সন্ধ্যা হয়ে গেল। বনের ওপর নবমীর চাঁদ উঠল। একটু পরেই জোয়ার পেয়ে আমাদেরঃনৌকো ছাড়া হল। জলের ধারের আঁধারভরা নিভৃত ঝোপের মধ্যে থেকে সত্যিই যেন একটা চাপাঃকান্নার রব পাওয়া যাচ্ছিল—সেটা হয়তো কোনো রাতজাগা বনের পাখির, কী কোনো পতঙ্গের ডাক।
বাঁওড়ের মুখ পার হয়ে যখন আমরা বাইরের নদীতে এসে পড়েছি, তখন পিছন ফিরে চেয়ে দেখি নির্জন গ্রামের মাঠে সাদা কুয়াশায় ঘোমটা দেওয়া ঝাপসা জ্যোৎস্নারাত্রি অল্পে অল্পে লুকিয়ে চোরের মতো আত্মপ্রকাশ করছে, অনেককাল আগেকার সেই লজ্জা-কুণ্ঠিতা ভীরু পল্লিবধূটির মতো!…
বাটি-চচ্চড়ি
সংসারটা এমন কিছু বড়ো নয়। মাত্র দুটো মেয়েমানুষ এবং একজন পুরুষের সমবায়ে গঠিত। ডাক্তার, ডাক্তারের বউ এবং তাদের এক বিধবা পিসিমা, আবার এই পিসিমা ডক্তারের চেয়ে বছর দশেকের ছোটো। সরকারি হাসপাতালের পুরোনো ডাক্তার। চক্রধরপুরে বদলি হয়েছে সম্প্রতি। ছোট্ট সংসার—আরও ছোট্ট একখানা বাড়িতে অবস্থিত—বেশ ভালোভাবেই চলছিল সুখে, শান্তিতে, হাসিতে ও আনন্দে–উদয়াস্ত সুমহান কাল কেটে যাচ্ছিল মোহন ছন্দে।
এ হেন সময়ে ডাক্তার একখানা চিঠি পেল এই মর্মে, কলকাতা থেকে নাকি তার বাপের ছোটো কাকার বড়ো ছেলের রুগণ বধূ আসছে তার শরীরের ক্ষতিপূরণ করতে এই পাহাড়ের দেশে। অলকার স্বামীই ডাক্তারের চেয়ে অনেক ছোটো।
প্রস্তাবনাটা পিসিমার কাছে উত্থাপিত হলে তো সে প্রতিবাদ করলে, “বেশ, আসুক ছোটো বউদি। আমি কলকাতায় যাব—এখানে থাকতে পারব না।”
ডাক্তার প্রতিবাদ করলে, ‘‘তাহলে এখানে দিন চলবে কী করে?”
“সে আমি কী জানি ভাইপো!” পিসিমা ওই বলেই ডাক্তারকে সম্বোধন করে।
“কিন্তু বউমা আসছেন রোগা মানুষ। তাঁকে দিয়ে তো আর সংসারের কাজ করানো যাবে না। আর তোমাদের বউ তখন হয়ে পড়বে একা—ছেলেপিলে নিয়ে আর ক-দিক সামলাবে বলো, তা ছাড়া কলকাতায় তো দেখছি মানুষের অভাব তেমন নেই।”
সুতরাং পিসিমাকে থেকে যেতে হল। অলকার সঙ্গে তার আজ প্রায় পাঁচ বছরের বিবাদ। সেই বিবাদের ঝাঁঝেই সে প্রতিবাদ করেছিল। তবে সে প্রতিবাদ টিকল না কিছুতেই ডাক্তারের প্রবল যুক্তির কাছে।
ওদিকে অলকা এল যথাসময়ে। দীর্ঘদিন ম্যালেরিয়ায় ভুগে ভুগে তার দেহের সক্রিয় কলকবজাগুলি অচলপ্রায় হয়ে গেছে। শরীরের সে কান্তি বা শোভা নেই। মুখশ্রী হয়েছে কালিমালিপ্ত। গায়ের হাড়গুলো এমনভাবে বার হয়ে পড়েছে যে, তাদের এক-একখানা করে গোনা যায় অক্লেশে।
আসার পরের দিন তো ডাক্তার পরীক্ষা করলে। দেখলে জীবনের আশা বড়ো কম। নিজের মৃত্যুর জন্যে সে নিজে দায়ী। কারণ সে মৃত্যু ডেকে এনেছে অযথা নিজের নির্বুদ্ধিতার ফলে এবং চিকিৎসার অভাবে। এমনকী এ কথা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, সে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষের পানে এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ নিছক ভাইটামিনের অভাবে বা খাদ্যপ্রাণের অকিঞ্চিৎকরতায়। স্বামীর দীর্ঘ দিনের বেকার অবস্থা রোগের আর একটি কারণ বলা যেতে পারে।
যা হোক, বউমার চিকিৎসা এবার চলতে লাগল যথাসাধ্য। কিন্তু সে চিকিৎসার কোনো সুফল ফলল না মাসখানেকের মধ্যেও। ডাক্তার হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসল। তবু অলকার রোগ কমল না; পরন্তু বৃদ্ধি পেতে লাগল একটু একটু করে দিন দিন, সকল চেষ্টাকে ব্যর্থ প্রতিপন্ন করে।
অলকার নুন খাওয়া নিষেধ। কোনো এক রাজার মেয়ে নাকি তার বাপকে নুনের মতো ভালোবাসত। সুতরাং নুনের প্রয়োজনীয়তা কিংবা গুণ সামান্য নয়। তাই অলকা সচরাচর নুনহীন তরকারি খেত না। ডাক্তারের বউ আবার লোককে খাওয়াতে নাকি বড়ো ভালোবাসত। সুতরাং অলকার খাওয়ার কষ্ট দেখে তার করুণ মন ক্লিষ্ট হত অত্যন্ত। অনেক বলে-কয়ে সে স্বামীর কাছ থেকে বউমার সামান্য একটু বাটি-চচ্চড়ি খাবার অনুমতি পেয়েছিল এবং প্রতিদিন তার জন্যে একটা বাটি-চচ্চড়ি করে দিত সযত্নে।
সেদিন অনেকগুলো বিছানা পরিষ্কার করে উঠতেই ডাক্তারের বউয়ের বেশ বেলা হয়ে গেল। পিসিমা তাড়াতাড়ি স্নান করে এসে রান্না করতে বসল। আর বউমা?—বাতায়নপাশে বসে দূর আকাশের পানে তাকিয়ে দেখতে লাগল অপরূপ মেঘের খেলা। দূরে অতিকায় ধূমের মতো দাঁড়িয়ে আছে আকাশচুম্বী পর্বত। তার নীচে ইতস্তত বৃক্ষলতাশোভিত কালো বর্ণের ছোটো ছোটো পাহাড়। তাদের গায়ে লাল কাঁকরের বঙ্কিম পথরেখা—মনে হয় যেন কোনো অচিন দেশে চলে গেছে পাহাড়ের বুক বয়ে। বউমা অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিল, এমন সময় ডাক্তারের বউ ভিজেচুল মুছতে মুছতে এসে বললে, “বউমা, আজ কী দিয়ে দুধ সাবু খাবে?”
“যা হোক দিয়ে খাব অখন মা।”
“কেন বাটি করতে দিলে না?”
“থাকগে, কুটনো তো সব কোটা হয়ে গেছে!”
“তা হোক, তুমি একটা বাটি করতে দাও মা।” কথা শেষ করে ডাক্তারের বউ গৃহত্যাগ করে আর বউমা উঠে যায় বাটি-চচ্চড়ির কুটনো কুটতে।
পিসিমা কড়ার ওপর মাছ দিয়ে একবার বটির পানে তাকিয়ে নিল, তারপর বললে, “বলি হ্যাঁগা বউদি, আমার গতরে কী এমন পোকা পড়েছে!”
বউমা সবিস্ময়ে কয়, “কেন ঠাকুরঝি?”
মুখরা পিসিমা তখন ফেটে পড়লেন, “আমি কী বাটির কুটনো কুটতে পারি না,–কুটলে হাতে পক্ষাঘাত হত! তেজ করে আমায় একবার বলা হল না। রোগ তো বারো মাস লেগেই আছে, তার আবার অত দেমাক কীসের?”
রুগণ বধূটির শুষ্ক নয়নদ্বয় বিদীর্ণ করে ঝরে পড়ে অঝোরে মুক্তার মতো অশ্রুকণা নিদারুণ ঘৃণায় ও বেদনায়, ননদের এই বাক্যবাণের সুতীব্র আঘাতে। স্বামীর অর্থহীনতা এবং নিজের রোগের চিন্তায় তার সারা কোমল অন্তরাত্মা সহসা রি-রি করে ওঠে। আর পিসিমার মুখে তখন যেন তুবড়ি তে আগুন লেগেছে। সমস্ত বারুদ না-নিঃশেষিত হলে সে নীরব হবে না। বউমা আস্তে আস্তে বাটিটা নিয়ে আসে সকলের অজ্ঞাতসারে।
