জরিনা কোনও কথা বলে না। সকাল থেকেই মন ভালো নেই। আজগরের শরীরে অবস্থা খারাপ এই জন্যে শুধু না, তার হাত একটা পয়সাও নেই। কাল মোসলেম ওষুধ কিনে দিয়ে গেছে। সুকুমার সন্ধ্যার পর রুটি কিনে এনেছে এই দিয়ে চলেছে। সকালবেলা আজগর কিছুই খায়নি, কিন্তু তাদের তিনজনের খাবার এনেছে সুকুমার। তখন দেখেছে ঝিলিক শাড়ির খোট থেকে টাকা দিয়েছে। জরিনা তো জানে, এখানে সবে এসে সুকুমার, তারপর পরশু আজগরের ওপর রাগ করে মজমা মিলায়নি, কাল কোর্টের এলাকায় মানুষজন বলতে গেলে ছিলই না। ইব্রাহিম শেখের মতন মানুষ সেও অল্প সময়ে আসর গুটিয়েছে। ট্রেনের ব্যাপারটা না মিটলে উকিলদের অনেকেই কোর্টে আসবে না। সরকারের সঙ্গে টক্কর!
এসব জরিনার শোনা কথা। তারপর ঝিলিক গেল বাপের বাড়ির দেশে। সেখানে পাঠানোর লঞ্চভাড়া নিশ্চয়ই সুকুমার দিয়েছে। সুকুমারের কাছে আর কিছুই হয়তো নেই। এখন হাসপাতালের ডাক্তার যদি ওষুধ লেখে, জরিনা জানে না, কী হবে!
এদিকে ঝিলিক আজগরের ঝুপড়ির ভিতরে ঢুকে এটা সেটা গোছাতে শুরু করেছে। কিন্তু গোছানোরই-বা এমন কী আছে। ঘর বলতে যা, এই ঘরকে তা বলা যায় না। প্রায় ভেঙেপড়া তক্তপোশ বা খাটও নেই। দক্ষিণের বেড়ার ওই অবস্থা। ঝড়-বাদলে বানর দুটোকেও এর ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়। এখন ওই অবলা প্রাণী দুটো আগাম ঝড় আর বৃষ্টির আশঙ্কায় ঝুপড়ির বেড়ার পাশে গুটিসুটি মেরে আছে। ঝিলিক শুনেছে এইসব বনের প্রাণী আগেই বুঝতে পারে ঝড়-বাদল।
ঝিলিক হঠাৎ দেখে ঝুপড়ির সামনে জরিনা নেই। আজব মানুষ। সুকুমার তাকে বলেছে, চোদ্দ ঘাটে জল খাওয়া পদ। কোথাও দাঁড়ায় নাকি। এখন কী মনে করে আজগরের সাথে আছে তা ভগবান জানে। যদিও ঝিলিকের তা মনে হয়নি। সে বলেছিল, তা না, মানুষটা ভালো আছে। সুকুমারের যা স্বভাব, তাই বলেছিল, মাইজে বউ, আমি কি কইচি খারাপ! কইছি মানুষটার ধরন ওইরাম, ঘরের চালের তলে মাথা দেয়া পদ না।
তখন ঝিলিক তো চাইলে সুকুমারকেও দুই কথা শোনাতে পারত। শুনিয়েছিল। কিন্তু আগায়নি। যখন সুকুমারের ওই কথার উত্তরে বলেছিল, নিজে তো গিরস্ত বাড়ির ছওয়াল, দেলা তুমি কোনওদিন চালের তলে মাথা? এর উত্তরে সুকুমার বলেছিল, আমি বেটা মানুষ। মাথা দেয়ায় কী আর না দেয়ায় কী? এর অবশ্য উত্তর যা হয় তা আর বলেনি ঝিলিক। শুধু বলেছিল, মানুষের ভাইগ্য। বোঝলা, মানুষের ভাইগ্য। ভাইগ্য মানুষরে কোথায় নিয়ে যায়। আইজ আমি এইহেনে
এরপরও ঝিলিকের কথা ছিল। বলেনি কিছুই। বলতে পারত। সুকুমারও এই কথায় কেমন উদাস হয়ে উলটো দিকে তাকিয়ে ছিল। সুকুমারের ওই ভঙ্গিটা বড়ো ভালো লাগে ঝিলিকের উদাসী হয়ে কেমন যেন কোন দিকে তাকিয়ে থাকে। এত দূরে তাকায় মানুষটা, বড়ো গোল চোখ জোড়া তখন একটু যেন কুঁচকে থাকে। তার ভিতরে বহু বহু দূরে কী দেখে। আর আশেপাশে কোথায় আছে, কার কাছে আছে, কী দেখছে–কোনও দিকেই খেয়াল থাকে না তার। সেই রূপসার কুলে এমন একদিন দেখেছিল, পরশু আবার দেখেছে। কিন্তু রূপসার কূলে সুকুমারের চোখে মুখে কোথাও বিষাদ ছিল না, দুঃখ ছিল না, কিন্তু পরশু ঝিলিক দেখেছে সুকুমারের চোখের ভিতরে কোথায় যেন দুঃখ!
যাক, ঝিলিক এখন জরিনার আচরণ বুঝল না। ভাই তুই এই মানুষটার সাথে দিনেমানে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা থাকিস্, খাই ঘুমোস্ একসাথে, আর এই মানুষটার ঘরখান একটু ঝাড়পোচ দিয়ে রাখবি না? যেই সে কথা বলল ঝিলিক, অমনি কোথায় গেল!
ঝুপড়ির ভিতর থেকে কতগুলো কাগজের ঠোঙা, চানাচুরের প্যাকেট কলার পুরনো খোসা এইসমস্ত বাইরে ছুঁড়ে দিয়ে ঝিলিক বিড়বিড় করে। তারপর মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে, জরিনা দরজার কাছে দাঁড়ানো। হাতে বড়োসড়ো একটা ছালার চট। ঝিলিককে বলে, ওদি, এইখেন ওই দিক দিয়ে দেও। যে বাতাস চালাতিচে। ফুটো বেড়ায় এইখেন থাকলি তবু কিছু বাতাস মানাবে।
পালা কোথায়?
ওই আলতাফের হোটেলের ভিতরদে নিয়ে আইচি। মনে হয় কোনও ব্যাপারি থুইয়ে গেইচে।
এমনি দেল?
হয়, আলতাফ দেবে এমনি? চাইর কথা শুনোল, ফাও কথা কল। চেঁচাইয়ে উঠিচে।
সেইয়ে। এমনি দেয়ার মানুষ আছে?
এই জন্যি কম দিন কথা শোনানো নানে। শুনোক। আমি কইচি, মানুষটার ওই দশা। বাদলের ছিট আসে, যাগো তা থুইয়ে গেইচে, তাগে কইয়ে একখান চোরে নিয়ে গেইচে।
এর কিছুক্ষণের ভিতর সুকুমার আজগরকে নিয়ে ফেরে। এখন আজগরের অবস্থা যেন কিছুটা ভালো। রিকশায় বসে এসেছে। মোসলেম উদ্দিন আসেনি। সুকুমার রিকশা থেকে নেমে আজগরকে ধরে নামায়। ঝিলিক আর জরিনাকে বলে তাকে শুইয়ে দিতে। জ্বর নাকি আজই কমে আসবে। তবে কয়েকদিন গায়ে বেশ ব্যাথা থাকবে। ডাক্তার একটা ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছে। কয়েকটা ওষুধও লিখেছে। ওষুধগুলো একটু বাদে নিয়ে আসবে সে।
জরিনা আর ঝিলিক আজগরকে ভিতরে নিয়ে শুইয়ে দেয়। তবে আজগরকে দেখে বানর দুটো পথের পাশ থেকে দড়ি টানটান করে দরজার কাছে এসেছিল। তাদের মালিকের নিশ্চিত কিছু হয়েছে। চোখ বড়ো করে বানর দুটো আজগর ঝুপড়িতে ঢোকার আগ পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে। এই দৃশ্য দেখে সুকুমারের মনে হয়, এই অবুঝ প্রাণীরা জানে না, তাদের মালিক কালকে না-থাকলে, তখন তাদের দেখার কেউ থাকবে না এই ধরাধামে, তখন কোথায় গিয়ে পড়বে কে জানে।
