এসব হয়তো জরিনা বোঝে না। কিন্তু আজকের বৃষ্টি বাদলে সবই যে খানিকটা এলোমেলো হয়ে গেছে তা বুঝতে পারছে। আর সুকুমারও যে এইখানে নেই, তাও তার দেখা হয়ে গেছে। এ সময়ে কোত্থেকে এসে হাজির দিলদার। শেডের বাইরে দিলদার এলে জরিনা দেখল তার বাত নিরাময় যন্ত্রটা এক কোনায় রাখা। এখন তা দিলদারের পায়ের কাছে। দিলদার হাসল। জরিনা অবশ্য এই হাসির উত্তর দিল না। তার দিলদারকে সব সময়ে একটু ফটকা মনে হয়। এখনই কোনও ফটকামি শুরু করবে। জরিনা যেন তার কোনও সুযোগ না দেয়ার জন্যে বলল, আইজকে এই বইষ্যাকাদার দিনেও ওই নাপিতের বাকসো লইয়ে আইচো।
জরিনা এভাবে কথা বলে, তা জানা আছে দিলদারের। কিন্তু আজগর অসুস্থ, আর আবহাওয়ার এই দশা, তার ভিতরে হঠাৎ এভাবে তার প্রতি চড়াও হল কেন, দিলদার যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর আত্মরক্ষার ভিতর দিয়ে আক্রমণের জন্যে মিয়ানা গলায় বলে, তোমার এই একথা। এইডে দেকলিই নাপিতের বাকশো। কত মানষির কাজ হয়। বুড়ো তো হওনেই হলি বোঝদা, বাত কারে কয়।
হয়। ওইয়ে দিয়ে বাত সারাতি যাবেনে মানুষ। মানষির আর খাইয়ে কাজ নেই।
কেন, দেহো না, মানুষ আসে তো। ধরে আর আমি কত মানষির বাত ছাড়াইয়ে ভালো কইরে দেলাম।
হইচে। জানি জানি। কার কার বালে আসে তোমার ধারে বাত ছাড়াতি, সেয়া আমার জানা আছে।
ফাও কতা কইয়ে না। বাদুক বোঝবা!
হয় হইছে।
জরিনার ধান্দাটা কী? দিলদারের সঙ্গে এখন কথা জমিয়ে, তারপর তাকে নিয়ে কোনও চায়ের দোকানে যাবে? আজগর তাকে পেশানে পেশানে একবারে এক শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু সে যে সুকুমারকে খুঁজতে এসেছে, সে কথা কি ভুলে গেছে। নাকি সুকুমারকে খুঁজতে আসার উছিলায় এমন একটা দিনে কোর্ট চত্বরটা কেমন তাই দেখে গেল। আবার এই মুহূর্তে দিলদারকে পেয়ে একটু যদিও রঙ্গ করে এক কাপ চা আর এক খিলি পান মুখে দেয়া যায়, তাই-বা মন্দ কী?
হয় হইচে না। ঘুমোও তো ওই আজগরের সাতে, ঠিকমতো ডলা দেনা, ঠিকমতো ডলা দিতি পারলি তোমারে বাত বাদাইয়ে দিতি সময় লাগদ না!
জরিনা ফিক করে হাসল। চাইল একবার দিলদারের চোখে। অন্য সময়েও দিলদার এমন সব কথা বলে। কিন্তু এখন দিলদারের কথায় জরিনার এই হাসিতে অনুমোদন ঠিক নয়, কিন্তু আবার একপ্রকার অনুমোদনও। আবার তাও হয়তো না, দিলদারের কথা বলার ভঙ্গিটা এই মুহূর্তে ভালো লেগেছে তার। কিন্তু মুখে তার কপট রাগত একটা ভঙ্গি এখন ঠিকই থাকে, হইচে। ঘুরোয় ঝাঁকাও ওই কাটাবাড়ার এক কল, সেইয়ের জোরে আমার বাত বাধাতি চাতিচো। তোমার ওই যন্তর দেখলিই বোঝা যায় তোমার মুরোদ কীরাম!”
আমার মুরোদ আবার দেখলা কবে?
দেখিনি, চেহারা দেকলিই বোঝা যায় কার কী মুরোদ।
চেহারা দেকলি! আর ফাও কতা কইয়ে না। মুরোদ দেকতি চালি কইয়েনে, দেহাইয়ে দেবানে।
জরিনা আবারও চাইল দিলদারের চোখে। সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। ওদিকে দিলদার তার কথা বলে চলছে, তারপর দেইয়েহানে আমার এই যন্তরের ধারে আইসে বাত কোমান লাগে নাকি?”
জরিনা হাসে। সে বুঝেছে দিলদারের কথায় সে আটকে যাচ্ছে। এসব ক্যানভাসারের সঙ্গে কথায় পারা যায় না। এরা প্রত্যেকটাই কথায় এক একটা ঝুনো তাল। এমনভাবে পাকাবে যে সে কথা দিয়ে কোনও ভাবে বের হওয়া যাবে না। এই পর্যন্ত ভাবতেই জরিনার মনে হল, সুকুমারকে খুঁজতে এসে সে দিলদারের সঙ্গে এভাবে আলাপে জড়িয়ে পড়ছে? ওদিকে ঝিলিক বুঝি এখনও একা একা বসে আছে ঝুপড়ির সামনে। বেলা পশ্চিমে হেলে গেছে কখন। সূর্যের মুখ আজকে দেখা যাচ্ছে না বলে বোঝা যাচ্ছে না বেলা কত হয়েছে। খিদেও হয়তো এখনও সেভাবে লাগেনি, কিন্তু পেট সময়মতো যা জানান দেয়ার তা জানাবে।
হইচে, তোমার আর কতা দিয়ে ভিজোনোর দরকার নেই। এই মেঘলা দিনে এমনিই ভিজে রইচি, মানষি বাচতিচে না নিজের জ্বালায়, এর মদ্যি উনি খালি কতা দিয়ে ভিজোইয়ে যাতিচে।
তা চলো গলা ভিজোইয়ে দি। নদী ভরা পানি, সেইয়ে দিয়ে ভিজোবা না চা দিয়ে ভিজোবা?
নদীর পানি দিয়ে ভিজোলি আর তোমার ধারে জিগোতি যাব নানে। যাইয়ে নদীতেই নাইমে যাবানে–
তা চলো চা দিয়ে ভিজোইয়ে আনি।
এবারও জরিনার আলতাফের দোকানের পথে নদীর পাড়ে আসা হল না। দিলদার টাইপিস্টদের শেডের একজনের জিম্মায় তার বাত নিবারণের যন্ত্রটা রেখে জরিনাকে নিয়ে চলল ডাকবাংলোর কাছে, বার কাউন্সিলের সামনে। সেখানে অবশ্য কিছুটা ভিড় আছে। উকিল মোক্তার মহুরিরা সেখানে থাকবে, তাই স্বাভাবিক। এত পথটুকু যেতে যেতে জরিনার মনে হল, অনেকক্ষণ হয়েছে। সুকুমারকে খুঁজতে এসেছে সে, চা খেয়েই তাকে চলে যেতে হবে।
আলমের দোকানের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দিলদার আর জরিনা চা খায়। এক ফাঁকে জরিনা দিলদারকে জিজ্ঞাসা করে, আইজ এমন দিন লোক নেই, জন নেই, আইজকে কেন আইছো?
দিলদার জানায় এমনি। রোজই আসে। আইজকেও আসল। বিকেলে নদীর ওপর দিয়ে এক বেয়াই আসপে, তার সাথে এট্টা কাজ আছে। সন্ধ্যা বাদে বাড়ির দিক যাবে।
জরিনার মনে হয়, মানুষ যে এই লোকরে গোয়েন্দা কয়, এ শালা আসলেই মনে হয় গোয়েন্দা। কাজ নেই কাম নেই তবু আসপে। মনে হয়, কোর্টের এলাকার সব খবরাখবর পুলিশরে দে। নিশ্চিত পুলিশের লোক। আবার ভাবে, হোক, তাদের কারও সাথে আইজ পর্যন্ত কোনও উলটো পালটা ব্যবহার করেনি। যা এট্ট রঙ্গ-রসিকতা করে। আর পকেটে পয়সা আছে।
