লোকটি তাচ্ছিল্যের সুরে বলিল—ওঃ এই! আমি বলি কী না কী। ও কিছু না, যাদের গোরু তারা এসে উঠিয়ে নিয়ে যাবে এখন।
বুধী বউটির চোখে-মুখে দয়া ও মনুষ্যত্ব দেখিতে পাইয়াছিল আগেই—সে মানুষ চেনে। বুধী আকুল নেত্রে আর্ত আবেদনের দৃষ্টিতে বউটির দিকে চাহিল। বউটি বলিল—ওই দেখো না কেমন করে চাইচেনা, ওকে না-তুলে দিয়ে যাওয়া হবে না—এই চরে এখানে মানুষজন কোথায় যে ওকে তুলবে?
নৌকোর মাঝিরাও বলিল—এর নাম চাঁপবেড়ের চর। এ তল্লাটে মনিষ্যি নেই বাবু। মা-ঠাকরুন ঠিকই বলছেন।
লোকটি বিরক্তি প্রকাশ করিল। নানা ওজর-আপত্তি তুলিল, কিন্তু বউটি নাছোড়বান্দা। গোরুটাকে না-তুলিয়া যাওয়া হইতেই পারে না। বলিল—দ্যাখো যাওয়া হচ্ছে একটা মঙ্গলের কাজে—গোড়াতেই একটা অমঙ্গল দিয়ে শুরু করা চলে? এই বুড়ো গোরুটার চোখের চাউনি আমি সারাদিন ভুলতে পারব না—ও মরে যাবে এই হাবড়ে, যদি কেউ না-তোলে।
লোকটি বিরক্তিপূর্ণ সুরে বলিল—তোমায় নিয়ে বেরুলেই একটা-না-একটা হাঙ্গামা পোয়াতেই হবে এই ধরনের—এখন কোথায় লোকজন পাই যে গোরু তুলি! বাঁশ চাই, দড়ি চাই, লোক চাই—ও কী সোজা, পুঁতে গিয়েছে, দেখচ না?
ঘণ্টাখানেক নৌকো সেখানে বাঁধা রহিল। নৌকোর মাঝিরা নামিয়া কোথা হইতে জনকতক লোক ডাকিয়া আনিল—আরও ঘণ্টাখানেক টানাটানির পরে সকলে মিলিয়া বুধীকে টানিয়া তুলিল হাবড়া হইতে।…জল—জল! সে একটু জল খাইবে।
বউটি বলিল—আহা কী তেষ্টাটাই পেয়েছিল, দেখলে? চোঁ চোঁ করে এক গাঙ জল খেয়ে ফেলল—বুড়ো গোরু, দেখো না ওর পা কাঁপচে, দাঁড়াতে পারছে না!
লোকটি খিঁচাইয়া বলিল—মরুক গে! ট্রেনটা ফেল হল তো এখন? কোথাকার এক ছেড়া ল্যাঠা জুটিয়ে দুটি ঘণ্টা দিলে কাটিয়ে! চলো এখন—স্টেশনে বসে থাকো রাত দশটা পর্যন্ত!
নৌকো চলিয়া গেল। বুধী কী বলিয়া কৃতজ্ঞতা জানাইবে?
…ওগো অপরিচিতা, জীবনের বড্ড শেষের দিকে তুমি এলে। তোমার মতো মানুষের সঙ্গে যদি আগে দেখা হত।…যাও যেখানে যাবে।
গোরুর আশীর্বাদে মানুষের কোনোকাজ হয় কিনা জানি না—শুভ হোক তোমার জীবনের যাত্রাপথ।
তারপর আরও কয়েকদিন কাটিয়া গিয়াছে। একদিন বুধীর সারাদিন ভয়ানক কষ্ট গেল। সেদিন যেমন দারুণ বর্ষা তেমনি ঝড়। তেমনি একটা বড়ো গাছও পাওয়া গেল না যাহার নীচে এই ভীষণ ঝড়বৃষ্টিতে সে আশ্রয় নেয়। একটা বাঁশ ঝাড়ের তলায় আরও কয়েকটি গোরুর সঙ্গে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটাইয়া সেইখানেই ঘুমাইয়া পড়িল।
সকাল হইতেই বুধীর ঘুম ভাঙিল। সারাগায়ে জোঁক লাগিয়া তাহার অর্ধেক রক্ত চুষিয়া খাইয়াছে, এমন ভয়ানক জায়গা। ঝড়বৃষ্টি থামিয়াছে; রৌদ্র উঠিল।
হঠাৎ কিছু দূরে একটা পুকুর ও তার পাশের আমবাগান দেখিয়া তাহার মনে কেমন সন্দেহ হইল।
জায়গাটা যেন পরিচিত মনে হইতেছে।
বুধী আগাইয়া গিয়া দেখিল। এই আমবাগান তো সে ইহার আগেও দেখিয়াছে; যে দলটির সঙ্গে সে সেবার গিয়াছিল—এই আমবাগানে তাহারা একদিন রাত্রি কাটায়; পাশের পথটা ওটাও সে চেনে।
বুধী সেই পথ বাহিয়া আগ্রহের সহিত হাঁটিয়া চলিল—যতই যায় ততই তাহার বেশ মনে পড়িতে লাগিল, এই পথ তাহার পরিচিত। এ পথে সে আগে আসিয়াছে। এমনকী একদিন মনে হইল, তাহাদের গ্রাম আর বেশি দূরে নাই। ওই পথে সে পাউণ্ডঘর হইতে ফিরিয়াছে দু-তিনবার। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে বুধীর মনে হইল তার হৃৎস্পন্দন বুঝি বন্ধ হইয়া যাইবে! ওই তো তাহাদের গ্রাম, তাহাদের গ্রামের সেই বড়ো অশ্বথ গাছটা, ওই তো সেই বেগুনের খেত—খেতের পাশেই তাহাদের নদী; ওই তো গ্রামের ভাগাড়, ভাগাড়ের পাশে ভাঙা ইটখোলা।
বুধী দৌড় দিল; তখন আনন্দে সে প্রায় জ্ঞানশূন্য।
সন্ধ্যা হইবার দেরি নাই। বুধী দূর হইতে বাড়ি দেখিতে পাইল। গাবতলায় যে আনারসের জমি ছিল, বুধী আনন্দে উৎসাহে আনারসের খেতের বেড়া ভাঙিয়া ছুটিতে ছুটিতে বাড়ির উঠানে গিয়া পৌঁছিতেই কোথা হইতে এক তীক্ষ্ণ মিষ্টি ক্ষুদ্র মেয়েলি কণ্ঠের আনন্দ ও বিস্ময় ভরা চিৎকার শোনা গেল—’ওমা, ও ঠাকুরমা, শিগগির, শিগগির এসে দ্যাখো কে এসেছে—শিগগির এসো—’
পরক্ষণে বুধী তার গলায় দুটি নরম কচি হাতের সাগ্রহ নিবিড়ো বেষ্টন অনুভব করিল। খুকির মা বাহিরে আসিয়া বলিলেন, কে এসেছে বলছিস খুকি?…ওমা ও কে, বুধী না?
খুকির ঠাকুরমা আসিয়া বলিলেন—বুধী এল কোত্থেকে! আহা, কী হাড়সার হয়ে গিয়েছে, ওকে যে আর চেনা যায় না।
খুকির মা বলিলেন—ও কী করে পালিয়ে এল আজ দু-মাস পরে! ঠিক দু-মাস হয়েছে। আমি তখন বলেছিলুম চালানে পালে গোরু বেচে না ওরা—শুনেচি নাকি কলকাতায় কসাইখানায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে। সত্যি মিথ্যে জানিনে বাপু এইরকম কিন্তু সবাই বলে। তোমরা তখন শুনলে না—ভাবলে বুড়ো গোরু দুধ তো আর দেবে না—বেচে ফেলে আপদ মিটিয়ে দিই। সংসারের মঙ্গল হত ভাবচ ওই গোরু যদি বেঘোরে মারা যেত! ও কী করে পালিয়ে এল তাই ভাবি! বোধ হয় রাস্তা থেকে পালিয়েছে পাল থেকে, কী হাড়সার হয়ে গিয়েছে, মা গো মা!
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। বুধী গোয়ালে শুইয়া পড়িয়াছে। এই তাহার আপনার গৃহ—এখনও তাহার বিশ্বাস হইতেছে না যে সত্যই বাড়ি ফিরিয়াছে। এই তাহার আবাল্য পরিচিত গোহাল, এই সেই বিচালির গাদা, সেইরকম ঘন সাঁজালের ধোঁয়ায় গোয়াল অন্ধকার—একটাও মশা নাই, বাছুরটা একপাশে সানি খাইতেছে। খুকিদের রান্নাঘরে খুকির মা রাঁধিতেছেন, খুকির উচ্চকণ্ঠ শোনা যাইতেছে। কাল সকালে নদীর ধারে তার প্রিয়, পরিচিত মাঠটিতে সে ঘাস খাইতে
