আমি জিজ্ঞেস করলুম,—আপনাদের এখানকার বাড়িতে ছেলে-মেয়ে আনবেন না?
ভণ্ডুলমামা বললেন, আনব, শিগগিরই আনব বাবা। এখনও একটু বাকি আছে, একটা রান্নাঘর আর একটা কুয়ো—এ দুটো করতে পারলেই সব এনে ফেলি। কলকাতায় বাসাভাড়া আর দুধের খরচ জোগাতেই…সেইজন্যেই তো খেয়ে-না খেয়ে দেশে বাড়িটা করলুম, তবে ওই একটুখানি যা বাকি আছে…তা ছাড়া চিলেকোঠার ছাদটা এখনও এইবারেই ভাবছি শ্রাবণ মাসের দিকে ওটাও শেষ করব।
বলে কী! এখনও বাকি! জ্ঞান হয়ে পর্যন্ত দেখে আসছি, ভণ্ডুলমামার বাড়ি উঠছে! এ তাজমহল নির্মাণের শেষ বেঁচে থেকে দেখে যেতে পারব তো!
ভণ্ডুলমামা আপন মনেই বলে যেতে লাগলেন—সামান্য চাকরি, ছাপোষা মানুষ বাবা, কাচ্চাবাচ্চা খাইয়ে যা থাকে তাতেই তো বাড়ি হবে? এখন তো বাসায় বাসায় কাটচে, আজ যদি চাকরি যায় তবে ছেলেপুলে নিয়ে কোথায় দাঁড়াব, তাই ভেবে আজ চোদ্দো-পনেরো বছর ধরে একটু একটু করে বাড়িটা তুলচি। তবে এইবার আর দেরি হবে না, আসচে বছর সব এনে ফেলব। জায়গাটা বড়ো ভালোবাসি।
ভণ্ডুলমামা বললেন তো চোদ্দো-পনেরো বছর, কিন্তু আমার মনে হল ভণ্ডুলমামার বাড়ি উঠছে আজ থেকে নয়, জীবনের পিছন ফিরে চেয়ে দেখলে যতদূর দৃষ্টি চলে ততকাল ধরে…যেন অনন্তকাল, অনন্ত যুগ ধরে ভণ্ডুলমামার বাড়ির ইট একখানির পর আর একখানি উঠছে…শিশু থেকে কবে বালক হয়েছিলুম, বালক থেকে কিশোর, কৈশোর কেটে গিয়ে এখন প্রথম যৌবনের উন্মেষ, আমার মনে এই অনাদ্যন্ত মহাকাশ বেয়ে কত শত জন্মমৃত্যু, সৃষ্টি ও পরিবর্তনের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে ভণ্ডুলমামার বাড়ি হয়েই চলেছে…ওরও বুঝি আদিও নেই, অন্তও নেই।
পরের বছর আবার ভণ্ডুলমামার সঙ্গে কলকাতাতেই দেখা। আমি তখন থার্ড ইয়ারে পড়ি। ভণ্ডুলমামা বললেন—এসো একবার আমাদের বাসায়। তোমার মামি তোমায় দেখলে খুশি হবে।—সামনের রবিবার তোমার নেমন্তন্ন রইল, অবিশ্যি অবিশ্যি যাবে।
গেলুম, ভণ্ডুলমামার ছেলেদের সঙ্গেও আলাপ হল। ভণ্ডুলমামা অনুযোগের সুরে বললেন,—ওদের বলি, যা একবার এই সময়ে। আষাঢ় মাসে দেশে গিয়ে উঠোনে খাসা বরবটি আর শিম লাগিয়ে রেখে এসেছি, মাচাও বেঁধে রেখে এসেছি,—তা কেউ কী কথা শোনে?
মামিমা ঝংকার দিয়ে বলে উঠলেন,—যাবে সেখানে কেমন করে শুনি? কোনো ঘরে বাস করবার জো নেই, ছাদ ফুটো হয়ে জল পড়ে। জলের ব্যবস্থা নেই বাড়িতে, শুধু শিম আর বরবটির পাতা চিবিয়ে তো মানুষে…তাতে বাড়ি হাট আলগা, পাঁচিল নেই।
ভণ্ডুলমামা মৃদু প্রতিবাদের সুরে ভয়ে ভয়ে যা বললেন তার মর্ম এই যে, মানুষ বাস না-করলেই বাড়িতে বট-অশ্বথের গাছ হয়, ছাদ আঁটা হয়ে গেছে আজ অনেকদিন, কিন্তু কেউ বাস তো করে না। বাড়ি কাজেই খারাপ হতে থাকে। তবুও তিনি বছরে দু-তিনবার যান বলে এখনও ঘরদোর টিকে আছে। পাতকুয়োর আর কত খরচ? চৈত্র মাসের দিকে না-হয় করে দেওয়া যাবে। আর তোমরা সবাই যদি যাও, পাঁচিল আষাঢ় মাসেই করে দেওয়া যাবে।
বুঝলুম পাঁচিল পাতকুয়ো এখনও বাকি। ভণ্ডুলমামার বাড়ি এখনও শেষ হয়নি, এখনও কিছু বাকি আছে। কিন্তু এতদিন ধরে ব্যাপারটা চলচে যে, এক দিক গড়ে উঠতে অন্য দিকে ধরেছে ভাঙন।
এর পরে মামারবাড়ি গিয়ে দু-একবার দেখেছি ভণ্ডুলমামা দু-পাঁচ দিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসে আছেন। এটা সারাচ্ছেন, ওটাতে বেড়া বাঁধছেন, এগাছটা খুঁড়ছেন, ওগাছটা কাটছেন। ছেলেরা আসতে চায় না কলকাতা ছেড়ে। নিজেকেই আসতে হয়, দেখাশোনো করতে হয় বলে একদিন সলজ্জ কৈফিয়তও দিলেন।…পাঁচিল? হ্যাঁ তা পাঁচিল—সম্প্রতি একটু টানাটানি যাচ্ছে…সামনের বর্ষায়…ঘরদোর বেঁধেছি সারাজীবন খেটে, ওই আমার বড়ো আদরের জায়গা তোরা না-থাকিস, আমিই গিয়ে থাকি।
আমি বললুম,—ওখানে কেমন করে থাকেন? সারাগাঁয়েই তো মানুষ নেই, মামারবাড়ির পাড়া তো একেবারে জনশূন্য হয়ে গেছে।
—কী করি বাবা, ওই বাড়িখানার ওপর বড়ো দম আমার যে। দেখো, চিরকাল পরের বাসায়, পরের বাড়িতে মানুষ হয়ে ঘরের কষ্ট বড়ো পেয়েছিলুম—তাই ঠিক করি বাড়ি একখানা করবই। ছেলেবেলা থেকে ওই গাঁয়েই কাটিয়েছি, ওখানটা ছাড়া আর কোথাও মন বসে না। চিরকাল ভাবতুম রিটায়ার করে ওখানেই বাস করব। একটা আস্তানা তো চাই, এখন না-হয় ছেলেপিলে নিয়ে বাসায় বাসায় ঘুরছি, কিন্তু এর পরে দাঁড়াব কোথায়? তাই জলাহার করেও সারাজীবন কিছু কিছু সঞ্চয় করে ওই বাড়িখানা করেছিলুম। তা ওরা তো কেউ এল না—আমি নিজেই থাকি। না-থাকলে বাড়িখানা তো থাকবে না—আর এককালে-না-এককালে
ছেলেদের তো এসে বসতেই হবে বাড়িতে। কলকাতার বাসায় বাসায় তো চিরকাল কাটবে না।
তারপর মামাদের মুখে ভণ্ডুলমামার কথা আরও সব জানা গেল। ভণ্ডুলমামা একা বিজন বনের মধ্যে নিজের বাড়িখানায় থাকেন। তাঁর এখনও দৃঢ় বিশ্বাস তাঁর ছেলেরা শেষপর্যন্ত ওই বাড়িতেই গিয়ে বাস করবে। তিনি এখনও এজায়গাটা ভাঙচেন, ওটা গড়চেন, নিজের হাতে দা নিয়ে জঙ্গল সাফ করচেন। ছেলেদের সঙ্গে বনে না—ওই বাড়ির দরুনই মনান্তর, স্ত্রীও ছেলেদের দিকে। ছেলেরা বাপকে সাহায্যও করে না। ভণ্ডুলমামা গাঁয়ে একখানা ছোটো মুদির দোকান করেছিলেন—লোক নেই তার কিনবে কে? যা দু-একঘর খদ্দের জুটেছিল—ধার নিয়েই দোকান উঠিয়ে দিলে। এখন ভণ্ডুলমামা এগাঁ-ওগাঁ বেড়িয়ে কোনো চাষার বাড়ি থেকে দু-কাঠা চাল, কারুর বাড়ির পাঁচটা বেগুন—এইরকম করে চেয়েচিন্তে এনে বাড়িতে হাঁড়ি চড়িয়ে দুটো ফুটিয়ে খান।
