বাজারের কথা বললেই সুকুমার মেইন রোডে বা-দিকে না যেয়ে গেল ডান দিকে। কী মনে করে একটু কোর্ট চত্বরের দিকে যাওয়ার কথা ভাবে। হতে পারে, বানর দুটোর জন্যে কলা কিনতে কিনতে সুকুমারের মনে হয়েছে, এই বানরের খেলা দেখিয়ে পেট চালায় আজগর। আজ জ্বরে বিছানপড়তা, সেও হাতগুটিয়ে বসে আছে, খেলাঅলা সুকুমার কোর্ট চত্বরে খেলা দেখাতে পারছে না, আলতাফের কাছে ধার, মোসলেম তাদের সঙ্গে রিকশা উঠে কোর্টের কাছে এসে নেমেছে, তারপর থেকে টিপটিপ বৃষ্টির কমতি নেই, তবু এর ভিতরে একবার তো কোর্ট চত্বর দেখে আসা যেতে পারে। যদি কোর্ট চত্বরে খেলা দেখানোর উপায় না থাকে, তাহলে সে রেল স্টেশনের দিকে। যাবে। স্টেশন বিল্ডিংয়ের পিছনে কাটা লেকের পাড়ে অনেকখানিক জায়গা কংক্রিটের, বৃষ্টি না থাকলে সেখানে বিকালের দিকে খেলা দেখাতে পারবে সে। লোকজন কী হবে কে জানে। তবে যাই হোক, কুড়ি-পঁচিশ টাকাও যদি জোটে, তাহলেও কিছু তো হল। তাদের রাতের খাওয়া হবে। বেশি হলে আলতাফের ধার শোধ করা যাবে। হোটেল ভাড়া নয় সপ্তাহের শেষে দেবে।
এসব ভেবে, কোর্ট চত্বরে এসে দেখে, কোথায় কী? মোসলেম উদ্দিন নেই। বারিক বুড়ো বটতলায় পলিথিন টাঙিয়েছে, কিন্তু নীচে পলিথিন লেছে বই সাজায়নি। বই পাশে পলিথিনে বাঁধা। সেখানে উপরে বাঁশের স্থায়ী ঢাকনা। তার পাশে দিলদার তার বাত নিরাময় যন্ত্র নিয়ে বসে আছে। বৃষ্টি ঝেপে এলে এক দৌড়ে টাইপিস্টদের শেডে চলে যেতে পারবে।
বারিকের কাছাকাছি যায়নি, তার আগে যে ছোট্ট একটা ঘর, এখানে মহুরিরা হয়তো বসে,সুকুমার জানে না, ওই জায়গায় কান পরিষ্কার করা গোলাপ মিয়া দাঁড়িয়ে। সুকুমার একবার ভাবে গোলাপের কাছে যায়, আবার চারদিকে তাকায়। ঝড়ের আভাস, বৃষ্টি ফাঁকে ফাঁকে হচ্ছে, কিন্তু সেই জন্যে কোর্ট চত্বর এমন ফাঁকা!
বরং, গোলাপ এগিয়ে আসে তার কাছে, কী, ও দাদা, চাইয়ে চাইয়ে দেকতিচে কী?
এমন অবস্থা তো কত হয়। মাঝে মধ্যে কতদিন কত কারণে খেলা দেখানোর সুযোগ থাকে না, কিন্তু তখন তো টাকারও প্রয়োজন থাকে না, কিন্তু যখন হাতে চলার মতো পয়সা দরকার সেই সময়ে এই অবস্থা! এতে সুকুমারের মুখ খানিকটা অসহায়। যদিও রসিক গোলাপ মিয়ার কথার ধরন বদলায় না। কোর্টে মানুষ না আসলে সে কানের ময়লা কি খইল বের করবে এমন মানুষই-বা পাবে কোথায়। শহরের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে ওই কাজের জন্যে মানুষ জোটানেনা কী কষ্টের তার জানা আছে। তাছাড়া, টাউনে মানুষ তারে ততটা পাত্তাই-বা দেয় কই? কেউ হয়তো বলে, কী গোলাপ, তোমারে দিয়ে কান চাওয়ালি কানের কিছু থাকপেনে? গোলাপ হয়তো বলে, দাদা, যে কী কন? এতদিন ধইরে এই কাজ করতিচি, কোনওদিন কোনও কমপিলেন পাইচেন? আসলে এসব গোলাপের সঙ্গে একপ্রকার রসিকতা। ওই যে গোলাপ কমপিলেন কথাটা বলল, ওটা শোনার জন্যে বলা। আবার কেউ হয়তো এরপরে তাকে প্রায় ধূলিসাই করে দেয়। বলে, সেদিন কোর্টে কাজে আমাগো গ্রামদে একজন মানুষ আইল। সে কল, কোর্টের কানের খইল বাইর করা মানুষ নাকি তার কানের পর্দা ছিঁড়ে আইনে দেখাইচে। তুই আইজকাল এইয়ে এইয়ে করতিচিস? গোলাপের বিব্রত হওয়ার দশা। সে তো জানে, শহরের এই মানুষগুলোর সাথে কোনওভাবে পারা যাবে না। কথায় তারা ঠকাবেই। আসলে তার পেটে লাথি মারছে। কিন্তু গোলাপের বলারই-বা কী আছে। এদের কত ক্ষমতা। এসব কথা বলে তার কাজকে উপহাস করে। সে জানে, তারপরও তাদের কেউ কেউ তারে ভালোবাসে। চাইলে দুটো একটা টাকাও দেয় প্রয়োজনে। অথবা বলে, মুখ দেইখে মনে হতিচে আইজকে তোর রোজগারপাতি নেই এহেবারে, তা এট্টা পান খাবি নাই (নাকি)? না চা খাবি?” তখন গোলাপ যদি বলে, চাহা খাতি পারি। তারা যে তার চা-কে চাহা বলা শোনার জন্যে কথাটা বলেছে, তাও সে বুঝতে পারে। সেই গোলাপ সুকুমারকে এই বললে, সুকুমার আর গোলাপ মিয়াকে কতটুকু চেনে? ওদিকে তারা দুজনই এই চত্বরের সওদাগর। যার যার ব্যবসাপাতি নিয়ে এখানে এসেছে। তাদের চোখেমুখের বিহ্বল ভাষা আজকে তো প্রায় একই। তা গোলাপ যা-ই জানতে চাক, এখানে এখন সুকুমার চেয়ে চেয়ে আর দেখবেটা কী? গোলাপ যা দেখে, সুকুমারও তো তাই দেখে। কিন্তু গোলাপের কথাটা দারুণ সুরেলা। শুনে, সুকুমার না হেসে পারল না। এতে যেন উভয়ের ফ্যাকাশে মুখোনা একটুক্ষণের জন্যেও উজ্জ্বল হল। যদিও সুকুমার যেই বলল, ও ভাই, দেকপো আর কী? তুমি যা দেকতিচো, আমিও সেইয়ে দেকতিচি। ধরা খাইয়ে বইসে রইচি।
হয়। দাবাড় চালাল বইলে। তালি আরও ধরা খাওয়া।
দাবাড় তো সকালে একবার চালাইল, সেই জন্যে এহোন একদম মানুষজন থাকপে না?
সুকুমারের কথা শেষ করতে দিল না গোলাপ, উকিলরা মনে হয়, কোর্টেই ওটপে নানে, টেরেন নিয়ে তাগো নামে কেস কাণ্ড হইচে–
সেই জন্যি মানুষজন এহেবারে আসপে না? আমি নয় খেলা দেহাতি পারব না বিষ্টি দাবাড় স্যাক না দিলি, কিন্তু মানুষ আসলি তো তোমার তবু দুই পয়সা হত
গোলাপ শুকনো হাসি হাসল। টাউনো মানুষ দিয়ে আমার কোনও লাভ নেই। কেসের জন্যি যদি গেরাম দিয়ে মানুষ আসে তালি দুই চাইর পয়সা হতি পারে।
আইজকে লঞ্চই আসে না আসে। বলেই সুকুমারের মনে হয়, ঝিলিক কাল চলে এসে ভালোই করেছে, আজ দক্ষিণে না-জানি কী অবস্থা! ওই দিকের নদীতে আজ নিশ্চয়ই তুফান! তারপর সুকুমার গোলাপের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে একবার দক্ষিণের আকাশে তাকায়।
