একদিন কী করে খুড়শ্বশুর টের পেলেন লুকিয়ে খাবার আনার ব্যাপারটা। এ নিয়ে খুব ঝগড়া হল বাড়িতে। আমাকে আর ওঁকে যথেষ্ট অপমান গালিগালাজ সহ্য করতে হল।
খুড়শাশুড়ি বললেন—অমন নোলায় সাত ঝাঁটা মারি। লুকিয়ে লুকিয়ে খাবার খেয়ে দোকানটা শেষ করে দিলে গা! এমন অলক্ষ্মী বউ তো কখনো দেখিওনি, শুনিওনি। লজ্জাও করে না গুরুজনকে লুকিয়ে লুকিয়ে খেতে।
স্বামীকে রাত্রে বললাম—আর ওসব এনো না। দ্যাখো তো কী কাণ্ড বাধালে!
স্বামী বললেন—না, আনবে না! আমায় কী মাইনে দেয় কাকা? বিনি মাইনের চাকর করে তো রেখেচে। পেটে দুটো খাব না? ঠিক আনব লুকিয়ে, তুমি দেখো। কেমন করে ধরবে কাকা তা দেখব।
স্বামীর শরীর ভালো নয় অথচ ঘোর পেটুক। আমার কথা শুনতেন না। খাবার চুরি বন্ধ হল না। রোজ রাত্রে একগাদা বাসি লুচি আর রসগোল্লার রস আনেন। নিজে খান, আমাকেও যথেষ্ট দেন। ওঁর পেটের অসুখ ছাড়ে না। আমার বারণ শোনেন না মোটে।
বলেন—খেয়ে যা উঠিয়ে নিতে পারি। কাকা একপয়সা উপুড়-হাত করবে না।
আমি বললাম—আমি বাপেরবাড়ি যাব আষাঢ় মাসে, আমায় নতুন কাপড় কিনে দেবে না?
উনি ঠোঁট উলটে বললেন—কে দেবে? কাকা? তা দেখে আর বাঁচলাম না!
—সত্যি আমার নতুন কাপড় হবে না? বাপেরবাড়িতে কিন্তু সবাই নিন্দে করবে।
—যদি আমি দিতে পারতাম, সব হত। আমার কী ইচ্ছে করে না তোমায় কাপড় দিতে? কোথায় পাব?–
তাই তো। অনেকের নিন্দে শুনতে হবে তাই ভাবছি।
আষাঢ় মাসে বাপেরবাড়ি এলাম। স্বামীও আমার সঙ্গে এলেন। তাঁকে দেখে গ্রামের সমবয়সি মেয়েরা নানারকম নিন্দাবাদ করতে লাগল।
আমায় একদিন রায়বাড়ির মেজোগিন্নি বললেন—হ্যাঁ পাঁচী, জামাই নাকি তাড়ঘোঁটে ময়রার দোকানে?
আমি অতশত বুঝিনে, বললাম—হ্যাঁ। খুব ভালো খাজা তৈরি করে। সবাই হাতের সুখ্যাতি করে মাসিমা।
মেজোগিন্নি হেসেই খুন! তাঁর বড়ো পুত্রবধূ যে বাপেরবাড়ি থেকে আসতে চায়, বাপের বাড়ির গ্রামে কোন প্রতিবেশী ছেলের সঙ্গে প্রণয়াসক্ত, এসব কথা। তিনি তখন ভুলে গেলেন। আমার স্বামীর খাবারের দোকানে কাজটাই প্রবল দোষের ও নিন্দের কারণ হয়ে উঠল তাঁর কাছে। আমার স্বামীকে গ্রামের লোকে নতুন জামাই বলে খাতির আদর করলে না। আমার তাতে মনে বড় দুঃখ হল। নতুন জামাইকে সকলে নেমন্তন্ন করে খাওয়ায়, আমার স্বামীকে সবাই যেন কেমন হেনস্থা করলে।
নসুমামা ঠিক তেমনি ভাত রাঁধচে। আমি তার ওখানে গিয়ে গল্প করে একটু যা আনন্দ পেতাম। একটা জিনিস দেখলাম, নসু ধর্মে-কর্মে মন দিয়েছে এই বয়সেই। চন্দন ঘষচে দেখে বললাম—দিদিমা পুজো করেন বুঝি আজকাল? নসু হেসে বললে—মা নয়। পুজো করব আমি। রোজ শিব গড়িয়ে পুজো করি। মানুষ হয়ে জন্মে শুধু খেয়ে যাব শুয়োরের মতো!
আমার হাসি পেল ওর মুখে তত্বকথা শুনে। নসুমামা আমাকে শসা কেটে খেতে দিল, নিজেই নারকেলের নাড় করেচে ঘরে, তা দিলে, চা খেতে দিলে।
বছর দুই-তিন কাটল। আমার স্বামীর শরীর সারল না। ক্রমেই যেন আরও খারাপ হয়ে উঠছে। শাশুড়ি ও খুড়শাশুড়ি বলেন—ওই অলক্ষুণে বউ এসে বাছার শরীর একদিনও ভালো গেল না।
শাশুড়ি বললেন—সংসারের কোনো জিনিসে আট নেই তা দেখেছ লক্ষ করে? কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়, এ আমিও স্বীকার করচি। সত্যিই যেন আমার কোনো জিনিসে কোনো আসক্তি নেই। ভালো কাপড় নয়, গহনা নয়—কোনো কিছুতে না। আমার স্বামী বলেন–পয়সা জমাও না কেন? যা মাঝে মাঝে হাতে
এনে দিই, জমিও। তোমার আখেরে ভালো হবে।
ওসব কথা আমি শুনেও শুনিনি কোনোদিন। কার আখেরে কী হবে সে ভেবে ফল কী!
আমার একটি ছেলে হল, কয়েক মাস পরে মারাও গেল। স্বামীর অসুখ সারে। সংসারে খেটেই মরি, মুখের মিষ্টি কথা কেউ বলে না। স্বামী আমায় নানারকম সাংসারিক উপদেশ দেন। তাঁর যেরকম শরীর, কবে মরে যাবেন, তখন কী উপায় হবে? আমি যেন কিছু কিছু হাতে রাখি। এ কথা আমি যখন শুনি তখনই মনে থাকে, তারপর আর মনে থাকে না।
সেই মাঘ মাসে আমি বাপেরবাড়ি এলাম। গ্রামে এসে শুনি নসুমামার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, সে দিনরাত পুজোআচ্চা নিয়ে থাকে, কারো সঙ্গে কথা বলে না, কি রকম যেন। আমি গিয়ে দেখা করলাম বিকেলের দিকে। নসুমামা বললে— কী খবর পাঁচী, কখন এলি?
—কাল এসেছি। ভালো আছ?
—ভালো আছি। খুব আনন্দে আছি।
—সবাই তোমাকে পাগল বলচে যে?
নসুমামা মৃদু হেসে চুপ করে রইল। তারপর আমার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে বললে—আমি আসল বস্তু পাওয়ার চেষ্টায় আছি। এতে যে-যা বলে বলুক। আমি পাগলই হই আর ছাগলই হই—হি-হি-হি-হি হ্যাঁরে পাঁচী?
শেষের কথাগুলো আমার কানে একটু অসংলগ্ন-মতো ঠেকলেও নসুমামার ওপর আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। কী যেন একটা ওর মধ্যে আমি পেলাম, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখিনি। ওর মুখের চেহারা যেন অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। লোকে টাকাকড়ি ঘর-জমি আঁকড়ে পড়ে আছে দেখছি আমার চারিপাশে, খুড়শাশুড়িকে দেখেছি গাছের সামান্য একটা আম যদি গাছের তলা থেকে কোনোবাড়ির ছেলে কুড়িয়ে নিয়ে যায় তবে ঝগড়া করে পাড়া মাত করেন। গাঁয়ের মধ্যে দেখেচি এক হাত জমি হয়তো এগিয়ে বেড়া দিয়েছে কেউ, তাই নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা দু-তিন বছর ধরে চলেচে। এমন আবহাওয়ার মধ্যে নসুমামা মানুষ হয়েও স্বতন্ত্র, ওর কাপড়েচোপড়ে, খাওয়ায়, বিষয়-আশয়ে কোনো আসক্তি নেই; পৈতৃক বিষয় আছে, কিন্তু ভায়েদের দিয়ে বসে আছে সর্বস্ব, একটা পয়সাও চায় না।
