এই প্রায় বিড়বিড়ানি বলার জন্যে বলা হয়তো, জরিনা নিজেও জানে, এই যে মানুষটা ঘুমাল এই ঘুমেই তার কাহিল অবস্থা ছাড়বে। এ জন্যে কয়দিন যাবে না কর্মকার পট্টির পিছনে, সেখানে গিয়ে বোতলভরতি ওই ছাইপাশ গেলে। কোনওদিন ওখানে বসে না, পাইটের বোতল কোমরে গুঁজে নিয়ে আসে, তারপর পন্টুনে হেলান দিয়ে গলায় ঢালে। কোনও কোনওদিন ওইসমস্ত না খেলে তার ঘুম আসে না। সে রাতে ছটফট করে। কোনও রাতে খেয়ে কাঁদে। অস্ফুট সেই কান্নায় আজগর কত কতদিন আগে ফেলে আসা বাড়িঘরের কথা বলে। নাকি বলে বাপ ভাই বোনের কথা। জরিনা শোনার চেষ্টা করেছে, যদিও কোনওদিনও উদ্ধার করতে পারেনি কী বলে। কাকে বলে। কার জন্যে কাঁদে। নাকি একসময় খুলনায় কোর্টের সামনে খেলা দেখাত, সেখানে এই জরিনার মতো কারও সঙ্গে তার পরিচয় ছিল, তার জন্যে এখন নিশি রাইতে আজগরের প্রাণ কান্দে!
জরিনা জানে না। কখনও জানার চেষ্টা করেনি। কোনও দিনও জানতে চায়নি, কেন বলা যাবে, তবে তাকে এই বিষয়ে আজগর কিছু বলেনি। জরিনা তো জানে, আজগর তারে মনে মনে হয়তো মানুষই মনে করে না। যদি মানুষ মনে করে, তাহলে ভাবে বাজারের মাইয়ে মানুষ। আবার এই বাজারের মাইয়ে মানুষটার সাথেই বছর কাটায়। তা কাটাও। কেউ এই নিয়ে কিছু বলতে আসছে না। আশেপাশের মানুষজন কেউই তো তাদের মানুষ বলেই গণ্য করে না, গণ্য করে না বলেই তাদের নিয়ে কোনও কথা নেই। কথা যা কয় ঘাটের কদম আলি। তবু জরিনার মনে হয়, তারা এই লঞ্চঘাটের কাছে আছে দুইজন আর পার্কে আছে বেঙ্গা-বেঙ্গি। এই চারজন মানুষরে নিয়ে বাকি মানুষের কোনও আপত্তি নেই। কোনও চাওয়া চাইয়ি নেই।
সমাজের সে সব হিসেবের বাইরে, জরিনাও এই বানর-নাচানো আজগরকে নিয়ে সংসার গড়ে তুলতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু আজগরকে বোঝায় কে। শুকনার সময়ে ইচ্ছে হয়, নদীর পাড়ে ওই পাশে একটু বেড়া দিয়ে চারটে ডাল ভাত ফুটানোর। কিন্তু একদিন দুইদিনও কি পেরেছে? চালের নীচে মাথা দেওয়ার স্বভাব নাই ওই আজগরের। মুনিগঞ্জে মেলা থেকে জরিনা কিনেছিল একটা মাটির হাঁড়ি আর একটা কড়াই আর তালগাছের ড্যাগায় বানানো চামচ। সে সব এখন কোথায়? নদীর পানিতে ভেসে ভেসে এতদিনে নিশ্চয়ই দক্ষিণ সমুদ্রে ভেসে গেছে। সেই সংসার পাতা হয়নি জরিনার। লালির কাছে সাগুদানা ফোঁটাতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, এইটুকু ফোঁটানোর জন্যে এই নাগের বাজারে হাফেজের দোকান পর্যন্ত আসা লাগে, যদি থাকত তাদের দুটো হাঁড়ি কি একটা কড়াই আর আলগা চুলো তাহলে জরিনা নিজেই রান্না করে আজগরকে খাওয়াতে পারত। তারও তো ইচ্ছে করে। ভাত মাছ তরকারি না-হোক, এই এক বাটি সাগুদানা তো জ্বাল দিতে পারত!
যা হয়নি, হয়নি। হবেও না কোনওদিন। জরিনা আর সে আশাও করে না। মানুষের চোখে রাস্তার মেয়ে মানুষ, তার এত খায়েস কেন সংসার করার। তা বলে মানুষের বাড়িঘর, ঘরদুয়ার সংসার দেখলে জরিনার গা জ্বলে না। বরং চায়, একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই আর রান্নার হাঁড়িকুড়ি যেন জোটে এই জীবনে সব মেয়ের কপালে। এই ঝিলিক আর সুকুমারও যেন একদিন থিতু হয়। এইভাবে, ঘরের চালে মাথা না দিয়ে মানুষের জীবন চলে নাকি?
একটু আগেই তো জ্বরের ঘোরে আজগরের মতন মানুষও সে কথা বলল। তখন আজগরের ঠোঁটের কাছে জরিনার ধরা বাটিটা ওই এক মুহূর্তে যেন প্রায় থমকে গিয়েছিল। আজগর বিড়বিড় করার ফাঁকে চোখ খুলে ঝিলিককে দেখে বলে, কী খবর বোইন। আমার এই দশায় তোমাগো যে কষ্ট হতিচে!
ঝিলিক অস্ফুট বলে, হয়, কী যেন কততা করতিচি, কত যেন কষ্ট!
আজগর সাগুর বাটিতে চুমুক দিতে দিতে বলে, ও জরি, ও কয় কী? তারপর ঝিলিককে, কেন আমি যেন বুঝি না?
জরিনা বলে, কতা কইয়ে না, খাও।
আজগর নীচু গলায় বলে, বুইনডারে কী কষ্ট দিতিচি। সেই সহলদে এই হানে—
আজগরের মুখ মুছিয়ে দিয়ে জরিনা বলে, হয়। বইসেই আচে।
আজগর অস্ফুট বলতে বলতে ঘাড় ঘোরায়। তার চোখ বুজে আসছে, সুকুমার কোতায়, তারে দেকলাম না। আইজে বৃষ্টি তো সব মাটি কইরে দেল!
আজগর শুনছে কি শোনেনি, এর ভিতরে জরিনা বলে চলে, তোমার জন্যি এই সাগুদানা কিনে দিয়ে তারপর যে কোহানে গেল।
আজগর ঘুমিয়ে পড়লে তাদের সুকুমারের কথা মনে হয়। তারপর আশেপাশে খোঁজে। কিন্তু একবারও তাদের মনে হয়নি, এমন অবেলায় আলতাফের হোটেলের দোতলায় উঠে লোকটা সটান ঘুমিয়ে থাকতে পারে। তারা বরং ভেবেছে কোর্ট চত্বরে আছে। ঝিলিককে বসিয়ে রেখে, জরিনা কোর্টের দিকে গেছে ডাকবাংলো ঘাট হয়ে। আলতাফের হোটেল তার পথে পড়েনি। কোর্ট চত্বরে গিয়ে জরিনা দেখে এসেছে ফাঁকা। বারিক বুড়ো নেই। বারিক বুড়ো নেই তো কোর্ট চত্বরে কোনও ক্যানভাসারই থাকার কথা নয়। ছিলও না কেউ। শুধু মহুরিদের ঘরের কাছে গলায় চামরার ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়েছিল গোলাপ মিয়া। জরিনাকে দেখে হেসেছে। সে জানে আজগরের শরীরের কী অবস্থা। এই হাসিতে কোনও রঙ্গ ছিল না। জরিনা কাছে আসলে হয়তো জানতে চাইত আজগর কেমন আছে। আবার নাও জানতে চাইত পারত, ঘণ্টা দুয়েক আগে সুকুমারের কাছে শুনেছে। জরিনা বাঁ-দিকে একটু এগিয়ে টাইপিস্টদের চত্বরের দিকে যায়। ভিতরের সার সার বেঞ্চি কোনওটাতে সে বসে থাকতে পারে। লোকজন নেই প্রায়। অনেক টাইপিস্টের টাইপ রাইটার কভার দিয়ে ঢাকা দেওয়া। দুই একজন কাজ করছে। তাও নিশ্চয়ই খুব কষ্টে, ভিতরে আলো নেই। বাইরেও আলো কম। আকাশ মেঘে ঢাকা থাকলে এই টিন শেডের ভিতরে টাইপের মতন সূক্ষ্ম কাজ করতে টাইপিস্টদের কষ্ট হয়।
