আছে, ভালো হইয়ে যাবে। খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম, লাগাইতে ঠান্ডা, নদীর কূলে রাতে বইসে থাহে, জরিনাও একজন। ডাক্তার কল জ্বর সাইরে যাবে, তয় গায় বল পাবে নানে কয়দিন, এট্টু ভালো মন্দ খাতি হবে।
আর খাইচে। রাত্তির হলি ওই বান্দর নাচানো টাহা নিয়ে যায় কামারপট্টির পিছনে সাইজে মেয়ার দোকানে! কোনওদিন গলা পর্যন্ত টাইনে আসে, কোনওদিন নিয়ে আসে সালসার বোতলে ভইরে।
হয় শুনিচি, জরিনা কইছে।
ও এট্টা আপদ। সাথে জুটিছে ওই জরিনা, করবে না বালডাও। কতদিন কইচি হোটেলে থাল ধুইয়ে দিয়ে যা। তাতে ওনার প্রেস্ট্রিজ যায়। এইরাম নটী মাগি আমি জীবনে দেহিনি
সুকুমারের অবশ্য এ কথায় সায় দেয়া হল না। আবার আলতাফের এমন কথায় উলটো কিছুও বলতে পারছে না। এখনও আলতাফের কাছ থেকে টাকা নেয়নি। এসব কথা বললে কথা আরও বাড়বে। খেলাঅলা সুকুমার, জানে কখন কোন সময়ে স্থির থাকতে হয়। সে বলে, টাকা দেন, দশ টাকাই। আজগর ভাইরে ওষুধ কয়ডা কিনে দিয়ে আসি। তারপর আইসে শোনবানি বাকি কথা।
আলতাফ বলে চলেছে, তারপর আছে বানর দুটো।
তা তো আছে।
আলতাফের কাছে থেকে টাকা নিয়ে আবার জনতা ফার্মেসির দিকে যেতে যেতে সুকুমার ভাবল, আলতাফের সাথে এই কথায় অন্তত একটা কাজ হল, লোকটার সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা হলেও বাড়ল। এখন আর ঝিলিককে সহসা উলটো পালটা কিছু বলতে পারবে না।
সুকুমার ওষুধ নিয়ে আজগরের ঝুপড়ির সামনে আসতে দেখে, ঝিলিক দাঁড়িয়ে। সুকুমারকে দেখেই সে বলল, এতক্ষণে আসলা? গেছেলা কোথায়?
ওষুধ আনতি।
ওষুধ আনতে?
হয়, আজগর ভাইর জন্যি ওষুধ আনতি।
ওষুধ আনলা, তুমি পয়সা পালা কোতায়?
আলতাফের কাছে দে ধার করিচি—
ঝিলিক চোখ বড়ো করে সুকুমারের দিকে তাকিয়ে থাকে। গলা নামায়, তুমি পারোও।
এর মদ্যি পারাপারির কী আছে?
ঝিলিকের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে জরিনা। সেই সোজা ঝুপড়ির ভিতরে আজগরের মাথা দেখা যাচ্ছে। শরীরেরও খানিকটা। ফলে, এখন ঝিলিকের কথার অর্থটা সুকুমার যদি বুঝেও থাকে তার কোনও প্রকাশ তার চোখে নেই। সে জানে, ঝিলিক কী বলেছে। এই আজগরের সঙ্গে সেদিন মজমা মিলনো নিয়ে তার এক চোট হল। তারপর হাতে তার পয়সাপাতি নেই একেবারে। কাল ঝিলিক মোড়েলগঞ্জ থেকে ফিরল। সেখানে কোনও কিছুরই ফয়সালা হয়নি। ঝিলিককে আবারও যেতে হবে।
পিছনে জরিনা দাঁড়িয়ে থাকায় সুকুমার ঝিলিককে চোখ টেপে। ঝিলিকের কথার লজটা জরিনা কিছুটা হলেও তো বুঝেছে। কিন্তু সে সব প্রায় মুহূর্তে ভেঙে দিয়ে সুকুমার জরিনার দিকে এগোল, এই যে জরিনাদি, ওষুধ।
জরিনাও এমন ভঙ্গি করল যেন একথার কিছুই শোনেনি, সুকুমার ভাই, ওষুধ আনিছো। আমি ভাবলাম তোমার ধারে জিগোই ডাক্তার কী কইচে? এর মদ্যি দেখি তুই নেই।
কবে আর কী? জ্বর এমনি বাধিছে। তয় ডাক্তার কইচে শরীরে কিছু নেই। শরীরের দিকে এট্টু খেয়াল দিতি হবে। ভালো মন্দ খাতি কইছে।
কারে কী কও? ওই আজগর দেবে শরীরের দিকে খেয়াল, তালি তো হইল।
তবু। এইয়ে করলি কিন্তু বেশিদিন টেকপে নানে
জানি। ওর আর টেকা না টেকা। জরিনা ঝুপড়ির ভিতরে শুয়ে থাকা আজগরের দিকে তাকাল। সে এখনও বেখোরে ঘুমাচ্ছে। তারপরই কথা অন্যদিকে নিল, ওষুধ আনার টাহা পালা কোতায়?
পাইচি। ওই নিয়ে এহোন ভাবদি হবে না।
কও আমারে।
আলতাফের ধারদে আনিচি।
শুনে জরিনার মুখে কোনও পরিবর্তন যে হবে না, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভিতরে একটা বিষয় খেলে গেল, এবার তাহলে আলতাফ একটা সুযোগ পাবে, এই টাকা নিয়ে জরিনাকে দুই কথা শোনানোর। কিন্তু যতই ভাতের হোটেলের ভাগের মালিক হোক আলতাফ, জরিনা তাকে পছন্দ করে না। ভিতরে কোনও অজ্ঞাত কারণ আছে হয়তো, সে কারণ কোনওভাবেই জরিনা প্রকাশ করবে না, অন্তত সুকুমারের সামনে তো না-ই।
জরিনা জানতে চাইল, কবে শোধ দিতি হবে কিছু কইচে নিকি।
তুমি এত ভাবদিচো কী জন্যি, টাকা তো আনিছি আমি, শোধ দেয়া না দেয়ার মনস্থ আমার। আর ওষুধ আনিচি আইজকে আর কাইলকের, পরশু দিনের ওষুধ কাইল রাত্তিরে কেনবানে।
জরিনা সুকুমারের কাছে উলটো অন্য আর এক আলতাফের পরিচয় দিল, ও যে কীরাম মানুষ তা কয়দিন মিশলি বুঝতি পারবা। দাড়ি মোচ কামানো সুন্দর মানুষ দেখলি হবে কী? গুর মদ্যি টাহা দেখলিও সেইডে তুইলে আনতি পারে।
ঝিলিক পাশ থেকে থেকে বলল, এহোন এইয়ে বাদ দেও। কেননা, একথা এখন ঝিলিকের শুনে কোনও লাভ নেই। রাতে তাদের মাথা গোঁজার আশ্রয় আলতাফ।
হয়। দেলাম বাদ। তোমরা এহোনও ওই আলতাফের ধারে থাহো। দুইজনের এট্টা কিছু না হলি, তার আগে এইসমস্ত কথা কইয়ে কোনও ফ্যাকরা বাদানোর দরকার কী? নদীর কূলের কথা, এট্টু বাদে দেখা গেল আলতাফের কানে চইলে গেল।
সুকুমার বলল, আমি এট্টু বাজারের দিক যাই।
ঝিলিক বলল, কী জন্যি?
এট্টু সাগুদানা কিনে নিয়ে আসি। আজগর উঠলি জরিনাদি খাওয়াইয়ে দেবেনে।
জরিনা বলল, আকাশের যে অবস্থা! দাবাড় কিন্তু চালাল বুইলে।
তার আগে চইলে আসপ।
ঝিলিক জানতে চায়, আইজকে কোর্টের দিকে যাবানা?
আইসে নি। আকাশের গতি ভালো থাকলি যাবানে। আর নয় দুপুরের পরে যাব রেল লাইনের ধারে।
সুকুমার বাজারের দিকে যাওয়ার কথা বলে যায়। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে। হাতে চারটে কলা। ঝিলিক ভেবেছিল, হঠাৎ কলা নিয়ে ফিরল কেন? তার আর জরিনার জন্যে এনেছে নাকি? তারপর মুহূর্তেই মনে হল, এগুলো বানর দুটোর জন্যে। কলাগুলো একটু দাগি আর বেশি পেকে যাওয়া। ঝিলিকের হাতে দিয়েই দ্রুত মেইন রোডের দিকে হাঁটে সুকুমার।
