তালি থাহে কী কইরে। এহোন তয় যাই, পরে নয় জরিনাদিরে নিয়ে আসপানে।
কেন, রাইতে উপরে থাকতি পারো আর এহেন উপরে যাইয়ে দেইহে আসতি ভয়! পিছনে। শিউলির মা আছে। দরকার হলি তারে লইয়ে যাইয়ে দেইহে আসে।
কেন যেন ঝিলিকের সন্দেহ কাটল একথায়। অথবা সে যেন না বুঝে সন্দেহ করেছে আলতাফকে। শুনেই ঝিলিক হাসল। অর্থ এই, না সে একাই যেতে পারব, অথবা, আসলে সে ভেবেছিল জরিনাকে নিয়ে আসাই তার জন্যে ভালো। ঝিলিক বলে, না, ভাবিলাম, সেই মানুষটা যদি ঘুমোইয়ে থাকে, তালি জরিনাদিরে নিয়েই আসা ভালো। না-পালি আপনার এই জায়গাদে দুইজনে চাইরডে ভালোমন্দো খাইয়ে খাতি পারতাম।
তা লইয়ে আসো, খাইয়ে যাও। আইজে আমার এমনিতেই বাণিজ্য খারাপ। দেহো না, মানুষজন নেই। তবু তোমরা খাইয়ে গেলা। বেচলাম কয়ডা ভাত।
হয়। এইয়ে আমরা খাতি পারি নিকি। এসব খাওয়ার যে দাম!
আসো, কোমাইয়ে রাখপানে। আইজকে এহেবারে বিক্রি বাট্টা নেই।
দেহি। তার আগে দেইহে আমি সেই মানুষটা আছে নিকি। বাপুরে বাপুরে, যদি ঘুমোইয়ে থাহে, তবু এইরাম ঘুমোতি পারে মানুষ?
আইজে ঘুমোনোর দিন।
হয়, যেন লাট সাহেব। ঘুমোইয়ে থাকলি পেটের ভাত জোটাবে কেডা?
বলতে বলতে ঝিলিক ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগোয়। আলতাফের চোখে চোখ রাখে। বুঝতে চায়, আলতাফ যে তাকে আর জরিনাকে খেতে বলল, আসলেই বলল তো। যদিও এখন তার সুকুমাররে পাওয়া দরকার। এখানে খাওয়ার ব্যাপারে জরিনা বা সুকুমারের সঙ্গে পরামর্শ না করে কিছুই করা যাবে না।
দোতলায় উঠে দেখে, পুরোটাই ফাঁকা। সামনের ছোটো কাঠের বারান্দায় যাওয়ার দরজাটা দেওয়া। আর ওইপাশে যে খুপরি ঘরগুলো, প্রতিটারই দরজা খোলা। কোনার দিকেরটায়, প্যান্ট পরা অবস্থায় ঘুমিয়ে আছে সুকুমার। খাটের পাশে তার খেলা দেখানোর মালামাল রাখা। একটা বাক্সর মুখ ভোলা। বুকের ওপর এক পেটি তাস ছড়ানো। ঝিলিক এমন আধো অন্ধকারে ঘুমন্ত সুকুমারের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ঘুমন্ত সুকুমারের মুখোনা দেখতে বড়ো ভালো লাগছে। কী সরল মুখোনা মানুষটার। যেন এই জগতের কোনও কিছুর উপর তার কোনও রাগ নেই। বিরক্ত নেই। মুখোনায় আছে শুধু ক্লান্তি। একেবারে হাভাতে ঘরের ছেলে না, বাপ ভাইয়ের উপরে কোন রাগে পথে পথে এই জীবনটা কাটিয়ে দিল। তারপর, ঝিলিক নিজের কথাও ভাবে, সে এসে জুটেছে লোকটার জীবনে। তারপর, তারপর তারা জানে না, একদিন কোথায় ভেসে যাবে।
ঝিলিকের কখনও কখনও মনে হয়, এখন, এই মুহূর্তে সুকুমারের মুখের দিকে তাকিয়ে তার আরও বেশি মনে হল, সুকুমারকে আবারও বলবে তারে বিয়ে করতে। আবার ভাবে, সে জানে না, আবার বিয়ে করা যায় কি না? যদিও একদিন এমন কথা সুকুমারের কাছে তুলতেই সে বলেছিল, শাখা খুলতি কইচে কেডা? ভক্তদা মরিচে নাকি? তাও তো সত্যি কথা, শাখা জোড়া না খুললেই হত। সুকুমার তাই বলেছিল, শাঁখা যদি নাই খোলতা তালি দরকার হলি মানুষজনরে কতি পারতাম আমার বউ। আর ওয়া হাতে থাকলি এমনিতে কেউ জিগোনিও আসত না।
আহা, কী সোজা পরামর্শ! শাখা একজন মানুষ খোলে কেন? যা করিচে তোমার ভক্তদা, সেয়া কোনও মানুষ করে? একেবারে না-মানুষের জাত। ওই গুষ্টির রক্ত খারাপ! এরপর বিড়বিড় করে সুকুমারের মামাতো দাদা ভক্তর আর খানিক মুণ্ডুপাত করে। তবে, সে জন্যে ঝিলিকের কষ্ট না, কষ্ট তার ছেলে ভরতের জন্যে। এখন পথে ঘাটে যে কোনও জায়গায় ওই বয়সের কোনও ছেলে দেখলে ঝিলিক অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে। তখন ঝিলিকের অজান্তে কখন যে চোখ ভিজে যায়। ঝিলিকের তখন একবারও ভক্তর কথা মনে পড়ে না। ছেলেটার মুখ চোখে ভাসে শুধু। সে তারপর সেই ভেজা চোখে অন্যত্র তাকায়। অন্যদিকে মনোযোগ দিয়ে নিজেকে স্মৃতি থেকে সরিয়ে নেয়।
এখন ঘুমন্ত সুকুমারের দিকে এই আধো অন্ধকারে চেয়ে থাকতে থাকতে অজান্তে ঝিলিকের চোখ ভিজে গেল। কিন্তু এখন তার চোখে তেমন আলো নেই, অন্ধকারই, আলো যেন অস্কুট, ওপাশে একটি জানলা মতন থেকে সুকুমারের মুখে খানিকটা আলোর আভাস, সেই মুখোনার দিকে তাকিয়ে অজ্ঞাতে ঝিলিকের চোখ জ্বলে ভরে উঠছে। কিন্তু ঝিলিক জানে না, কেন এমন হচ্ছে। কেন হঠাৎ ভরেছে তার চোখ জলে। আজকের ভেজা আকাশের মতন তার চোখের দশা! ভেজা চোখের অস্তিত্ব বুঝতে একটুক্ষণ সময় লাগল তার। তারপর আঁচল টেনে চোখ মুছে এবারও অজ্ঞাতে সে ফিসফিসায়, এই যে, এই যে, সুকুমার বাবু, আমার সাধের দেওরা, ওঠেন।
একথায় সুকুমারের কোনও প্রকার নড়চড় নেই। সে হয়তো শোনেনি, মুখোনা দেখে এমনিতে মনে হয়, গভীর ঘুমে অচেতন। আসলেই তাই। কিন্তু ঝিলিকের তো জানা আছে, সুকুমারের ঘুম কত পাতলা। এক ডাকেই সাড়া নেয়। পথেঘাটে থাকা মানুষ, ঘুম গাঢ় হবার জো আছে। কিন্তু এখন এভাবে ডাকার পরও উঠছে না কেন? নেশাটেশা করে ঘুমায়নি তো। কিন্তু ওসব অভ্যাস কখনও সুকুমারের দেখেনি। বিড়ি-সিগারেট খায়, তাও খুব পাতলা পাতলা। নাকি আজকের এই বৃষ্টি বাদলায় শরীর ছেড়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছে লোকটা।
ঝিলিক আবার ডাকে, ও সু, সুকুমার?
সুকুমার চোখ খুলল না, কিন্তু আড়মোড়া ভাঙল। একটু নড়েচড়ে উলটো ফিরে শুল। বুকের ওপরে আলগোছে রাখা তাসগুলো গড়িয়ে পড়ল দুদিকে। কিছু নীচে, কিছু খাটের ওপর। আর বুকের ওপরে রাখা হাতখানা গড়িয়ে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হাতখানা মুখের কাছে এনে সে মুখ ডলল। ঝিলিকের মনে হয়, এখনই জাগবে। সে সুকুমারের কাছে যায়। ঝুঁকে মুখের কাছে হাত নিয়ে সুকুমারের মুখে হাত বুঝিয়ে ডাকে, ওঠো আমার সাধের দেওরা–
