দাদা যদি প্রচণ্ড রাগারাগি করত, ফেটে পড়ত, সে একরকম হত। কিন্তু আজ দাদা অসহ্য গম্ভীর, যেন একটা অন্ধকার, দুর্ভেদ্য পাহাড়ের মতো। আমার ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এইটাই আসল বোঝ। আমি স্পষ্ট বুঝি।
কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল প্রচণ্ড ব্যস্ততা। রেজিগনেশন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পাসপোর্ট, ভিসা, কেনাকাটা। সে এক হুলুটথুলুট কাণ্ড। এরই মধ্যে মায়েতে ছেলেতে চলেছে দড়ি টানাটানি। মা-ও কিছুতে যাবে না। ছেলেও কিছুতেই তাকে ছাড়বে না। মা বলল, আমি নিজের মতো থাকব পোস্টঅফিসের টাকাটার সুদেই আমার চলে যাবে। হঠাৎ কোনো দমকা খরচ হলে তুই তো রইলিই। আমাকে আর টানাটানি করিস না।
দাদা বলল, আমাদের ছেড়ে, টুটুলকে ছেড়ে তুমি থাকতে পারবে?
খুব কষ্ট হবে, কিন্তু পারব।
খুব কষ্ট হবে! তা সেই খুব কষ্টটা করবে কেন শুধু শুধু? এত জেদ কীসের? এত জেদ ভালো নয় মা। আচ্ছা, তুমি না হয় পারলে। টুটুল! টুটুল পারবে?
এতক্ষণে মায়ের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। শিশুর মায়া বড়ো মায়া! মা ধরা গলায় বলল, বাড়ন্ত বাচ্চা, ভুলতে দেরি হবে না দেখিস!
ভোলবার আগেই যদি মনের কষ্টে ওর কঠিন কিছু হয়?
শিউরে উঠে মা টুটুলকে বুকে টেনে নিল।
আর এই মুহূর্তে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া টুটুলটা তার পাকা কথার ঝুড়িটা নামিয়ে দিল। মাকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠল, দিদু, ও দিদু তোমাকে ছেড়ে আমি বাঁচব না!
কোথা থেকে যে এসব কথা শেখে এরা! কিন্তু ও তো শুধু পাকা কথাটা নলেই ক্ষান্ত হয়নি, ফুপিরে ফুঁপিয়ে হৃদয়বিদায়ক কান্নাও কাঁদছে। অতএব মায়েরও পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট হয়, ওদের লাগেজের সঙ্গে মায়ের লাগেজও যোগ হয়। তারপর একদিন রাত নটা নাগাদ শক্ত করে টুটুলের হাত মুঠোয় নিয়ে একখানা টাটা সুমোয় উঠে যায় মা। দাঁতে দাঁত চেপে, ঠোঁটে ঠোঁটে চেপে। একবারও পেছন ফিরে তাকায় না। বউদিই বরং দেখি চোখ মুছছে, আবার জল পড়ছে আবার মুছছে। দাদার মুখটা কঠিন, কিন্তু শোকার্ত। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের প্লেনটা উড়ে যায়।
চিৎকার করে উঠতে চাই। কিন্তু ওরা কি শুনতে পাবে? মূৰ্ছিত হয়ে পড়ি—ওরা দেখতে পায় না। যাক, তবে চলেই যাক। দেয়ালে দেয়ালে ছাতলা জমুক, মেঝেতে পুরু ধুলোর আস্তরণ। পোকামাকড় আরশোলা ছুঁচো ইঁদুরের নিরঙ্কুশ রাজত্ব হোক ওদের সুখের সংসার।
বারান্দা দিয়ে এখনও দেখতে পাই। রবীন্দ্রসরোবরে স্টেডিয়ামের ট্র্যাকে দৌড়োচ্ছে দলের পর দল খেলাপাগল কিশোর। সবুজের ছাপের ওপর খালি গায়ে ফুটবলে শট মারছে, ধবধবে পোশাকে কেতাদুরস্ত ক্রিকেট শানাচ্ছে। কবাড়ি খেলছে। লেকের জলে গ্রীষ্ম-বিকেলের পড়ন্ত আলোয় শুরু হচ্ছে রোয়িং, ওদের মধ্যে টুটুলকে কোনোদিন দেখতে পাব কি? ঘোর এপ্রিলে লাল হয়ে ফোটে কৃষ্ণচূড়া, রঙ্গন। রাংচিতার পাতায় আলো ঝলকায়, শীতভর ফুটতে থাকে মরশুমি ফুল। রাত জমিয়ে জলসা হয়, দূরের বেতারে ভেসে আসে নতুন গায়কের নতুন গান, পুরোনো গায়কের মন কেমন-করা পুরোনো গান, হয়ে যেতে থাকে বইমেলা, শিল্পপ্রদর্শনী। আর সারাবছর ধরে খিরিশ গাছ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে সবুজ বিদ্যুৎরেখা ঝলসে, আপিসে বেরোয়, আপিস থেকে ফেরে স্বদেশি টিয়ার ঝাঁক। দেখতে পাবে না। শুনতে পাবে না মা, দাদা, বউদি।
ঝুল জমেছে সিলিংয়ের কোণে কোণে। মাকড়সারা অদ্ভুত চতুরালি দেখিয়ে জাল বুনছে, পোকা ধরছে, চুষে ছিবড়ে করে ফেলে দিচ্ছে। শুকনো পোকা আর নধর মাকড়সায় ক্রমে ভরে যায় সারা সংসার। কেউ নেই যে সে ঝুল ঝাড়বে, কেউ নেই যে কীটনাশক ছেটাবে।
তারপরে একদিন গুড়গুড় করে মেঘ ডাকতে থাকে। কালি নীলে ঢেকে যায় আকাশরেখা, প্রলয়ংকর ঝড় ওঠে। দড়াম দড়াম করে আছাড় খেতে থাকে বড়ো বড়ো গাছ। এগারো তলার ওপরেও শুনি সমুদ্রের হুহুংকার। দানব-হাওয়া ধাক্কা দিতে থাকে। দমাদ্দম শিলাবৃষ্টি হয়, আর শিলার ঘায়ে হুড়মুড়হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে থাকে জানলার বারান্দার কাচ। বাস, আর বাধা কী? পরিত্যক্ত বাড়ি। বাইরের ঝড় নির্বিবাদে ঢুকে পড়ে অন্দরে। তাণ্ডব চলতে থাকে। মিছিলের ডাক, লাঠিচার্জ গুলির আওয়াজ উজাড় হয়ে যাচ্ছে নিঃস্ব মানুষ। জলে বিষ, আলো নেই, ভাইরাসের পর ভাইরাস আক্রমণ করতে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে, এ. সি ঘরে চিংড়ি মালাইকারি আর রেশমি কাবাব, কুলচা আর কুলপির মিটিং, নতুন নতুন দুর্ঘটনা, নতুন নতুন ক্ষতিপূরণ, নতুন নতুন কর। রাজার তোষাখানার কৃষ্ণগহ্বর মরণটানে টেনে নেয় সব, চিহ্ন রাখে না। শুয়ে থাকি। কাদায়, জলে, রক্তে, ক্লেদে থাবা রেখে শুয়ে থাকি। কত দিন, কত মাস, বছর যায়। মাঝে মাঝে ঝনঝন করে ফোন বেজে ওঠে। ওরা কি ফিরছে? ওরা কি আমার খবর নিচ্ছে? নাঃ, এ রং নাম্বার। তারপরে একদিন দরজার বেল বাজে। কে এসেছ ভুল করে। এ ঠিকানায় কেউ থাকে না। কেন আমাকে বিরক্ত করো? কী আশ্চর্য! দেখি আস্তে আস্তে শব্দ করে খুলে যাচ্ছে দরজা। আমার রোঁয়া ফুলে উঠেছে, গায়ে কাঁটা, বুঝি নির্ভুল আঙুলে সুইচ টিপছে কেউ। বাতি জ্বলে ওঠে, ঝুল-জমা, ঝাপসা আলো। সেই আলোয় দেখি—বিকৃতদেহ দীনহীন ভিখারি এক। ক্লান্ত, বৃদ্ধ, যেন কত দেশান্তর, কত বিপর্যয়ের সমুদ্র পেরিয়ে এল, প্রত্যাশায় আকুল চোখ-ধুলো ময়লা, আবর্জনা সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। একটার পর একটা দরজা খোলে, জানলা খোলে। আমি ফিসফিস করে বলি, বড্ড দেরি করে ফেলেছ বাবা, বড্ড। তোমার যদি এতদিনে সময় হল, এদের সময় ফুরিয়ে গেছে। এখানে আর কেউ তোমায় চিনতে পারবে না। ফিরে যাও যে সমুদ্দুর থেকে এসেছিলে সেইখানে। কিংবা এসো, এই ধবংসস্তূপে, এই সর্বনাশে, তুমি আর আমি, আমি আর তুমি ওতপ্রোত হয়ে শুয়ে থাকি।
একটা ছোটো মেয়ে
লোকে বলে আমি একটা ছোটো মেয়ে। এ তো বাচ্চা! এইভাবে বলে, কিন্তু আমি জানি আমি মোটেই বাচ্চাটাচ্চা নই। বারো ক্লাসে উঠলুম। সতেরো বছর বয়স হল—আবার বাচ্চা কী? আসলে আমি বেঁটে, চায় ফুট সাড়ে দশ ইঞ্চি মোটে হাইট। মোটাসোটা নই। তাই আমাকে ছোটো লাগে। আমার বন্ধু দেবলীনার মা বলছিলেন, হঠাৎ দেখলে তোকে লীনাদের থেকে অনেক ছোটো দেখায়, কিন্তু মুখটা ভালো করে দেখলেই যে কেউ বুঝবে।
