বাবা কোথায় কাদের আড়াতে কাজ করতেন। সামান্য ক-টি টাকা মাইনে পেতেন, দিদিমার সঙ্গে সংসারের খরচপত্র নিয়ে তাঁর প্রায়ই ঝগড়া-তর্ক হত। বাবা রাগ করে চলে যেতেন বাড়ি থেকে, দু-একমাস কোনো খবর আসত না, মা কান্নাকাটি করতেন, হঠাৎ বাবা একদিন এসে হাজির হতেন। দিন এভাবেই চলত।
তেরো বছর বয়সে আমার বিয়ে হল আড়ংঘাটার কাছে এক গ্রামে। বিয়ের দিনকতক আগে নসুদের বাড়ি গিয়েছিলাম। নসুর মার শরীর খারাপ, নসু রান্নাঘরে ভাত রাঁধছে। উনুনের আঁচে ওর ফর্সা মুখ রাঙা হয়ে গিয়েছে। ওদের বাড়ির কোনো বিলিব্যবস্থা নেই। অনেকগুলো ভাই নসুর। তারা কেউ বাইরে পড়ে, কেউ কাজ করে। নসুর মার শরীর চিররুগণ, সংসারের রান্নাবান্নার ভার নসুমামার উপর। আজ অনেকদিন থেকেই নসুর এই অবস্থা দেখছি।
নসুর অবস্থা দেখে সত্যিই কষ্ট হল। নসুর মুখের দিকে চাইবার কেউ নেই, ভাইয়েরা সব স্বার্থপর, সংসার চালানোর ভার ওর ওপর ফেলে দিয়ে সবাই তারা নিশ্চিন্ত হয়ে আছে।
নসুমামা আমায় দেখে হেসে বললে—আয় পাঁচী, বোস। কাল দই পেতেছিলাম, দইটা বসেনি। উনুনের পাড়ে রেখে দেব, কী বলিস?
যত সব মেয়েলি গল্প নসুর। সাধে কী ওকে সকলে বলে জনার্দন মুখুজ্যের বিধবা মেয়ে?
আমায় বললে—কাল বুঝলি, এক কাঠা মুগের ডাল ভাজলাম, ভাঙলাম। বেলা গেল ডালডুল করতে। গা-হাত-পা ব্যথা।
বললাম—তুমি ডাল ভাজলে? সত্যি?
—হ্যাঁরে। নইলে কে করবে? আবার কাল একগাদা ময়লা কাপড় সোডাসাবান দিয়ে সেদ্ধ করতে হবে।
দুঃখিত সুরে বললাম—ওসব মেয়েলি কাজ। তুমি ওসব করো কেন? আমায় ডাকলে না কেন? আমি ডাল ভেজে দিতাম।
নসু বললে—আহা! আমি না-পারি কী? তোকে আবার ডাকতে যাব কেন?
—লেখাপড়া করবে না নসুমামা? এসব কাজ কী তোমার সাজে? পুরুষমানুষ, লেখাপড়া করো।
—আমায় কে পড়াবে? দাদারা এক পয়সা দেবে না। তা ছাড়া মার শরীর খারাপ, আমি বাড়ি থেকে গেলে রান্নাবান্না কে করে বল। পড়বার খরচ জুটলেও আমার পড়া হত না।
আমি বসে বসে ওর কুটনো কুটে দিলাম। আমার বিয়ে কথা বললাম। নসুমামা বিশেষ কোনো আগ্রহ প্রকাশ করলে না। ও যদি একটুও আগ্রহ প্রকাশ করত, শুনত কোথায় আমার বিয়ে হচ্চে ইত্যাদি, তাহলে আমার ভালো লাগত। কিন্তু নাঃ, সে সুখ আমার অদৃষ্টে নেই। নসুমামা একটা কথাও জিজ্ঞেস করলে না সে সম্বন্ধে।
আমার বিয়ের রাত্রে নসু নেমন্তন্ন খেয়ে এল পেটপুরে, কিন্তু না-এল একবার বিয়ে দেখতে, না-একবার বাসরঘরে উঁকি মেরে দেখলে। আমার মনটা যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা, ও যদি আসত তবে খুব ভালো লাগত। মনের মধ্যে ডুব দেবার সময় আমার নয় তখন, তবুও কী যেন একটা হয়ে গেল, এত বাজনা, এত খাবার দাবার, এত লোকজনের যাতায়াত, আমার নতুন কাপড় গয়না—কিছুই ভালো লাগল না। মনে উৎসাহ নেই।
আগেই বলেছি আমার বিয়ে হয়েছিল আড়ংঘাটার কাছে শিকারপুরে। স্বামীর বয়সও সতেরো-আঠারোর বেশি নয়, রোগা চেহারা, মাথার চুল-ওঠা। বিয়ের পরে জানা গেল স্বামী ম্যালেরিয়ার পুরোনো রোগী। মাসে দু-বার ম্যালেরিয়া জ্বর বাঁধা আছেই। আড়ংঘাটার যুগলকিশোর ঠাকুরের মেলার সময় ময়রার দোকান খোলেন আমার খুড়শ্বশুর, স্বামী তাড় দিয়ে সন্দেশ-মুড়কি ভিয়েন করেন।
শ্বশুরবাড়িতে যাবার সময় মনে খানিকটা কৌতূহল নিয়ে যে না-গিয়েছিলাম এমন নয়। না-জানি কেমন বাড়ি-ঘর, কেমন খাওয়া-দাওয়া। গিয়ে দেখি, পুরোনো আমলের ইটবের-করা কোঠাবাড়ি, দুটিমাত্র ঘর, ছোটো একটা বারান্দা, তবে সব ঘরগুলির সামনে সান-বাঁধানো টানা রোয়াক এবং রান্নাঘরটিও কোঠা। খুব বড়ো একটা আমগাছ সমস্ত বাড়ির উঠোনজুড়ে ঘুপসি করে রেখেছে।
আমার শাশুড়ি গর্বের সুরে বললেন—আমের সময় তো আসছে, দেখো বউমা। এমন আম এ অঞ্চলে নেই আমার বাগানে যা আছে, ডাকসাইটে বাগান, কর্তা করে রেখে গিয়েছিলেন, ইস্তক গোয়াড়ি, ইস্তক শান্তিপুর, কোথা থেকে কলমের চারা এনে না-পুঁতেচেন!
আমের সময় এল, কোথা থেকে ব্যাপারীরা এসে বাগান কিনে নিলে। দু-এক ঝুড়ি আম যা আমাদের বাড়ি এল, তা থেকে দুটো-একটা জুটল আমার ভাগ্যে। শাশুড়ি নিতান্ত বাজে কথা বলেননি, আম ভালো।
স্বামীর সঙ্গে আলাপ জমল মন্দ নয়। ক্রমে তাঁকে ভালোও লাগল।
আমায় বল্লেন—তুমি কী খেতে ভালোবাসো?
আমি লজ্জা-টজ্জার ধার ধারিনে, বলে ফেললাম—তেলেভাজা খাবার।
স্বামী বললেন—দূর! অমন বোকা মেয়ে কেন? ভালো খাবারের নাম করো।
—গজা। জিলিপি।
–কেন খাজা?
—সে আবার কী গা? আমাদের গাঁয়ে শুনিনি তো।
উনি হো-হো করে হেসে বললেন—পাড়াগেঁয়ে ভূত! আমাদের এ শহর বাজার জায়গা। কাল খাজা আনব লুকিয়ে। কিন্তু সাবধান, মা যেন টের না-পায়। বকবে। আমি নিজে খাজা ভিয়েন করি।
সেই থেকে মাঝে মাঝে স্বামী লুকিয়ে লুকিয়ে খাবার আনেন। কোনোদিন খাজা, কোনোদিন মিহিদানা। আমরা দুজনে লুকিয়ে খাই। স্বামী বলেন—সবাইকে দিতে গেলে চলে না। খুড়তুতো ভাইয়েরা হাঁসের পাল, সবার মুখে দিতে গেলে তোমার আমার মুখে একটুকরো উঠবে কিনা উঠবে।
শ্বশুরবাড়ি ভালো লাগল না বটে, তবে স্বামীকে কিছুটা ভালো লাগল এই খাবার খাওয়া থেকে। উলোর জাতের মতো বড়ো মেলা এ অঞ্চলে নেই, সে-সময় ময়রার দোকানে কাজ বেশি। উনি ফেরেন অনেক রাতে। হাতে বড়ো বড়ো ঠোঙায় খাবার ভর্তি। উনি হেসে বলতেন—খাও, খাও, খুব খাও—এসো দুজনে পেট ভরে খাই।
