কিন্তু ওষুধ যে নিয়ে আসবে সুকুমার, এই কথা জানিয়ে সে চলে এল, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে জরিনা আর ঝিলিকের শুকনো মুখ, যদিও ওই কথা বলার সময় তার জানা ছিল না, এখনও জানে না ওষুধের টাকা কোথায় পাবে। ওষুধের দাম কত? কত দামের ওষুধ লিখেছে ডাক্তার। লঞ্চঘাটের গলি ধরে মেইন রোডের দিকে আসতে আসতে সুকুমার ভাবে, আলতাফের কাছে টাকা চাবে। আবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয়, কাল রাত্রে সে ঝিলিককে নিয়ে দোতলায় শুয়েছিল, সেই পয়সা এখনও দেয়নি, তার ওপর এখন আবার টাকা চাইলে আলতাফ নাও দিতে পারে।
ধীর পায়ে এইসব ভেবে সুকুমার আলতাফের হোটেল পর্যন্ত আসে। তখনই তার মনে হয়, এর আগে একটা ফার্মেসিতে ঢুকে জেনে নিলেই পারে ওষুধগুলোর দাম কত। আজ আর কাল এই দুই দিনের ওষুধ নিলে কেমন দাম পড়বে। সুকুমার তাই করে। রাস্তা উলটো দিকে দি জনতা ফার্মেসিতে ঢুকে জানতে চায় ওষুধের দাম। সুকুমার ভেবে রেখেছিল, আজগরকে দেখে ডাক্তার বুঝেছে গরিব মানুষ, তাই সস্তা ওষুধ লেখার কথা। ডাক্তার লিখেছেও তাই। ফার্মেসির লোকটা আজ আর কালকের ওষুধ নিলে দাম কত লাগবে তা জানায়।
এবার সুকুমার চলে আসে। রাস্তা পার হয়। আলতাফের কাছে টাকা চায়। আলতাফ হোটেল ভাড়ার টাকা নিয়ে কিছুই বলে না। শুধু জানতে চায়, কাল রাতে তাদের কোনও অসুবিধা হয়েছিল কি না। একথা জানতে চাওয়ার অর্থ আজও কি তারা থাকবে। এর অবশ্য কারণ আছে। এই হোটেলের দোতলা প্রায় ফাঁকাই থাকে। এক পাশে খোপের মতো কয়েকটা রুম। সেখানে প্রায়শ কেউ থাকে না। একমাত্র রাতের লঞ্চ ফেল-করা যাত্রীদের কেউ কেউ কখনও রাত কাটায়। তাও তারাই, যাদের প্রকৃত আবাসিক হোটেলে থাকার টাকা নেই। আলতাফ তাদের জানায়, রাতে তার হোটেলে ভাত খাওয়া বাবদ তারা থাকছে। ফলে, দরও তেমন বেশি নেয় না। কেউ কেউ তারপরও দরদাম করে। আলতাফ তখন যাত্রীর মান অনুযায়ী খেকায়। সেখানে সুকুমার খেলাঅলা বউ নিয়ে যদি তার এখানে থাকে তো থাকতে পারে। ঝিলিক যে সুকুমারের বউ এটা অবশ্য আলতাফের নিজের হিসেব। হতে পারে জরিনা তাকে তাই বলেছে। কিন্তু শাঁখা-সিন্দুর হাতে নেই কেন, এই কথা জানতে চায়নি। যদিও জরিনা একদিন কথায় কথায় ঝিলিককে বলেছিল, দেওর হোক আর যাই হোক, শাখা তো হাতে দিতি পারো, তালি মানষি আর কোনও কিছু নিয়ে সন্দেহ করত না।
সন্দেহ করা নিয়ে আলতাফ অবশ্য কিছু বলেনি। সুকুমার আর ঝিলিক যদি তার বাধা কাস্টমার হয় হোক। এমনিতে আলতাফ জরিনার সঙ্গে যত রঙ্গ করে কথা বলুক, ঝিলিক যখন তার কাস্টমার তখন তার সঙ্গে একটু হলেও দূরত্ব সে রক্ষা করে।
এখন সুকুমার আলতাফের কাছে টাকা চাওয়াটা তার জন্যে একটা সুযোগ। সে বরং উলটো ঠেলা দিল, পাঁচ টাকা লাগবে?
সুকুমার বলে, হু–
সুকুমারের জন্যে এটা সংকোচ। আকাশের এই অবস্থা। পুরো কোর্ট চত্বরে মানুষজন কী আসবে তার ভরসা নেই। সেখানে পাতার টিপ। মানুষজন নেই, চত্বরে পাতা, বৃষ্টিতে ভিজে, এর ভিতরে সুকুমার খেলা দেখাতে পারবে না। ফলে, পাঁচ টাকাই তার জন্যে এখন অনেক। এই টাকা কীভাবে শোধ দেবে সে জানে না। আজগর কয়দিনে খাড়া হবে তার ঠিক নেই। একমাত্র ইব্রাহিম শেখ এই চত্বরে পারবে মজমা মিলাতে। দিলদারেরও একটা সুযোগ আজকে বাতের যন্ত্র নিয়ে বসার। বারিক বুড়োর তার বইয়ের দোকান খুলবে কি না কে জানে।
আলতাফ বলে, আরও লাগলি নেও।
হয়, আরও লাগলি নিই। তারপর শোধ দেয়া লাগবে না?
দিয়ানে। একদিন ঠিকঠাক খেলা দেহাতি পারলি তোমার কত আয়। আমাগো মতন নাকি, এই জায়গায় দাঁড়াইয়ে চেঁচাও, আসেন লঞ্চ ছাড়ার দেরি আছে, ভাত খাইয়ে যান, বাইলে-টেংরা, রুই-কাতল, ভেটকি-পাঙ্গাশ, খাশি আর মুরগি। এইয়ে কইয়ে দিন পার করো। কোনওদিন খদ্দের জোটে, কোনওদিন জোটে না।
আলতাফ এক নিশ্বাসে বলে। সুকুমার চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে। আলতাফ বলে চলছে তার কথা। এই কয়দিনে তার বোঝা হয়ে গেছে, ভাতের হোটেলের ক্যাশ কাউন্টারে বসতে বসতে লোকটা এক ভাঙা রেকর্ডই বাজায়। মানুষের চোখ মুখের পরিস্থিতি খেয়াল করে না। হয়তো মানুষের পেটের খিদে নিয়ে কারবার। জানে খিদে যদি লাগে মানুষ খেতে বসবেই। আর একবার পাতে ভাত দিয়ে কয়টা খাওয়াতে পারলেই হল, তারপর তুমি যাবা কোথায়, এটা খাও ওটা খাও, সেই সাধাসাধির ধরনও জানা আছে সুকুমারের। শুধু এখানে কেন, এমন ভাতের হোটেলে জীবনে তো কম খায়নি, কত লঞ্চঘাটে কত রেল স্টেশনে ফেরি ঘাটে ফেরির উপরে মাঝি ঘাটে এমনতর ভাতের হোটেল মাপতে মাপতে আজ এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আলতাফ কী বুঝল কে জানে। গলার স্বরের ধরন হঠাৎ বদলে গেলে তার। নীচু স্বরে সে সুকুমারের কাছে জানতে চাইল, কী ও দা, মন খারাপ? কোনও সমস্যা?
উহুঁ–
তালি কথা কতিচো না যে?
কী কব?
কলাম টাকা আরও লাগলি নাও—
না, টাকা নিলিই হল, সেয়া শোধ দিতি হবে না?
লাগবে কী জানি?
এতক্ষণে এত কথার তোড়ে আলতাফের সুকুমারের হাতে ধরা ছোট্টো কাগজখানায় চোখ পড়েছে। এটা যে প্রেসক্রিপশন তা আলতাফের না-বোঝার কোনও কারণ নেই। আর আজগরকে ভ্যানে নিয়ে যাওয়া আবার হাসপাতাল থেকে রিকশায় করে আনা দুবারই আলতাফ দেখেছে। তাই হয়তো, লাগবে কী জন্যি? বলেই সঙ্গে আরও জানতে চাইল, আচ্ছা, আজগরের কথা কী কল ডাক্তার?
