গোলাপ বলে, দেহহা কী? আইজকে কামাই নেই। আসতিচে। তারপর থেমে জানতে চায়, আচ্ছা, ওদা, আজগর ভাই অবস্থা কী? আছে কীরাম?
সহালে পুরনো হাসপাতালে লইয়ে গেইলাম। জ্বর কয়দিন থাকপে। তয় শরীরে নাকি কিছু নেই। এহেবারে কাহিল। ডাক্তার কইচে, ভালোমন্দ খাওয়াতি। এহেন ঘুমোতিচে। কী একটা ইনজেকশন দিচে।
আমাগো আর ভালোমন্দ খাওয়া। কও নেই ডাক্তাররে যে ও বাল বান্দর নাচায়। নিজে খাবে কী আর বান্দর গো খাওয়াবে কী? সাতে আছে এক নটী।
সুকুমারের গোলাপের কথার শেষটুকু ভালো লাগল না। যদিও গোলাপের বলার যা ধরন তাতে সে খেপতেও পারবে না। জরিনাকে নটী বলেছে, কিন্তু এমন হেসে বলেছে যে, তাতে আজগর তার বানর আর জরিনা সব একই। আজগরের আয়ে তাদের অভুক্তই থাকার কথা।
এইয়ে ডাক্তাররে কইয়ে কী হবে?
গোলাপ এ সময় বারিকের বসে থাকা বটগাছের নীচে হাত উঁচু করে সেখানে বসা দিলদারকে দেখায়, ওই দেহে, এক নাটাই সের নাতিপের বাকসো নিয়ে বইসে রইচে। ভাবখানা দেখে যেন আইজকে এই টাউনের সবাইর বাত নামাইয়ে বাড়ি যাবে!
সুকুমার হাসল। দেহিচি। তা আইজকে ওইভাবে বইসে রইচে কী জন্যি, পাবে কেউরে?
কেন বইসে রইচে তা দিলদারই ভালো কতি পারবে। তয় মানষি কয়, ওইসব ওয়ার ভান। আসলে করে সরকারে গোয়েন্দাগিরি।
কী কও?।
কী কও না, সত্যি। ওর চিন্তা কী জমি আছে কিছু। বান্দা লাগায়। হাউসে ওই যন্তর নিয়ে বসে। আর এই কোর্টের সব খবর পুলিশরে পাস করে।
সুকুমার বিস্ময়ে গোলাপের দিকে চেয়ে থাকে। সত্যি মিথ্যা কিছু যাচাই করতে গেল না। দরকার কী। অথবা তার কোনও উপায় আর সুযোগ তার নেই। গোলাপের কথা সে উড়িয়ে দিতে পারে না। আবার এখানে, তাদের ভিতরে বাত নামানো যন্ত্র নিয়ে বসা দিলদার পুলিশের গোয়েন্দা তাই-বা মেনে নেয় কী করে। কিন্তু সুকুমারের জানা আছে, এইসব বিচিত্র খবর হঠাৎ হঠাৎই উড়ে আসে। যেমন এখনই গোলাপ আরও বলল, ও শালার কাগজপত্র সব ঠিকঠাক। সৌদি চইলে যাবে।
তাই নাকি?
তুমি আবার যাইয়ে জিগাইয়ে না। কবে নানে কিন্তু কিছু। এমন ভাব করবে ওই নাপতালি দিয়ে কোনওমতে দিন চালায়।
সুকুমার চোখ বড়ো করে গোলাপের মুখ দেখে। এই কথা শুনে তার আর কাজ নেই। এখানে। থাকলে গোলাপ আরও বলবে। হয়তো চা খেতে নিয়ে যাবে। যদি চা-খাওয়ার পরে সেটার দাম গোলাপ দেয় তো পানের দাম সুকুমার দিতে হবে। সুকুমারে সেই সঙ্গতি নেই। পকেটে অবশিষ্ট যে পাঁচটি টাকা, তাই দিয়ে আজগরের জন্যে সাবুদানা কিনতে হবে। তারপর তা জলে ফোঁটানোর জন্যে জরিনাকে যেতে হবে হাফেজের বউ লালির কাছে। সেখানেও এই কাজের জন্যে টাকা চাইতে পারে। আবার নাও চাইতে পারে, আজগর তাদের বাধা খদ্দের। তবে যাই হোক, এখন সুকুমারের বাজারের দিকে যাওয়া দরকার। বৃষ্টি পড়ছে না। হয়তো টিপটিপ করে এখনই পড়বে। অথবা ও যে কোনও সময় দাবাড় চালাবে। তার আগে বাজার হয়ে আজগরের ঝুপড়ি পর্যন্ত আসতে হবে। তারপর, এখনই ভাবল সে, যদি সম্ভব হয়, সারাটা দুপুর আলতাফের হোটেলের দোতলায় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেবে। ঝিলিক ডেকে না উঠালে উঠবে না। খাবেও না কিছু। খাবে যে সে-পয়সা কই?
০৮. আজগরের জন্যে সাগুদানা
বাজার থেকে আজগরের জন্যে সাগুদানা এনে দেবার পরে সারাটা দুপুর সুকুমার ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিল। ঝিলিক ভেবেছিল বুঝি রঙ্গ করে। এমন কথা সুকুমারের মুখেই মানায়। যে লোক, হঠাৎ যে কোনও জায়গায়, রেল স্টেশন কি পার্কের বেঞ্চিতে কোনও সময়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারে, তার পক্ষে এমন রঙ্গ করা সত্যি সম্ভব। কিন্তু তাই বলে মোটামুটি আয়োজন করে ঘুম! সেই গেল আলতাফের হোটেলের দিকে তারপর আর দেখা নেই। ঝিলিক ভেবেছিল, একটু ঘুমাবে মানে হয় কোনও লঞ্চের ভিতরে কি পন্টুনের কোনও পাশের বেঞ্চিতে। আকাশে মেঘ আছে। বৃষ্টিও হয়েছে কয়েক পশলা। সকালের পরে আর দাবাড় চালায়নি। ফলে, ঢাকাই লঞ্চের ভিতরে কিংবা অন্য কোনও ছোটো লঞ্চের ভিতরে সুকুমার ঘুমিয়ে নিতে পারে। তাই বলে একেবারে আলতাফের হোটেলের দোতলায় গিয়ে এইরাম ঘুম!
তা সত্যি। আলতাফের হোটেলে এই দুপুরের পর পর্যন্ত সুকুমার ঘুমিয়ে থাকতে পারে, তা ঝিলিক জনমেও ভাবেনি, জরিনারও মনে হয়নি সেকথা। ফলে ওদিকে কেউ আসেনি। আলতাফের হোটেলে সুকুমারকে কেউ খোঁজেনি। ঝিলিক লঞ্চের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে এসেছে সেখানের দু-একজনকে। পন্টুনের চারপাশে দেখেছে। একবার কদম আলিকে জিজ্ঞাসা করেছে। কদম আলি বলেছে, সে গতকালের পর আর সুকুমারকে দেখেনি। যদিও ঝিলিককে বলা তার এই কথাটা মিথ্যা, কারণ কদম আলি সুকুমারকে চেনে না। জরিনাকে বলেছে ঠিক, যে পন্টুনে ওইরম চেহারার কেউকে সে দেখেনি, চেনেও না।
তবে, সুকুমারকে পাওয়া না পাওয়ায় তারা দুজন উতলা হয়নি। সুকুমারকে তাদের প্রয়োজনও পড়েনি। ঝিলিক বসেছিল আজগরের ছাপড়ার সামনে, তখন জরিনা গিয়ে হাফেজের বউয়ের কাছে থেকে সাগু ফুটিয়ে নিয়ে এসেছে। তারপর দুজনে মিলে ধীরে ধীরে খাইয়েছে আজগরকে। তখন আজগর একটুক্ষণের জন্যে আধো জাগরণে। জরিনা বিড়বিড় করে বলছিল, মোসলেম ভাই কী ডাক্তার দেখাইয়ে নিয়ে আসল, আর ডাক্তার এমন এক ইনজেকশন দেল, লোকটা আর ঘুম দিয়ে ওঠে না।
