মাস দুই-তিন পরে কিন্তু একটা বড়ো বিপদ ঘটল। সকলে দেখলে বউটির আর সব ভালো বটে, একটা কিন্তু বড়ো দোষ। সে কিছুতেই স্বামীর ঘেঁষ নিতে চায় না, প্রাণপণে এড়িয়ে চলতে চায়। প্রথম প্রথম সকলে ভেবেছিল, নতুন বিয়ে হয়েছে, ছেলেমানুষ, বোধহয় সেইজন্যই এ রকম করে! ক্রমে কিন্তু দেখা গেল স্বামী কেন, যেকোনো পুরুষমানুষ দেখলেই সে কেমন ভয়ে কাঁপে। বাড়িতে যেদিন যজ্ঞি কী কোনো বড়ো কাজকর্মে বাইরের লোকের ভিড় হয়, সেদিন সে ঘর থেকে আর বারই হয় না। স্বামীর ঘরে কিছুতেই তো যেতে রাজি হয় না,
মাসে দু-দিন কী একদিন সকলে আদর করে গায়ে হাত বুলিয়ে পাঠাতে যায়, সে জনেজনের পায়ে পড়ে, এর-ওর কাছে কাকুতিমিনতি করে, কিছুতেই বুঝ মানে না। পুরুষমানুষের গলার স্বর শুনলেই কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়ে।
অনেক করে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সকলে তাকে একদিন স্বামীর ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে দোরে শিকল বন্ধ করে দিল। চৌধুরীমশায় অনেক রাত্রে ঘরে ঢুকে দেখেন, তাঁর তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী ঘরের এককোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে। এর পর আর কিছুতেই কোনো দিন সে স্বামীর ঘরে যেতে চাইত না, বাড়িসুদ্ধ লোকের হাতেপায়ে পড়ে বেড়াতে লাগল; সকলকে বলে—আমার বড় ভয় করে, আমায় ওরকম করে আর পাঠিও না…তোমাদের পায়ে পড়ি।…
বোঝাতে বোঝাতে বাড়ির লোক হয়রান হয়ে গেল।
দিনকতক গেল, একদিন তাকে সকলে মিলে জোর করে স্বামীর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বার থেকে দোর বন্ধ করে দিলে। তারা ঠিক করলে এইরকম দিতে দিতে ক্রমে লজ্জা ভাঙবে—নইলে কতদিন আর এ ন্যাকামি ভালো লাগে?…ভোরে উঠে সকলে দেখলে ঘরের মধ্যে বউ নেই, বাড়ির কোথাও নেই। নিকটেই বাপেরবাড়ির গাঁ, সেখানে পালিয়ে গিয়েছে ভেবে লোক পাঠানো গেল। লোক ফিরে এল, সে সেখানে যায়নি। তখন সকলে বললে—পুকুরে ডুবে মরেছে; পুকুরে জাল ফেলা হয়, কোনো সন্ধান মেলে না। বউয়ের কচি মুখের ও নিরীহ চোখের ভাব মনে হয়ে লোকের মনে অন্য কোনো সন্দেহ জাগবার অবকাশ পেল না। কত দিকে কত সন্ধান করে যখন কোন খোঁজই মিলল না, চৌধুরীমশায় মানসিক শোক নিবারণ করবার জন্যে চতুর্থ পক্ষের স্ত্রী ঘরে আনলেন।
অজ পাড়া-গাঁ, নতুন কিছু একটা বড়ো ঘটে না, অনেকদিন এটা নিয়ে নাড়াচাড়া চলল, তারপর ক্রমে সেটা কেটে গিয়ে গ্রাম ঠান্ডা হল। এই মাঠের পুবধারে গ্রামের মধ্যেই চৌধুরীদের বাড়ি ছিল। তখন এইখান দিয়েই নদীর স্রোত বইতমজে বাঁওড় হয়ে গিয়েছে তো সেদিন, আমরা ছেলেবেলাতেও ধান বোঝাই নৌকো চলাচল হতে দেখেছি। ক্রমে চৌধুরীদের সব মরে–হেজে গেল, শেষপর্যন্ত বংশে একজন কে ছিল, উঠে গিয়ে অন্য কোথাও বাস করলে। এসব অনেক বছর আগেকার কথা, সত্তর-আশি বছর খুব হবে। সেই থেকে কিন্তু আজ পর্যন্ত এইসব মাঠে বড়ো এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে শোনা যায়।
এই ফাল্গুন-চৈত্র মাসে যখন খুব গরম পড়ে, তখন রাখালেরা গোরু চরাতে এসে দূর থেকে কতদিন দেখেছে, মাঠের ধারে বনের মধ্যে নিভৃত দুপুরে বাঁশবনের ছায়ায় কে যেন শুয়ে আছে, কাছে গেলে কেউ কখনো দেখতে পায়নি।…কতদিন সন্ধ্যার সময় তারা গোরুর দল নিয়ে গ্রামের মধ্যে যেতে যেতে শুনেছে, অন্ধকার ঝোপের মধ্যে যেন একটা চাপা কান্নার রব উঠছে।…সমুখ জ্যোৎস্নারাত্রে অনেকে নদীর ঘাট থেকে ফেরবার পথে ছাতিমগাছের নীচু ডালের তলা দিয়ে যেতে যেতে দেখেছে, দূর মাঠে সন্ধ্যার আবছায়া জ্যোৎস্নার মধ্যে দিয়ে সাদা কাপড় পরে কে যেন ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছে—তার সমস্ত গায়ের সাদা কাপড়ে জ্যোৎস্না পড়ে চিকচিক করতে থাকে।…মাঠে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তখন ফুলেভরা নাগকেশর গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখলে মনে হয়, কে খানিকটা আগে এখানে দাঁড়িয়ে ডাল নীচু করে ফুল পেড়ে নিয়ে গিয়েছে…তার ছোটে ছোটো পায়ের দাগ, ঝোপ যেখানে বড়ো ঘন সেদিকেই চলে গিয়েছে।…
মাঠের ধারে এই ছাতিমগাছের তলায় উলো-চণ্ডীতলা। চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামবধূরা পিঠে, কাঁচা দুধ আর নতুন আখের গুড় নিয়ে বউ-চণ্ডীর পূজো দিতে আসে। বউ-চণ্ডী সকলের মঙ্গল করেন, অসুখ হলে সারিয়ে দেন, নতুন প্রসূতির স্তনে দুধ শুকিয়ে গেলে, ওঁর কাছে পুজো দিলে আবার দুধ হয়। কচি ছেলের সর্দি সারে, ছেলে বিদেশে থাকবার সময় চিঠি আসতে দেরি হলে পুজো মানত করবার পরই শিগগির সুসংবাদ আসে। মেয়েদের বিপদে-আপদে তিনিই সকলকে বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করে থাকেন।…
চক্রবর্তী মহাশয়ের গল্প শেষ হল। তারপর আরও নানা কথাবার্তার পর তিনি ও আর সকলে উঠে চলে গেলেন।
বেলা বেশ পড়ে এসেছে। সন্ধ্যার বাতাসে ছাতিম বনে সুর সুর শব্দ হচ্ছে। গ্রামের মাঠটা অনেকদ্দূর পর্যন্ত উঁচু-নীচু ঢিবি আর ঘেঁটুফুলের বনে একেবারে ভরা। বাঁ-দিকে দূরে একটা পুরোনো ইটের পাঁজার খানিকটা ঘন জিউলি গাছের সারির মধ্যে দিয়ে চোখে পড়ে।
নৌকোর গলুই-এ বসে আসন্ন সন্ধ্যায় আশি বছর আগেকার পলাতকা গ্রাম্যবধূর ইতিহাসটা ভাবতে লাগলুম। মাঠের মাঝে উঁচু ঢিবির ওপরকার ঘেঁটুফুলের ঘন বনের দিকে চেয়ে মনে হল যে—সারা দিনমান সে হয়তো ওর মধ্যে লুকিয়ে বসে
থাকে, কেবল গভীর রাত্রে লুকোনো জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে, মাঠের মধ্যেও বটগাছের তলায় চুপ করে বসে আকাশের তারার দিকে চায়।…পাশের ঝোপের ফুটন্ত বন-অপরাজিতা ফুলের রং-এর সঙ্গে রং মিলিয়ে নদী বয়ে যায়…ছাতিম বনের পাখিরা ঘুমের ঘোরে গান গেয়ে ওঠে—ওপার থেকে হু-হু করে হাওয়া বয়…সে ভয়ে ভয়ে মাঝে মাঝে পুব দিকে চেয়ে দেখে ভোরের আলো ফোটবার দেরি কত!…
