মাস পাঁচ-ছয় কাটল। বৈশাখ মাস।
এই সময়েই আমার টিউবওয়েলের কাজের ধুম। আট-দশ দিন একাদিক্রমে বাইরে কাটিয়ে বাসায় ফিরি কিন্তু তখনই আবার একটা কাজে বেরিয়ে যেতে হয়। এতে পয়সা রোজগার হয় বটে, কিন্তু স্বস্তি পাওয়া যায় না। স্ত্রীর হাতের সেবা পাইনে, ছেলে-মেয়েদের সঙ্গ পাইনে, শুধু টো-টো করে দূরদূরান্তর চাষাগাঁ ঘুরে ঘুরে বেড়ানো—শুধুই এস্টিমেট কষা, মিস্ত্রি খাটানো। মানুষ চায় দু-দণ্ড আরামে থাকতে, আপনার লোকেদের কাছে বসে তুচ্ছ বিষয়ে গল্প করতে, নিজের সাজানো ঘরটিতে খানিকক্ষণ করে কাটাতে, হয়তো একটু বসে ভাবতে, হয়তো ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে একটু ছেলেমানুষি করতে—শুধু টাকা রোজগারে এসব অভাব তো পূর্ণ হয় না।
হঠাৎ চিঠি পেয়ে বাসায় ফিরলাম, কাকার ছোটো মেয়েটির খুব অসুখ।
আমি পোঁছালাম দুপুরে, একটু পরে রোগীর ঘরে ঢুকে আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলুম। আমার পিসিমা সেই কলাই-করা পেয়ালাটাতে রোগীকে সাবু না-বার্লি খাওয়াচ্চেন।
আমি আমার মেয়েকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞাসা করলুম—ও পেয়ালাটা কোথা থেকে এল রে? খুকি বললে—ওটা কুকুরে না কীসে বনের মধ্যে নিয়ে ফেলেছিল বাবা, মনুদি দেখতে পেয়ে নিয়ে এসেছিল। সে তো অনেক দিনের কথা, পাঁচিলের ওই যে বন, ওইখানে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
আমি বিস্মিত সুরে জিজ্ঞেস করলুম—মনু নিয়ে এসেছিল? জানিস ঠিক তুই? খুকি অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে বললে—হ্যাঁ বাবা, আমি খুব জানি। তুমি না হয় মাকে জিজ্ঞেস করো; আমাদের সেই যে ছোকরা চাকরটাকে কুকুরে কামড়েছিল না, ওই দিন সকালে মনুদি পেয়ালাটা কুড়িয়ে আনে। ওই পেয়ালাতে তাকে কীসের শেকড়ের পাঁচন খাওয়ানো হল, আমার মনে নেই।
আমি চমকে উঠলুম, বললুম—কাকে রে? রামলগনকে?
—হ্যাঁ বাবা, সেই যে তারপর এখান থেকে চলে গেল দেশে, সেই ছেলেটা। আমার সারা গা ঝিমঝিম করছিল—রামলগনকে কুকুরে কামড়ানোর পর দেশে চলে গিয়েছিল—কিন্তু সেখানে যে সে মারা গিয়েছে, এ খবর আমি কাউকে বলিনি। বিশেষ করে গৃহিণী তাকে খুব ভালোবাসতেন বলেই সংবাদটা আর বাসায় জানাইনি। আমাদের টিউবওয়েলের মিস্ত্রি শিউশরনের শালির ছেলে সে—সে-ই খবরটা মাসখানেক আগে আমায় দেয়।
মনুর অসুখ তখনও পর্যন্ত খুব খারাপ ছিল না, ডাক্তারেরা বলছেন, ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমার কিন্তু মনে হল ও বাঁচবে না।
ও পেয়ালাটার ইতিহাস এ বাসায় আর কেউ জানে না, অসুখের সময় যে ওতে করে কিছু খেয়েছে সে আর ফেরেনি। জানত কেবল কাকার বড়ো মেয়ে, সে আছে শ্বশুরবাড়ি।
পেয়ালাটা একটু পরেই আবার চুপি চুপি ফেলে দিলুম—হাত দিয়ে তোলবার সময় তার স্পর্শে আমার সারা দেহ শিউরে উঠল—পেয়ালাটা যেন জীবন্ত, মনে হল যেন একটা ক্রু র, জীবন্ত বিষধর সাপের বাচ্চার গায়ে হাত দিয়েছি, যার
স্পর্শে মৃত্যু…যার নিশ্বাসে মৃত্যু…
পরদিন দুপুর থেকে মনুর অসুখ বাঁকা পথ ধরল, ন-দিনের দিন মারা গেল।
আমি জানতুম ও মারা যাবে।
মনুর মৃত্যুর পর পেয়ালাটা আবার কুড়িয়ে এনে ব্যাগের মধ্যে পুরে কাজে বেরুবার সময় নিয়ে গেলুম। সাত-আট ক্রোশ দূরে একটা নির্জন বিলের ধারে ফেলে দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম।
শোকের প্রথম ঝাপটা কেটে গিয়ে মাস-দুই পরে বাসা একটু ঠান্ডা হয়েছে তখন। কথায় কথায় স্ত্রীর কাছে একদিন এমনি পেয়ালাটার কথা বলি। তিনি আমার গল্প শুনে যেন কেমন হয়ে গেলেন, কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন, মুখ দিয়ে তাঁর কথা বেরুল না। আমি বললুম—বোধ হয় অত খেয়াল করে তুমি কখনো দ্যাখখানি, তাই ধরতে পারোনি—আমি কিন্তু বরাবর—
আমার স্ত্রী বিবর্ণমুখে বললেন—বলব একটা কথা? আমার আজ মনে পড়ল— একটু চুপ করে থেকে বললেন–
—খোকা যখন মারা যায় আর বছর আষাঢ় মাসে, সেই কলাই-করা পেয়ালাটাতে তাকে ডাবের জল খাওয়াতুম। আমি নিজের হাতে কতবার খাইয়েচি। তুমি তো তখন বাইরে বাইরে ঘুরতে, তুমি জানো না।
আমার কোনো উত্তর খানিকক্ষণ না-পেয়ে বললেন, জানতে তুমি এ কথাটা?
—না, জানতুম না অবিশ্যি। কিন্তু অন্যমনস্ক হয়ে আর একটা কথা মনে তোলাপাড়া করছিলুম—পেয়ালাটা আমাদের ছেড়েচে তো? ওটাকে কেন তখন ভেঙে চুরমার করে নষ্ট করে দিইনি? আবার কোনো উপায়ে এসে এ বাড়িতে ঢুকবে না তো?
পৈতৃক ভিটা
মধুমতী নদীর ওপরেই সেকালের প্রকাণ্ড কোঠাবাড়িটা।
রাধামোহন নদীর দিকের বারান্দাতে বসে একটা বই হাতে নিয়ে পড়বার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু বই-এ মন বসাতে পারলে না।
কেমন সুন্দর ছোট্ট গ্রাম্য নদীটি, ওপারে বাঁশবন, আমবন—বহুকালের। ফলের বাগান যেন প্রাচীন অরণ্যে পরিণত হয়েছে। একা এতবড়ো বাড়িতে থাকতে বেশ লাগে। খুব নির্জন, পড়াশোনো করবার পক্ষে কিংবা লেখা-টেখার পক্ষে বেশ জায়গাটি। তাদের পৈতৃক বসতবাটী বটে, তবে কতকাল ধরে তারা কেউ এখানে আসেনি, কেউ বাস করেনি।
রাধামোহনের বাবা শ্যামাকান্ত চক্রবর্তী তাঁর বাল্যবয়সে এ গ্রাম ছেড়ে চলে যান। মেদিনীপুরে তাঁর মামারবাড়ি। সেখানে থেকে লেখাপড়া শিখে মেদিনীপুরে ওকালতি করে বিস্তর অর্থ উপার্জন করেন এবং সেখানে বড়ো বাড়িঘর তৈরি করেন। স্বগ্রামে যে একেবারেই আসেননি তা নয়, তবে সে দু-একবারের জন্যে। এসে বেশি দিন থাকেনওনি। অতবড়ো পসারওয়ালা উকিল, থাকলে তাঁর চলত না।
গ্রামের বাড়িতে জ্ঞাতিভাইরা এতদিন ছিল, তারা সম্প্রতি এখান থেকে উঠে গিয়ে অন্যত্র বাস করছে, কারণ গ্রামে বসে থাকলে আর সংসার চলবার কোনো উপায় হয় না।
