আস্তে আস্তে মা শান্ত হয়ে গেল। সমস্ত কর্তব্য করে যায় নিখুঁতভাবে। কিন্তু মনটার নাগাল আর কেউ পেল না। এত লোক আসে এত লোক যায়, মায়ের মনে কোনো দাগ পড়ে না। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা বলল, ভুলে যাও তাকে। অনেকে বলল সে নিশ্চয় প্রতিরক্ষার কিছু গোপন ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছে। আর তাকে আসতে দেবে না। একটা বিশাল শক্তিশালী দেশ, নিয়তির মতো। কঠিন দেয়াল এক। সে দেয়ালে মাথা ঠুকেও মা কিছু পেল না। মায়ের এখন একমাত্র দুর্বলতা ছেলে। ছেলেকে নিয়েই বেঁচে আছে মা। আঁকড়ে থাকেনি কোনোদিন। দাদা যেমন ইচ্ছে পড়াশোনা করেছে, চাকরি নিয়েছে, যেমন ইচ্ছে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মিশেছে। কিছুতেই বাধা দেওয়া নেই। খালি ওই একটা নিষেধ। বিদেশ যাবে না। ইউরোপ হোক, অস্ট্রেলিয়া হোক, কোথাও না। আর মার্কিন দেশ! নাম শুনলেই মায়ের মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে যায়।
দাদা বিয়েও তো করল নিজের পছন্দে। এসব নিয়ে সাধারণত কত মনকষাকষি হয়ে থাকে। সেসব কিছু হল না। বউদি মানুষটাও কপালগুণে বুঝদার। তবে হাসিখুশি, উচ্ছল, মায়ের ঠিক উলটো।
প্রথম প্রথম বউদিকে খুব অপ্রতিভ হতে দেখেছি। মার কি আমাকে পছন্দ হয়নি?—দাদাকে জিজ্ঞেস করেছে।
দূর, দাদা বলেছে,–মায়ের কথা তো তোমাকে বলেইছি। তুমি তোমার মতো থাকবে। কিন্তু, বললেই কি আর তা পারা যায়। কোনো কারণে খিলখিল করে হেসে উঠেই বউদি
থতমত খেয়ে চুপ করে যেত। যেন কত অপরাধী!
একদিন মা আর বউদি খেতে বসেছে, মা হঠাৎ বলল, মিতা তোমার কি শরীর খারাপ?
না তো!
তবে মন খারাপ?
না মা।
আমাদের মা-ছেলের সংসারে কোনো সুর ছিল না। রং ছিল না মিতা। তুমি সেই রং আর সুর এনেছ। তোমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব নেই?
আছে তো!
তো তাদের একদিন ডাকো না, খাওয়াও, আড্ডা জমাও, হাসি-গান হইহল্লা।
মা সেদিন নিজে হাতে খাবারদাবার করল। বউদি ঘর গুছোল, ফুলটুল সাজাল। সেদিন দেখলাম, মা কত সহজে সব করছে। আড়ালেও থাকল না, ওদের মাঝমধ্যিখানেও রইল না, কিন্তু দেখলাম—কিছুই ভোলেনি মা, হাসি, গল্প, গান কিছু না।
বন্ধুরা তো উচ্ছসিত! সবাই চলে যেতে বউদি হঠাৎ মায়ের ঘরে এসে তার কোলে মাথা রাখল, দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল, কোথায় এতদিন লুকিয়েছিলে মা!
বউদির চুলে হাত বুলিয়ে মা বলল, আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলেদেখতে আমি পাইনি…
তারপর ধীরে ধীরে এদের বাড়ির স্বভাবে একটা পরিবর্তন এল। মা-ও যেমন একটু খোলামেলা, হাসিখুশি হল, বউদিও রইল না আর অতটা হুল্লোড়ে। চমৎকার একটা ভারসাম্য আপনা থেকেই এসে গেল সংসারে। আর টুটুল আসতে তো সব কিছুই অন্যরকম। টুটুলের সঙ্গে মায়ের যত খেলা, যত গল্প-বলা, যত গান, যতেক আহ্লাদ। বাবা একেবারে হারিয়ে গেল।
জুন মাসের সেই শুক্রবারটা? উঃ! স্পষ্ট মনে পড়ে। দাদা যেমন বেরিয়ে যায়, গিয়েছিল। বউদি যেমন বাজার-হাট-ছেলের স্কুলের জন্যে বেরোয়, বেরিয়েছিল। অতিরিক্তের মধ্যে মা সেদিন দশটা সাড়ে-দশটা বাজতেই বাইরের পোশাক পরে ফিটফাট হয়ে গেল, ব্যাগের মধ্যে কীসব কাগজপত্র ভরল, থলির মধ্যে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে গেল। মা যে একেবারে বেরোয় না তা নয়। বাজারেও যায়। দরকার হলে টুটুলকে আনতেও যায়। কিন্তু নিয়মিত নয়। সেদিন মা টিপটপ চুল বেঁধে, হাতে ব্যাগ, যেন অফিস যাচ্ছে।
তখন সন্ধে পেরোব পেরোব করছে, মা ফিরল। মুখ-চোখ ক্লান্ত। হতেই পারে, যা গরম! বউদিও তাই বলল, মা তোমার রোদ লেগে যায়নি তো।
মাথা নাড়ল মা। কাপড় বদলাল না। মুখ হাত ধুতে যেন ভুলে গেছে। নিজের ঘরেই বসেই রইল—ভূতের মতো।
বোমটা ফাটল রাত্তিরবেলায়। দাদা অফিস থেকে এসে সোজা মায়ের ঘরে।
এখনও এমনি করে বসে! মা তোমার টাকাটা কি ছিনতাই টিনতাই হয়ে গেল নাকি?
এফ. ডি. টা তুলতেই তো গিয়েছিলে?—বউদি জিজ্ঞেস করল।
মা নিশ্বাস ফেলে ক্লান্ত গলায় বলল, সারা দুপুরটা বড্ড হয়রান হয়েছি রে। একবার বলে আগাম নোটিশ দিতে হবে, দিয়েছি বলে তার কপি দেখালে বলে আমাদের ফাইলে তো পাচ্ছি না, তারপরে বলে হলুদ ফর্ম লাগবে একটা, এখন নেই। পরে আসুন। আবার বলে, ওটা অটোম্যাটিক্যালি আবার ফিক্সড হয়ে গেছে। শেষকালে একজন হঠাৎ বলে উঠল—এতগুলো টাকা তো পাচ্ছেন মাসিমা, সবটা একা খাবেন? বোনপোদের একটু খাওয়াবেন না? তারপর অনেকে মিলে শুরু করল, মাসিমা কত ভালো, কত ধনী, কত উদার, ঈশ্বরের একেবারে কাছের লোক —এই করে হাজার পাঁচেক টাকা নিয়ে নিল।
পাঁচ হাজার। তুমি দিলে?
মা বলল, টাকাটা তো গেলই। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা ভদ্রলোকের ছেলে সব, অমন একটা জায়গায় কাজ করছে যখন শিক্ষা-টিক্ষাও আছে, পরিষ্কার জামাকাপড় পরা স্বাভাবিক দেখতে। কিন্তু আমাকে যখন ঘিরে ধরেছিল, মনে হচ্ছিল একদল নেকড়ে আমার ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে। হিংস্র নখদাঁতগুলো যেন আস্তিনের তলায়, ঠোঁটের পেছনে লুকিয়ে রেখেছিল, ক্রমশই কাছে ঘেঁষে ঘেঁষে আসছিল, মাসিমা-মাসিমা করে। টাকার জন্যে এক্ষুনি যেন আমার গায়ে হাত বুলোতে শুরু করবে। খোকন, ঘেন্নায় আমি যে প্যাকেটটা হাতে উঠেছে দিয়ে এসেছি। আমার কেমন গা ছমছম করছে।
দাদা শান্তভাবে বলল, তোমার আজ করছে। আমার অনেক দিন ধরেই করছে। মা। যে কোনোদিন দেখবে এখানে মাস মাইনেটা নিতে গেলেও ঘুষ দিতে হচ্ছে। হয়তো তুমি ঠিকই বলো। সবাই এমন নয়, কিছু কিছু। কিন্তু এই কিছু কিছু-ই সব কন্ট্রোল করছে।
