছি। যদু হাজরার কথা প্রায় এর-ওর মুখে শুনি। যেখানেই যাত্রা দলের কথা ওঠে, সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করে যাত্রা দলের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেতা যদু হাজরা।
আমি কিন্তু বহুদিন যদু হাজরাকে আর দেখলুম না।
এর অনেক কারণ ছিল।
আমি দূরে শহরের স্কুল-বোর্ডিং-এ গেলুম।
মন গেল লেখাপড়ার দিকে, ধরাবাঁধা রুটিনের মধ্যে জীবনের মুক্ত গতি বন্ধ হয়ে পড়ল। অ্যালজেব্রার আঁক, জ্যামিতির একস্ট্রা, ইংরেজি ভাষার নেশা, ফুটবল, ডিবেটিং ক্লাব, খবরের কাগজ জীবনের মধ্যে নানা পরিবর্তন এনে দিলে। ছেলেবেলার মতো যেখানে যাত্রার নাম শুনব সেখানেই দৌড়ে যাব—তা কে জানে চার ক্রোশ, কে জানে ছ-ক্রোশ—এমন মন ক্রমে ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। ইচ্ছে হলেও হয়তো স্কুলের ছুটি থাকে না, স্কুলের ছুটি থাকলেও বোর্ডিং-এর সুপারিনটেন্ডেন্ট ছাড়তে চান না—নানা উৎপাত।
পাড়াগাঁয়ের ছেলে ছিলুম, থিয়েটার কাকে বলে জানতুম না। যে শহরে পড়তুম, সেখানে উকিল-মোক্তারদের একটা থিয়েটার ক্লাব ছিল, তাঁরা একবার থিয়েটার করলেন, পালাটা ঠিক মনে নেই—বোধ হয় প্রতাপাদিত্য। ভাষা ও ঘটনার বিন্যাসে থিয়েটারের পালা আমাকে মুগ্ধ করল—ভাবলুম যাত্রা এর চেয়ে ঢের খারাপ জিনিস। প্লটের এমন বাঁধুনি তো যাত্রার পালাতে নেই। তারপর অনেকবার উকিলদের ক্লাব থিয়েটার দেখলুম—ছেলেবেলার মন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে, বাজারে যাত্রা হল বারোয়ারির সময়ে, কলকাতার দল, কিন্তু তাতে আগেকার মতো আনন্দ পেলুম না।
