কী ভেবে জরিনা জানতে চায়, সন্ধ্যারও পর?
হয়। এই জায়গায় থাকপো। সন্ধ্যার পর আসো না এদিক।
যাব কোয়ানে, এই এলাকায়ই তো থাহি। আর যাব কোয়ানে? এরপরই সে বলে, পান। খাওয়াবা না?” তারপর দ্রুত রাস্তার উলটো পাশের পানের দোকান থেকে এক খিলি পান নিয়ে দিলদারকে বলে, দাম দিয়ে দিও, গেলাম। কাজ আছে।
জরিনা দ্রুত হেঁটে ছাপড়ার সামনে এসে দেখে, ঝিলিক নেই। হয়তো এতক্ষণ ধরে জরিনার অপেক্ষায় বসে থেকে থেকে কোথাও চলে গেছে। সেই সকালের পর তার পেটে কিছু পড়েনি, সুকুমার এসে একবার খোঁজ নেয়নি, কতক্ষণ একজন জ্বরের মানুষের মাথার কাছে হাত পা-গুঁজে বসে থাকতে পারে। বৃষ্টির আর বাদলের জন্যে নদীতে জোয়ার ভাটা প্রায় নেই। নদীর বুকে অথই জল। অন্য দিন হলে একবার ভাটা হয়ে আবার জোয়ারে নদী ভরে যেত। জরিনা গেছিল তাওবা কম সময়। এতক্ষণ এখানে না-থাকলে ঝিলিককে সে দোষ দেয় কী করে?
কিন্তু ঝিলিকও তো গিয়েছিল সুকুমারকে খুঁজতে। জরিনা এখান থেকে যাওয়ার পর যখন আর আসে না, তখন ঝিলিকের কেন যেন মনে হয়, কোথায় গেল লোকটা? একবার বলেছিল, যদি কোর্টের সামনের অবস্থা এমন হয়, তাহলে হয় রেল স্টেশনে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে। তা যদি যায়, তাহলে তো তার মাল-সামান নেবে আলতাফের হোটেল থেকে। এইসব ভেবে ঝিলিক আলতাফের হোটেলেই যায়। আলতাফের আজ মন খারাপ। নদীতে লঞ্চ চলাচল কম। মোংলা পোর্টে নাকি সিগন্যাল দিয়েছে। তাই দক্ষিণ আর পুব থেকে শহরে লঞ্চ ভিড়েছে কম। কোর্টেও তো লোকজন তেমন নেই। লোক না থাকলে তার হোটেলে ভাত খেতে আসবে কে? শহরের মানুষ তো আলতাফের হোটেলে খেতে আসে না। ঝিলিক আলতাফের কাছে জানতে চেয়েছে, সুকুমারকে দেখেছে কি না? আলতাফ দেখেনি। আলতাফের অবশ্য এই কথা বলায় কোনও ভুল নেই। সুকুমার যখন এখন থেকে গিয়ে, পাশের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠেছিল, তখন আলতাফ দোকানের সামনে ছিল না। পিছনের রান্না ঘরের বাবুর্চিকে বলতে গিয়েছিল ভাত যেন কম চড়ায়। তরকারিও একটু কম কাটুক। মাছ-মাংস তো রান্না হলে জ্বাল দিয়ে রাখা যাবে। তারপর যা থাকবে তা মেশানো যাবে আগের দিনের ঝোলে। এ তো সব সময়ই করে। প্রতিদিনই রাতে কিছু তরকারি বাঁচে, তা আগের দিনেরটার সঙ্গে মিশায়। আর ভাজা মাছ হলে আবার ভেজে রাখে। তারপর নতুন আর পুরনো ভাজা মাছ এক করে। কয়জন খদ্দের তা বুঝতে পারে? খাওয়ানোর কত পদের কায়দা আছে। একবার ধরে বেঁধে আঁট করে বসাতে পারলে হল। তারপর এটা খান এই দাম। ঠিক আছে কম নেওয়া যাবে। ওটা খান, এই দাম, কম নেওয়া যাবে। একসঙ্গে দুইখানা খান, আরও কম। একটা বেলে আর একটা টেংরা খান। টেংরাটা ফ্রি। আসলে টেংরাটা দিন দুইয়েক আগের। কড়কড়ে ভাজা। বোঝার কোনও উপায় নেই, দুই দিনে কতবার এই টেংরা তেলের চুবনি খেয়েছে। আজকের বেলে মাছের সঙ্গে গছিয়ে দিতে পারলে হল। দেড় গুণ দাম তো পাওয়া গেল।
সামনে একটু উঁচু টেবিল মতন জায়গায় সাজানো ভাজা মাছের সামনে দাঁড়িয়ে আলতাফ ঝিলিককে জানিয়েছে, সে সুকুমারকে দেখেনি। ওদিকে ভাজা মাছের ঘ্রাণ। সঙ্গে ঘন মশলা মাছ মিলে যে এক অদ্ভুদ বাহারি স্বাদ তৈরি হয়, ঝিলিক তা ভেবে নিতে পারল। কতদিন এই সব মাছ দিয়ে যেন ভরপেট ভাত খায় না। যদিও নাগের বাজারের মাঝি ঘাটায় মতির হোটেলে সে আর সুকুমার ছোটো গুলশা টেংরা দিয়ে ভাত খেয়েছে গত পরশু। কিন্তু এইরকম বড়ো বড়ো সাইজের বেলে মাছ। এগুলো বেলে না তুলার দান্ডি! আলতাফ কালকে বলছিল, চুডা বাইলা। ঝিলিক ভালো করে তাকায়, না এগুলো বেলে। তাদের দিকে এক সময় তুলার দান্ডি কেউ খেত না।
ঝিলিক একটু সরে আসে। আলতাফ হয়তো বুঝে ফেলবে জরিনার পেটের ভিতরে এই মাছ মোচড় দিয়ে চলেছে। তখন আলতাফ কী ভেবে বলে, দেহো উপরে যাইয়ে, থাকতিও পারে। আমি মাঝে মদ্যি পিছনে যাই। এদিক ওদিক চা পান বিড়ি খাতি যাই, তহোন আইসে উপরে যাইয়ে ঘুমোইয়ে রইচে নিকি তোমার লোক, জানে কেডা?
ঝিলিক চকিত চোখে আলতাফের দিকে তাকায়। কোনও বদ মতলবে এই দুপুরে তাকে উপরে যেতে বলল না তো? পুরুষ মানুষ বিশ্বাস করা যায় না। তাছাড়া, তাকে জরিনা এই লঞ্চঘাটের এক একজন সম্পর্কে যা বলার বলেছে। আলতাফের চোখ কেমন চলে, তা বলতে বলতে জরিনা ঝিলিকের গায়ে হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়েছিল। সেই আলতাফ এখন সুকুমার উপরে আছে কি না তা না-জানার ভান করে, তা উপরে যেতে বলছে। যদিও কথাটা একেবারে নীচু গলায় আর সঙ্গে তার–জানাকে মিশিয়ে দিয়েই বলেছে, মনে হল ঝিলিকের। সে হোটেলের বড়ো দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। এক থাক সিঁড়ি। তার নীচে জল জমেছে। ঝিলিকে পায়ের নীচে জল। রাবারের স্যান্ডেলটা ভিজে চুপচুপে। সামনে একখানা মোটা ছালার চট লেছে দেয়া। সেখানে উঠে দাঁড়িয়ে আবার জানতে চাইবে, না এখনই একটু এগিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে তাই ভাবল।
না, থাকলি আপনি জানতেন! ঝিলিক তার সন্দেহ প্রকাশ করে।
আলতাফ বিষয়টা বুঝতে পারল। কিন্তু আলতাফের হিসেব তো ভিন্ন, একটু ইয়ার্কি ফাজলামি যাই করুক, গ্রাহক খরিদ্দারের সঙ্গে কোনও প্রকার নগুছগু সে যেমন নিজে করে না, তার কোনও কর্মচারী কি আশেপাশের কোনও দোকানদার এই কাজ করুক তা সে চায় না। সে বলল, কেন, অসুবিধা কী? যাইয়ে দেইখে আসো। আমি জানি না, দেহিনি।
