কাকা ভূসিমালের ব্যাবসা করেন। প্রায় চল্লিশ মণ সোনামুগ মেলায় বিক্রির জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন, মণ বারো-না-তেরো কাটাতে পেরেছিলেন, বাকি গোরুরগাড়িতে ফিরে আসছে, কাল সকাল নাগাদ পৌঁছাবে। গাড়িতে আছে আমাদের আড়তের সরকার হরিবিলাস মান্না।
কাকা খেয়ে উঠে যাবার একটু পরেই কাকার ছোটো মেয়ে মনু একটা কলাই করা পেয়ালা রান্নাঘরে নিয়ে এসে বললে, এই দ্যাখো জ্যাঠাইমা, বাবা এনেছেন, কাল আমি এতে চা খাব কিন্তু। হাতে তুলে সকলকে দেখিয়ে বললে–বেশ কেমন, না? মেলায় তিন আনা দরে কেনা—
এই প্রথম আমি দেখলুম পেয়ালাটা।
সে আজ চার বছরের কথা হবে।
তারপর বছর-দুই কেটে গেল। আমি কাজ শিখে এখন টিউবওয়েলের ব্যাবসা করি। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, লোকাল বোর্ডের কাজ সংগ্রহ করবার জন্যে এখানে-ওখানে বড়ো ছুটোছুটি করে বেড়াতে হয়। বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকা আজকাল আর বড়ো ঘটে না।
সেদিন সন্ধ্যার গাড়িতে কলকাতা আসব, আমার বিছানাপত্র বেঁধে রান্নাঘরে চায়ের জন্যে তাগাদা দিতে গিয়েচি—কানে গেল আমার বড়ো ভাইঝি বলচে–ও পেয়ালাটাতে দিও না পিসিমা, বাবা মারা যাওয়ার পর মা ও পেয়ালাটাকে দেখতে পারে না দু-চোখে—
আমি বললুম—কোন পেয়ালাটা রে? কী হয়েচে পেয়ালার?
আমার ভাইঝি পেয়ালা নিয়ে এল, মনে হল কাকার কেনা অনেক দিনের সে পেয়ালাটা।
সে বললে-বউদির অসুখের সময় এই পেয়ালাটা করে দুধ খেতেন, তারপর বাবার সময়ও এতে করে ওঁর মুখে সাবু ঢেলে দেওয়া হত—মা বলে, আমি ওটা দেখতে পারিনে—
আমার এই জ্যাঠতুতো ভাইয়ের স্ত্রী কলকাতা থেকে আমাদের এখানে বেড়াতে এসে অসুখে পড়েন এবং তাতেই মারা যান। এর বছর-দুই পরে কাকাও মারা যান পৃষ্ঠব্রণ রোগে। কিন্তু এর সঙ্গে পেয়ালাটার সম্পর্ক কী? যত সব মেয়েলি কুসংস্কার!
পরের বছর থেকে আমার টিউবওয়েলের কাজ খুব জেঁকে উঠল, জেলা বোর্ডের অনেক কাজ এল আমার হাতে। আমার নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই, দূর দূরান্তের পাড়াগাঁয়ের নানা স্থানে টিউবওয়েল বসানো ও মিস্ত্রি খাটানোর কাজে মহাব্যস্ত—বাকি সময়টুকু যায় আর-বছরের বিলের টাকা আদায়ের তদবিরে।
সংসারেও আমাদের নানা গলযোগ বেধে গেল। কাকা যত দিন ছিলেন কেউ কোনো কথাটি বলতে সাহস করেনি সংসারের পুরোনো ব্যবস্থাগুলির বিরুদ্ধে। এখন সবাই হয়ে দাঁড়াল কর্তা, কেউ কাউকে মেনে চলতে চায় না।
ঠিক এইসময় আমার ছোটো ছেলের ভয়ানক অসুখ হল। আমার আবার সেই সময় কাজের ভিড় খুব বেশি। জেলা বোর্ডের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু টাকার তাগাদা করতে হবে ঠিক এই সময়টাতে। নইলে বিল চাপা পড়তে পারে ছ-মাস বা সাত মাসের জন্যে। আমি আজ জেলা, কাল মহকুমা ছুটোছুটি করে বেড়াতে লাগলুম,—এমেম্বর ওমেম্বরকে ধরি, যাতে আমার বিলের পাওনাটা চুকিয়ে দিতে। তাঁরা সাহায্য করেন।
কাজ মিটিয়ে যখন বাড়ি ফিরলুম, তখন এদিকেও কাজ মিটে গিয়েছে। ছেলেটি মারা গিয়েছে—অবিশ্যি চিকিৎসার ত্রুটি হয়নি কিছু, এই যা সান্ত্বনা।
বছরের শেষে আমি শহরে বাসা করে স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের সেখানে নিয়ে এলাম। বাড়ির ওই সব দুর্ঘটনার পরে সেখানে আমাদের কারুর মন বসে না, তা ছাড়া আমার ব্যাবসা খুব জেঁকে উঠেছে—সর্বদা শহরে না-থাকলে কাজের ক্ষতি হয়।
টিউবওয়েলের ব্যাবসাতে নেমে একটা জিনিস আমার চোখে পড়েছে যে, আমাদের দেশের, বিশেষ করে পাড়াগাঁয়ের লোকদের মতো অলসপ্রকৃতির জীব বুঝি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এত অল্পে সন্তুষ্ট মানুষ কী করে হতে পারে সে যাঁরা এদের সঙ্গে পরিচিত নন, তাঁদের ধারণাতেও আসবে না। নিশ্চিত মৃত্যুকেও এরা পরমনিশ্চিন্তে বরণ করে নেবে, সকল রকম দুঃখদারিদ্র অসুবিধাকে সহ্য করবে কিন্তু তবু দু-পা এগিয়ে যদি এর কোনো প্রতিকার হয় তাতে রাজি হবে না। তবে এদের একটা গুণ দেখেচি, কখনো অভিযোগ করে না এরা, দেশের। বিরুদ্ধেও না, দৈবের বিরুদ্ধেও না।
বাইরে থেকে এদের দেখে যাঁরা বলবেন এরা মরে গিয়েছে, এরা জড় পদার্থমাত্র, ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখলে কিন্তু তাঁরা মত বদলাতে বাধ্য হবেন। এরা মরেনি, বোধ হয় মরবেও না কোনো কালে। এদের জীবনীশক্তি এত অফুরন্ত যে, অহরহ মরণের সঙ্গে যুঝে এবং পদে পদে হেরে গিয়েও দমে যায় না এরা বা ভয় পায়, প্রতিকার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে না। সহজভাবেই সব মেনে নেয়, সব অবস্থা।
খারাপ বিলের পাটপচানো জল খেয়ে কলেরায় গ্রাম উৎসন্ন হয়ে থাকে, তবু এরা টিউবওয়েলের জন্যে একখানা দরখাস্ত কখনো দেবে না বা তদবির করবে। কে অত ছুটোছুটি করে, কেই-বা কষ্ট করে? শুধু একখানা দরখাস্ত করা মাত্র, অনেক সময় দরকার বুঝলে জেলা বোর্ড থেকে বিনা খরচায় টিউবওয়েল বসিয়ে দেয়—কিন্তু ততটুকু হাঙ্গামা করতেও এরা রাজি নয়।
বাসায় একদিন বিকেলে চা খাওয়ার সময়ে লক্ষ করলুম, আমার ছোটো মেয়েটি সেই কলাই-করা পেয়ালাটা করে চা খাচ্ছে।
যদিও ওসব মানিনে, তবুও আমার কী-জানি-কী মনের ভাব হল—চা খাওয়া টাওয়া শেষ হয়ে গেলে পেয়ালাটা চুপি চুপি বাইরে নিয়ে গিয়ে টান মেরে ছুড়ে ফেলে দিলুম পাঁচিলের ওধারের জঙ্গলের মধ্যে।
কাকার বড়ো মেয়েটির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, ছোটো মেয়েটির বয়েস দশ বছর, খুব বুদ্ধিমতী। শহরের মেয়ে-স্কুলে লেখাপড়া শেখাব বলে ওকে বাসায় এনে রেখেছিলুম, স্কুলেও ভর্তি করে দিয়েছিলুম।
