তারপর ধীরে ধীরে অনেক বছর কেটে গেল। আমি ক্রমে বি.এ. পাস করে চাকরিতে ঢুকলুম। মামারবাড়ি আর যাইনে, কারণ সে-গ্রাম আর যাবার যোগ্য নয়। মামারবাড়ির পাড়ার গাঙ্গুলীরা, রায়েরা, ভড়েরা সব একে একে মরে-হেজে গেল, যারা অবশিষ্ট রইল তারা বিদেশে চাকরি করে, ম্যালেরিয়ার ভয়ে গ্রামের ত্রিসীমানা মাড়ায় না। ওপাড়াতেও তাই জীবন মজুমদারের প্রকাণ্ড দোতলা বাড়ির ছাদ ভেঙে ভূমিসাৎ হয়ে গিয়েছে, শুধু একদিকের দোতলাসমান দেয়ালটা দাঁড়িয়ে আছে। যে পুজোর দালানে ছেলেবেলায় কত উৎসব দেখেছি, এখন সেখানে বড়ো বড়ো জগডুমুরের গাছ, দিনেই বোধ হয় বাঘ লুকিয়ে থাকে। বিখ্যাত রায়দিঘি মজে গিয়েছে, দামে বোঝাই, জল দেখা যায় না, গোরু-বাছুর কচুরিপানার দামের ওপর দিয়ে হেঁটে দিব্যি পার হতে পারে।
সন্ধ্যারাতেই গ্রাম নিশুতি হয়ে যায়। দু-এক ঘর নিরুপায় গৃহস্থ যারা নিতান্ত অর্থাভাবে এখনও পৈতৃক ভিটেতে ম্যালেরিয়া-জীর্ণ হাতে সন্ধ্যাদীপ জ্বালাচ্ছে, সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হতে-না-হতেই তারা প্রদীপ নিবিয়ে শয্যা আশ্রয় করে—তারপর সারারাত ধরে চারিধারে শুধু প্রহরে প্রহরে শৃগালের রব ও নৈশপাখির ডানা ঝটাপটি!
আমার মামারাও গ্রামের ঘর-বাড়ি ছেড়ে শহরে বাসা করেছেন। ছোটোমামার ছেলের অন্নপ্রাশন উপলক্ষ্যে সেখানে একবার গিয়েছি। ব্রাহ্মণভোজনের কিছু আগে একজন শীর্ণকায় বৃদ্ধ একটা পুঁটলি হাতে বাড়িতে ঢুকলেন। এক-পা ধুলো, বগলে একটা ময়লা সাদা কাপড় বসানো বাঁশের বাঁটের ছাতা। প্রথমটা চিনতে পারিনি, পরে বুঝলুম। ভণ্ডুলমামা এত বুড়ো হয়ে পড়েছেন এর মধ্যে!…শহরে এসে মামাদের নতুন সভ্য, শৌখিন আলাপি বন্ধুবান্ধব জুটেছে, তাদের পোশাক পরিচ্ছদের ধরনে ও কথাবার্তার সুরে ভণ্ডুলমামা কেমন ভয় খেয়ে সংকোচের সঙ্গে নিমন্ত্রিত ভদ্রলোকদের শতরঞ্চির এককোণে বসলেন। তিনিও নিমন্ত্রিত হয়েই এসেছিলেন বটে, কিন্তু মামারা তখন শহুরে বন্ধুদের আদর-অভ্যর্থনায় মহা ব্যস্ত। তাঁর আগমন কেউ বিশেষ লক্ষ করেছে এমন মনে হল না।
আমি গিয়ে ভণ্ডুলমামার কাছে বসলুম। চারিধারে অচেনা মুখের মধ্যে আমায় দেখে ভণ্ডুলমামা খুব খুশি হলেন। আমি জিজ্ঞেস করলুম—আপনি কী কলকাতা থেকে আসছেন?
ভণ্ডুলমামা বললেন—না বাবা, আমি রিটায়ার করেছি আজ বছরপাঁচেক হবে। গাঁয়ের বাড়িতেই আছি। ছেলেরা কেউ আসতে চায় না।
অন্নপ্রাশন শেষ হয়ে গেল। ভণ্ডুলমামা কিন্তু মামারবাড়ি থেকে আর নড়তে চান। চার-পাঁচ দিন পরে কিছু চাল-ডাল ও বাসি সন্দেশ-রসগোল্লা নিয়ে দেশে রওনা হলেন। পায়ে দেখি কটক থেকে কিনে আনা বড়োমামার সেই পুরোনো চটিজুতোজোড়া। আমায় দেখিয়ে বললেন—নবীন কটক থেকে এনেছে, দেখে বড়ো শখ হল, বয়স হয়েছে কবে মরে যাব, বললুম তা দাও নবীন, জুতোজোড়াটা পুরোনো হলেও এখনও দু-তিন মাস যাবে। বাড়িতে একজোড়া রয়েছে, আঙুলে বড়ো লাগে বলে খালি পায়েই–
তিনি বাড়ির বার হয়ে গেলেন। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলুম শীর্ণকায় ভণ্ডুলমামা ভারী চালডালের মোটের ভারে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে চটিজুতোয় ফটাং ফটাং শব্দ করতে করতে স্টেশনের পথে চলেছেন। হঠাৎ আমার মনে তাঁর উপরে আমার বাল্যের সেই রহস্যময় স্নেহ ও অনুকম্পার অনুভূতিটুকু কতকাল পরে আবার যেন ফিরে এল। আমি চেঁচিয়ে বললুম—একটু দাঁড়ান মামা, আপনাকে তুলে দিয়ে আসি। ভণ্ডুলমামার পুটুলিটা নিজের হাতে নিলুম, টিকিট করে তাঁকে গাড়িতে তুলেও দিলুম। ট্রেনে ওঠবার সময় একমুখ হেসে বললেন—যেও না হে একদিন, বাড়িটা দেখে এসো আমার—খাসা করেছি—কেবল পাঁচিলটা এখনও যা বাকি। কী করি, আমার হাতে আজকাল আর তো কিছু নেই, ছেলেরা নিজেদের বাসার খরচই চালিয়ে উঠতে পারে না—অবিশ্যি ওদের জন্যেই তো সব। দেখি, চেষ্টায় আছি—সামনের বছরে যদি…
ভণ্ডুলমামার সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি। কিন্তু এর মাসকতক পরে তাঁর বড়োছেলে হরিসাধনের সঙ্গে কলকাতায় দেখা হয়েছিল। ম্যাকমিলান কোম্পানির বাড়িতে চাকরি করে, জিনের কোট গায়ে, হাতে বইয়ের আকারে খাবারের কৌটো, মুখে একগাল পান—বউবাজারের ফুটপাত দিয়ে বেলা দশটার সময় অফিসে যাচ্ছে। আমিই ভণ্ডুলমামার কথা তুললুম। হরিসাধন বললে—বাবা দেশের বাড়িতেই আছেন—আমরা বলি আমাদের সংসারে এসে থাকুন, তাতে রাজি নন। বুদ্ধিসুদ্ধি তো কিছু ছিল না বাবার, নেইও—সারাজীবন যা রোজগার করেছেন ওই জঙ্গলের মধ্যে এক বাড়ি করতে গিয়ে সব নষ্ট করেছেন, নইলে আজ হাজার চার-পাঁচ টাকা হাতে জমত। ওগাঁয়ে যাবেই বা কে? রামো:, যেমন জঙ্গল তেমনি ম্যালেরিয়া—তা ছাড়া লোকজন নেই, অসুখ হলে একটা ডাক্তার নেই—চার-পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে বাড়ির পিছনে, বেচতে গেলে এখন ইট-কাঠের দরেও বিক্রি হবে ভেবেছেন? কে নিতে যাবে, পাগল আপনি?
আমি বললুম—কথাটা ঠিক বটে। কিন্তু ভেবে দেখো, তোমার বাবা যখন বাড়িটা প্রথম আরম্ভ করেছিলেন, তখন জাজ্বল্যমান গ্রাম। বাড়িটা তৈরি করতে এত দেরি হয়ে গেল যে ইতিমধ্যে গাঁ হয়ে গেল শ্মশান, লোকজন উঠে অন্যত্র চলে গেল, আর সেই সময় তোমাদের বাড়ির গাঁথুনিও শেষ হল। কার দোষ দেবে?
তারপর ভণ্ডুলমামার আর কোনো সংবাদ রাখিনি অনেককাল। বছরতিনেক আগে একবার মেজোমামা চেঞ্জে গিয়েছিলেন দেওঘরে। পুজোর ছুটিতে আমিও সেখানে যাই। তাঁর মুখেই শুনলুম ভণ্ডুলমামা সেই শ্রাবণেই মারা গিয়েছেন। অসুখবিসুখ হয়ে ক-দিন ঘরের মধ্যেই ছিলেন, কেউ বিশেষ দেখাশোনা করেনি, আর আছেই বা কে গাঁয়ে যে দেখবে? এ অবস্থায় ঘরের মধ্যে মরে পড়েছিলেন, দু-তিন দিন পরে সবাই টের পায়, তখন ছেলেদের টেলিগ্রাম করা হয়। ভণ্ডুলমামার এইখানেই শেষ।
