সুরদাস বললেন—কই দেখি তুমি কেমন শিখেছ?
বাঁশি সব সময়েই প্রদ্যুম্নের কাছে থাকত। কখন কোন সময় সুনন্দার সঙ্গে দেখা হয়ে পড়ে বলা যায় না।
প্রদ্যুম্ন বাঁশি বাজাতে লাগল। তার পিতা তাকে বাল্যকালে যত্ন করে রাগ রাগিণী শেখাতেন, তা ছাড়া সংগীতে প্রদ্যুম্নের একটা স্বাভাবিক ক্ষমতাও ছিল। তার আলাপ অতিমধুর হল। লতাপাতা ফুলফলের মাঝখান বেয়ে উদার নীল আকাশ আর জ্যোৎস্না রাতের মর্ম ফেটে যে-রসধারা বিশ্বে সবসময় ঝরে পড়ছে, তার বাঁশির গানে সে-রস যেন মূর্ত হয়ে উঠল; সুরদাস বোধ হয় এতটা আশা করেননি, তিনি প্রদ্যুম্নকে আলিঙ্গন করে বললেন—ইন্দ্রদ্যুম্নের ছেলে যে এমন হবে, সেটা বেশি কথা নয়। বুঝতে পেরেছি, তুমিই পারবে, এ আমি আগেও জানতাম।
নিজের প্রশংসাবাদে প্রদ্যুম্নের তরুণ সুন্দর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
অন্যান্য দু-এক কথার পর, প্রদ্যুম্ন বিদায় নিতে উদ্যত হলে, সুরদাস তাকে বললেন—শোনো প্রদ্যুম্ন, একটা গোপনীয় কথা তোমার সঙ্গে আছে। তোমাকে এ কথা বলব বলে পূর্বেও আমি তোমার খোঁজ করেছিলাম; তোমাকে পেয়ে খুব ভালোই হয়েছে। কথাটা তোমাকে বলি, কিন্তু তার আগে তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, এ কথা তুমি কারুর কাছে প্রকাশ করবে না।
প্রদ্যুম্ন অত্যন্ত বিস্মিত হল। এই প্রৌঢ়ের সঙ্গে তার মোটে একদিনের আলাপ, এমনকি গোপনীয় কথা ইনি তাকে বলবেন?
সুরদাস বললেন—তুমি ভেব না, কোনো অনিষ্টজনক ব্যাপার হলে আমি তোমাকে বলতাম না।
কি কথা জানবার জন্যে প্রদ্যুম্নের অত্যন্ত কৌতূহলও হল, সে প্রতিজ্ঞা করলে সুরদাসের কথা কারো কাছে প্রকাশ করবে না।
সুরদাস গলার স্বর নামিয়ে বলতে লাগলেন—নদীর ওই বড়ো বাঁকে যে টিবিটা আছে জানো? তার সামনেই বড়ো মাঠ। ওই ঢিবিটায় বহু প্রাচীনকালে সরস্বতী দেবীর মন্দির ছিলঃ; শুনেছি এদেশের যত বড়ো বড়ো গায়ক ছিলেন, শিক্ষা শেষ করে সকলেই আগে ওই মন্দিরে এসে দেবীর পূজা দিয়ে তুষ্ট না-করে ব্যাবসা আরম্ভ করতেন না। সে অনেকদিনের কথা; তার পর মন্দির ভেঙেচুরে ওই দাঁড়িয়েছে। ওই ঢিবিতে বসে আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে মেঘ-মল্লার নিখুঁতভাবে আলাপ করলে সরস্বতী দেবী স্বয়ং গায়কের কাছে আবির্ভূত হন। এ সংবাদ এদেশে কেউ জানে না। আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র এই তিন মাসের তিন পূর্ণিমায় প্রতিবার যদি তাঁকে আনতে পারা যায়, তবে তাঁর বরে গায়ক সংগীতে সিদ্ধ হয়। তাঁর বরে সংগীত সংক্রান্ত কোনো বিষয় তখন গায়কের কাছে অজ্ঞাত থাকে না। তবে একটা কথা আছে, যে গায়ক বর প্রার্থনা করবে সে অবিবাহিত হওয়া চাই। তা আমি বলছিলাম, সামনের পূর্ণিমায় তুমি আর আমি এই বিষয়টা চেষ্টা করে দেখব, তুমি কি বলো?
সুরদাসের কথা শুনে প্রদ্যুম্ন অবাক হয়ে গেল। তা কি করে হয়? আচার্য বসুব্রত কলাবিদ্যা সম্বন্ধে উপদেশ দিতে দিতে অনেক বার যে বলেছেন কলা-অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর যে-মূর্তি হিন্দুরা কল্পনা করেন, সেটা নিছক কল্পনাই, তার সঙ্গে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। সত্য সত্য তাঁকে দেখতে পাওয়া—এ কি সম্ভব?
প্রদ্যুম্ন চুপ করে রইল।
সুরদাস একটু ব্যথভাবে জিজ্ঞাসা করলেন—এতে কী তোমার অমত আছে?
প্রদ্যুম্ন বললে—সে জন্যে না। কিন্তু আমি ভাবছিলাম, এটা কী করে সম্ভব যে–
সুরদাস বললেন—সে বিষয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। এর সত্যতা তুমি নিজের চোখে দেখো। তোমার অমত না-থাকলে আমি সামনের পূর্ণিমায় সব ব্যবস্থা করে রাখি।
সুরদাসের কথার পর থেকেই প্রদ্যুম্ন অত্যন্ত বিস্ময়ে কৌতূহলে কেমন একরকম হয়ে গিয়েছিল। সে ঘাড় নেড়ে বললে—আচ্ছা রাখবেন, আমি আসব।
সুরদাস বললেন—বেশ, বড়ো আনন্দিত হলাম। তুমি মাঝে-মাঝে একবার করে এখানে এসো, তোমাকেও তৈরি হতে হলে দু-একটা কাজ করতে হবে, সে বলে দেব।
প্রদ্যুম্ন আর একবার সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়বার পর সুরদাসের কাছে বিদায় চাইলে।
তারপর সে চিন্তিতভাবে বিহারের পথ ধরল।
তার মনে হচ্ছিল—দেবী সরস্বতী স্বয়ং! শ্বেতপদ্মের মতো নাকি রংটি তাঁর, না জানি কত সুন্দর তাঁর মুখশ্রী! আচার্য বসুব্রত বলেন বটে…
ভদ্রাবতী নদীর ধারে শাল-পিয়াল-তমাল বনে সেবার ঘনঘোর বর্ষা নামল। সারা আকাশ জুড়ে কোনো বিরহিণী পুরসুন্দরীর অযত্নবিন্যস্ত মেঘবরণ চুলের রাশ এলিয়ে দেওয়া, প্রাবৃট-রজনীর ঘনান্ধকার তার প্রিয়হীন প্রাণের নিবিড় নির্জনতা, দূর বনের ঝোড়ো হাওয়ায় তার আকুল দীর্ঘশ্বাস, তারই প্রতীক্ষাশ্রান্ত আঁখি-দুটির অশ্রুভারে ঝরঝর অবিশ্রান্ত বারিবর্ষণ, মেঘমেদুর আকাশের বুকে বিদ্যুৎচমক তার হতাশ প্রাণে ক্ষণিক আশার মেঘদূত!
আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে প্রদ্যুম্ন সুরদাসের সঙ্গে নদীর ঘাটে গেল। তারা যখন সেখানে পৌঁছাল, তখন মেঘ নেমে সমস্ত আকাশ ছেয়ে ফেলেছে, চারিদিক তরল অন্ধকারে অস্পষ্ট দেখাচ্ছে।
প্রদ্যুম্ন সুরদাসের কথামত নদী থেকে স্নান করে এসে বস্ত্র পরিবর্তন করলে। সঙ্গীর ক্রিয়াকলাপে প্রদ্যুম্ন বুঝতে পারলে তিনি একজন তান্ত্রিক। তাদের বিহারে একজন ভিক্ষু ছিলেন, তিনি যোগাচার্য পদ্মসম্ভবের শিষ্য। সেই ভিক্ষুর কাছে তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপের কথা কিছু কিছু সে শুনেছিল। সুরদাস অনেকগুলো রক্তজবার মালা সঙ্গে করে এনেছিলেন, তার মধ্যে কতকগুলো তিনি নিজে পরলেন, কতকগুলো প্রদ্যুম্নকে পরতে বললেন। ছোটো মড়ার মাথার খুলিতে তেল-সলতে দিয়ে প্রদীপ জ্বালালেন। তাঁর পূজার আয়োজনে সাহায্য করতে করতে প্রদ্যুম্ন হাঁপিয়ে পড়ল। ব্যাপারটার শেষপর্যন্ত কী দাঁড়ায় দেখবার জন্যে তার মনে এত কৌতূহল হচ্ছিল যে অন্ধকার রাতে একজন প্রায়-অপরিচিত তান্ত্রিকের সঙ্গে একা থাকবার ভয়ের দিকটা তার একেবারেই চোখে পড়ল না। অনেক রাত্রে হোম শেষ হল।
