সুনন্দাকে দেখে প্রদ্যুম্ন মনে মনে ভারি খুশি হল, মুখে বললে—নাঃ, তা আর দেখব কেন? ভারি ব্যাপারটা হয়েছে গাছতলায় লুকিয়ে! আর না-দেখতে পেলেই বা কি? আমি তোমার ওপর ভারি রাগ করেছি, সুনন্দা, সত্যি বলছি।
সুনন্দা বললে—দোষ করবেন নিজে আবার রাগও করবেন নিজে! সেদিন কি কথা বলেছিলে মনে আছে? তা না, যত রাজ্যের সাপুড়ে আর বাজিকর—মাগো! ওদের কাছে যাও কী করে? এমন ময়লা কাপড় পরে! আমি ওদের ত্রিসীমানায় যাইনে।
প্রদ্যুম্ন বললে—তুমি বড়োমানুষের মেয়ে—তোমার কথাই আলাদা—কিন্তু কথাটা কী ছিল বলছিলে?
সুনন্দা বললে—যাও! আর মিথ্যে ভানে দরকার নেই। কি কথা মনে করে দেখো। সেই সেদিন বললে না?
প্রদ্যুম্ন একটুখানি ভেবে বলে উঠল—বুঝতে পেরেছি—সেই বাঁশী?
সুনন্দা অভিমানের সুরে বললে—ভেবে দেখো বলেছিলে কিনা। আমি দুপুরবেলা থেকে মন্দিরে এসে বসে আছি! একে তো এলেন বেলা করে, তার ওপর—যাও!
প্রদ্যুম্ন এবার হেসে উঠল। বললে—আচ্ছা সুনন্দা, যদি তুমি আমায় দেখতেই পেয়েছিলে তো আমায় ডাকলে না কেন?
সুনন্দা বললে—আমি কি একা ছিলাম? দুপুরবেলায় আমি একা এসেছিলাম বটে, কিন্তু তখন তো আর তুমি আসনি? তারপর আমাদের গাঁয়ের মেয়েরা সব যে এল। কী করে ডাকব?
প্রদ্যুম্ন বললে—আচ্ছা ধরে নিলাম আমার দোষ হয়েছে, তবে তুমি যে বার বার সাপুড়ে আর বাজিকরদের কথা বলছ সুনন্দা—সাপুড়ে আর বাজিকরদের আমি খুঁজিনি। শুনেছিলাম অবন্তী থেকে একজন বড়ো বীণ-বাজিয়ে আসবেন; তুমি তো জানো, আমার অনেক দিন থেকে বীণ শেখবার বড়ো হচ্ছে। তাই তাঁর সন্ধানে ঘুরছিলাম, তাঁর দেখাও পেয়েছি। তিনি এখানকার নদীর ধারের দেউলে থাকেন। ভালো কথা—তোমার বাবা কোথায়?
সুনন্দা বললে—বাবা তিন-চার-দিন হল কৌশাম্বী গিয়েছেন মহারাজের ডাকে। প্রদ্যুম্ন হঠাৎ খুব উচ্চৈস্বরে হেসে উঠল, বললে—ওহহা তাই! নইলে আমি ভাবছি এত রাত পর্যন্ত সুনন্দা কি—
সুনন্দা তাড়াতাড়ি প্রদ্যুম্নের মুখে নিজের হাতদুটি চাপা দিয়ে লজ্জিত মুখে বললে—চুপ চুপ, তোমার কি এতটুকু কাণ্ডজ্ঞান নেই? এখুনি যে সব আরতি দেখে লোক ফিরবে!
প্রদ্যুম্ন হাসি থামিয়ে বললে—এবার কিন্তু তোমার বাবা এলে বলে দেব নিশ্চয়–
সুনন্দা রাগের সুরে বললে—দিও বলে। এমনি আমি মন্দিরে আরতি পর্যন্ত থাকি, তিনি জানেন।
প্রদ্যুম্ন সুনন্দার সুগঠিত পুষ্পপেলব দক্ষিণ বাহুটি নিজের হাতের মধ্যে বেষ্টন করে নিলে, তারপর বললে—আচ্ছা থাক, বলে দেব না। চল সুনন্দা, তোমায় বাঁশি শোনাই, আমারসঙ্গেই আছে—সত্যি বলছি, তোমায় শোনাবার জন্যেই এনেছিলাম। তবে ওঁকে খুঁজছিলাম বীণাটা ভালো করে শিখব বলে।
নদীর ধারে এসে কিন্তু প্রদ্যুম্ন বড়ো নিরুৎসাহ হয়ে পড়ল। সে বাঁশি বাজালে বটে, কিন্তু সে যেন ভাসা-ভাসা। সুরের সঙ্গে তাতে তার প্রাণের কোনো যোগ রইল না। তারা দুজনে নির্জনে আরও কতবার বসেছে, প্রদ্যুম্নের বাঁশি শুনতে সুনন্দা ভালোবাসত বলে প্রদ্যুম্ন যখনই বিহার থেকে বাইরে আসত, বাঁশিটি সঙ্গে আনত। প্রদ্যুম্নের বাঁশির অলস স্বপ্নময় সুরের মধ্যে দিয়ে কতদিন উভয়ের অজ্ঞাতে রোদভরা মধ্যাহ্ন গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে, কিন্তু দুজনে এক হলে প্রদ্যুম্নের এ-রকম নিরুৎসাহ ভাব তো সুনন্দা আর কখনো লক্ষ করেনি।
কি জানি কেন প্রদ্যুম্নের বার বার মনে আসছিল সেই জীর্ণ পরিচ্ছদপরা অদ্ভুতদর্শন গায়ক সুরদাসের কথা। তাদের বিহারের কলাবিং ভিক্ষু বসুব্রতের আঁকা জরার চিত্রের মতোই লোকটা কেমন কুশ্রী লোলচর্ম শীর্ণদর্শন! পুরাতন পুথির ভূর্জপত্রের মতো ওর পরিচ্ছদের কেমন একটা অপ্রীতিকর মেটে লাল রং!
তার পরদিন সকালে প্রদ্যুম্ন নদীর ধারের ভাঙা মন্দিরে গেল। সেটার দেব-মূর্তি বহুদিন অন্তর্হিত। সমস্ত গায়ে বড়ো বড়ো ফাটল, সাপখোপের বাস। নিকটবর্তী গ্রামবাসীরা সেদিকে বড়ো একটা কেউ আসত না। একজন আজীবক সন্ন্যাসী আজ প্রায় সাত-আট মাস হল সেখানে বাস করছেন। তাঁরই দু-চার জন অনুগত ভক্ত মাঝে-মাঝে আসত-যেত বলে মন্দিরের পথ আজকাল অপেক্ষাকৃত ভালো আছে।
অর্ধ-অন্ধকার মন্দিরের মধ্যে প্রদ্যুম্নের সঙ্গে সুরদাসের সাক্ষাৎ হল। সুরদাস প্রদ্যুম্নকে দেখে খুব আনন্দ প্রকাশ করলেন, তারপর বললেন—চলো, বাইরে গিয়ে বসি, এখানে বড়ো অন্ধকার।
বাইরে গিয়ে সুরদাস আলোতে প্রদ্যুম্নের মুখ ভালো করে দেখলেন, তার পর যেন আপন মনে বলতে লাগলেন—হবে, তোমার দ্বারাই হবে! আমি তা জানতাম।
প্রদ্যুম্ন সুরদাসের মূর্তি দূর থেকে দেখে যে অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেছিল, তাঁর নিকটে এসে কিন্তু প্রদ্যুম্নের সে ভাব কেটে গেল। সে লক্ষ করলে সুরদাসের মুখশ্রী একটু কুদর্শন হলেও প্রতিভাব্যঞ্জক।
সুরদাস বললেন—আমি ভাবছিলাম তুমি আজ আসবে। হ্যাঁ, তোমার পিতা তো একজন প্রসিদ্ধ গায়ক ছিলেন, তুমি নিজে কিছু শিখেছ?
প্রদ্যুম লজ্জিত-মুখে উত্তর দিলে—একটু-আধটু বাঁশি বাজাতে পারি।
সুরদাস উৎসাহের সুরে বললেন—পারা তো উচিত। তোমার বাবাকে জানত না এমন লোক এদেশে খুব কম আছে। প্রতি উৎসবেই কৌশাম্বী থেকে তোমার বাবার নিমন্ত্রণপত্র আসত। হ্যাঁ, আমি শুনেছি তুমি নাকি বাঁশিতে বেশ মেঘ-মল্লার আলাপ করতে পারো!
প্রদ্যুম্ন বিনীতভাবে উত্তর দিল—বিশেষ যে কিছু জানি তা নয়, যা মনে আসে তাই বাজাই, তবে মেঘমল্লার মাঝে মাঝে বাজিয়েছি।
